আর আদিখ্যেতায় কাজ নেই মা। জড়াজড়ি করলেই বুঝি আদর হয়? রাত জেগে মুখের দিকে চেয়ে বসে থাকা, মাথায় জলপট্টি বা তালুতে বরফ দেওয়া, ঘণ্টায় ঘণ্টায় ওষুধ খাওয়ানো সেসব বুঝি আদর নয়?
সে তো কেজো আদর। একটু অকাজের আদর করো তো! মুখটা সবসময়ে ওরকম গোঁসাপানা করে রাখো কেন? হাসতে জানো না?
হাসি বুঝি অমনি আসে! কটা দিন তো হাড় ভাজা-ভাজা করে খেলে। একশো পাঁচ ছয় জ্বর উঠে যাচ্ছে, সবাই ভয় দেখাচ্ছে বেশি জ্বরে নাকি মাথায় রক্ত উঠে যায়। ভয়ে মরি। হাসি আমার শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে।
জ্বর বুঝি মানুষের আর হয় না! না হয় মরেই যেতাম। তোমার একটা চক্ষুশূল কমত। হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে।
খুব বুঝেছ।
তুমি সবচেয়ে বেশি ভালবাসো দাদাকে, সেকেন্ড হীরা, আমি লাস্ট।
তাই না?
ওই তো বললুম, খুব বুঝেছ।
জ্বরের ঘোরে আমি বারবার কাকে দেখেছি জানো? মণিরাম জ্যাঠাকে। মণিরাম জ্যাঠা এসে পাশে বসে আমার নাড়ি দেখছিল। কী ঠান্ডা হাত!
থাক, ওসব আবার মনে করতে হবে না। অলক্ষুণে সব স্বপ্ন।
মরা মানুষকে স্বপ্ন দেখা ভাল নয়, না?
স্বপ্ন স্বপ্নই। তার কি কোনও মাথামুণ্ডু আছে! জ্বরের ঘোরে কত হাবিজাবি দেখে মানুষ। ওসব নিয়ে ফের ভাবতে বোসো না। একেই তো ভিতুর ডিম!
আমার অত জ্বর দেখে বাবা কেমন করল বলবে?
পুরুষমানুষ বড্ড নরম হয়। তার ওপর বাপসোহাগী মেয়ে। কেমন আবার করবে। ঘরবার করেছে, বারবার জ্বর মেপেছে, আর উদ্ভট উদ্ভট সব নিদান দিয়েছে।
কী রকম মা? একটু বলো না!
কোথায় কোন তান্ত্রিকের কাছে যাবে বলে বায়না ধরেছিল। আমি যেতে দিইনি। তান্ত্রিকদের নানা মতলব থাকে। কোন ফকিরবাবার জলপড়ার কথাও যেন বলছিল। তখন কি আর কারও মাথার ঠিক ছিল মা?
আর হীরা?
ও বাবা এমনিতে দু বোনে বনিবনা নেই বটে, কিন্তু যেই দিদির জ্বর হল অমনি হীরা জব্দ, সারাদিন চোখ ছলোছলে, ভাল করে খায় না, ঘুমোয় না। বেশ খেলা দেখিয়েছ।
তাকে নিয়ে যে বাড়িতে একটা ভীষণ টেনশন গেছে এটা জেনে খুব খুশি হচ্ছিল পান্না। এইসব অসুখ-বিসুখ শরীর নিংড়ে নেয় বটে, কিন্তু বিনিময়ে কিছু পুরস্কারও তো দিয়ে যায়। অসুখের ভিতর দিয়ে কি মানুষের একটা নবীকরণও হয়?
কে কে আমাকে দেখতে আসত বলো তো! বড়মা আসেনি?
ওমা! বড়দি আসবে না? রোজ দুবেলা এসেছে। বকুল, পারুল, জামাইরা সবাই এসে ঘুরেফিরে দেখে গেছে।
আমি কিন্তু টের পাইনি কিছু।
কী করে পাবে? চৈতন্যই তো ছিল না একরকম। মাঝে মাঝে একটু চেতনা এলে দু-চারটে হাবিজাবি কথা বলে ফের ঘোরে ডুবে যেতিস।
ধ্যেৎ! বলে হাসে পান্না, হাবিজাবি বলতাম বুঝি?
বেশিরভাগই অসংলগ্ন কথা। মাথামুন্ডু নেই।
কেউ শোনেনি তো!
তেমন কেউ নয়। শুধু ওই অমলের মেয়ে সোহাগ। সে সারাক্ষণ তো মুখের ওপরই পড়ে থাকত।
সোহাগ কি কলকাতায় চলে গেছে মা?
জানি না বাপু। কাল থেকে তো আসছে না। আমারও কি পাড়াপ্রতিবেশীর খবর নেওয়ার সময় ছিল?
আজ কি খুব শীত পড়েছে?
তা পড়েছে বাছা। সকালে তো কনকনে হাওয়া দিচ্ছিল।
তা হলে আমাকে উঠোনে একটা চেয়ার পেতে দাও। রোদে একটু বসি। কতকাল বাইরেটা দেখা হয়নি।
আজ থাক না। শরীর দুর্বল, মাথা-টাথা যদি ঘুরে যায়।
কিছু হবে না মা। পেতে দাও।
বাইরে রোদে বসে চারপাশটাকে চোখ নাক ত্বক দিয়ে শুষে নিচ্ছিল পান্না। বাঁ ধারে বড় জ্যাঠাদের তিনতলা বাড়ির ছাদ দেখা যায়, ঘোষবাড়ির মস্ত মস্ত নারকোল গাছে আছাড়ি-পিছাড়ি হাওয়া, পুকুরপাড় থেকে বাসন ধোয়ার শব্দ আসছে, একটা গোরু হাম্বা বলে ডেকে উঠল।
আজ হাওয়ার দিন। বাতাসে লুকোনো ছুরির মতো শীত এসে তার শরীরের আনাচে কানাচে ঢুকে যাচ্ছে। একটা বাটিতে মুড়ি আর আধকাপ চা দিয়ে গেছে মা। মুড়িটা বাতাসের থাবায় অর্ধেক উড়ে গেল। তাড়াতাড়ি জুড়িয়ে গেল চা। গায়ের আলোয়ানটা উড়ে যাচ্ছে বারবার বাতাসের ঝাপটায়। রোদ তেমন গায়ে লাগছে না।
না, এই শীত বাতাসটা সহ্য করা তার উচিত হচ্ছে না। ফের যদি জ্বর আসে।
হাহাকারের মতো শব্দ উঠছে গাছপালায়। বাতাস বড্ড দামাল। রোদের তাপটুকু লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে। উঠোনে এ সময়ে যেসব পুষি বেড়াল বা ভেলু কুকুরেরা বসে থাকে তারাও কেউ নেই।
একটু বসে থাকার ইচ্ছে হয়েছিল পান্নার। সাহস হল না। উঠে ঘরে চলে এল। বিছানায় বসে কোমর অবধি লেপটা টেনে নিল। গলায় জড়িয়ে নিল মাফলার। কোলে পুবের জানালা দিয়ে ঝকঝকে রোদ এসে পড়েছে। তাপটুকু বড় ভাল লাগছে তার। বাইরে লুটেরা বাতাসের দাপাদাপি। শীত করছে।
চোখ জ্বালা করে জল আসছে। বুকে ধুকুরপুকুর। গলায় খুশখুশ। জ্বর আসছে নাকি? ও বাবা, তা হলে মরেই যাবে সে। রোদে রোগা দুখানা হাত মেলে দিয়ে সে ফর্সা চামড়ার নীচে নীল শিরা উপশিরা দেখতে পাচ্ছিল। গায়ে জ্বরের গন্ধ। না, তার ভাল লাগছে না। সে চোখ বুজল, ঠিক তার জ্বর আসবে।
চোখ বুজে ভারী মন খারাপ লাগছিল তার। জ্বর এলে আবার তো পড়ে থাকা। কান্না পাচ্ছে যে!
দাঁতে ঠোঁট কামড়ে যখন এই অলক্ষুণে চিন্তা করছিল পান্না, তখনই ফের মনে হল, জ্বর কি খুব খারাপ? বেশ তো কয়েকটা দিন এক অদ্ভুত আলো-আঁধারের জগতে বাস করে এল সে। স্বপ্নের কত ফুলঝুরি ঝরে পড়ল চোখে। কত কিম্ভুত দৃশ্য দেখল। জ্বর এলে হয়তো সেই ডাক্তারটিও আসবে। তার নাম অনল বাগচী। কী অদ্ভুত নাম। ডাক্তারের মুখটা মনেও পড়ে না তার। কেমন দেখতে কে জানে! ক্যাপসুল-ট্যাবলেট গিলতে পারে না বলে তাকে বকেনি একটুও। আর ভাত খেতে বলেছিল। বেশ ডাক্তার। মণিরাম জ্যাঠার মতো নয়।
