হি হি হি হি।
ফের চটকা ভেঙে গেল।
ওষুধটা খেয়ে নে!
তেতো বিচ্ছিরিওষুধটা খেয়ে নিয়ে পান্না বলল, ইস, অরেঞ্জ স্কোয়াশ দাওনি। ডাক্তারবাবু বলে গেল যে!
ভুল হয়ে গেছে মা। এর পর থেকে দেব। আরও ওষুধ আছে। একটা ট্যাবলেট আর একটা ক্যাপসুল।
ভীষণ বেশি ওষুধ দেয় তো লোকটা।
তা দেবে না কেন। অসুখটাও তো ভালই বাধিয়েছ।
স্বপ্ন আর জাগরণের মধ্যে একটা মজার যাতায়াত চলছে তার। মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই সে দুর্গা প্রতিমার মুখ দেখতে পাচ্ছিল কিন্তু মুখটা জলে ডুবে আছে। মা দুর্গা যেন চিৎকার করে বলছে, এই! এই! আমি ডুবে যাচ্ছি যে! আমি সাঁতার জানি না, আমাকে তোলা।
এক দঙ্গল ছেলেমেয়ের চেঁচামেচিতে মা দুর্গার চিৎকার চাপা পড়ে গেল। আর তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। পান্না একজনের বুকে দুম দুম কিল মারতে মারতে বলল, কী করছ তোমরা! মা দুর্গাকে ভোলো শিগগির! মা দুর্গা ডুবে যাচ্ছে যে!
লোকটা বলল, মা দুর্গাকে তুলতে নেই। আপনি ঘুমোন।
কেন ঘুমোব?
আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। সব দিকে নজর রাখার দরকার কী?
অবাক হয়ে পান্না দেখল, লোকটা নতুন ডাক্তারবাবুটি।
সে লজ্জা পেল। জ্বর নেমে যাচ্ছিল তার। মাথা ধরা কমে যাচ্ছে। গা ঠান্ডা হয়ে আসছে। শীত লাগছে না তেমন। প্যারাসিটামল খেলে এরকম হয় কিছুক্ষণের জন্য। সে জানে। জ্বর কমল বলেই বোধহয় স্বপ্নও আর তেমন দেখল না সে।
মা।
কী রে?
জল দাও।
মা জল দিল।
এখন রাত কত মা?
বারোটা।
আমাকে ওষুধ খাওয়াবে না?
খাওয়াব। তার আগে বার্লি।
ওয়াক। ওরকম করতে হয় না মা। ডাক্তারবাবু কি কাল আবার আসবে।
তো! বড় ডাক্তার কি রোজ আসে? পান্না একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে যদি বিয়ে করে একজন ডাক্তারকেই করবে।
.
১৮.
যেন অতল জল থেকে উঠে আসা। এক ঘোর-ঘোর রূপকথার জগৎ থেকে বাস্তবের চৌকাঠে পা রাখা, কোনটা ভাল তা পান্না বলতে পারবে না। স্বপ্ন আর সত্যের মেলামেশা যে অদ্ভুত জগতে সে ছিল কয়েকদিন–তা তো কই খারাপ লাগছিল না তার। মৃত্যুভয় অবশ্য ছিল, কিন্তু তা তো তার সবসময়েই থাকে। অসুখ হলে একটু বেড়ে যায়, এই যা।
সকালবেলার আলো-ঝলমলে ঘরে দুর্বল শরীরে উঠে বসেছে পান্না। বুক অবধি লেপ টানা দেওয়া ছিল। লেপটা কোলের ওপর খসে পড়েছে। নিজের দুখানা হাত চোখের সামনে তুলে ধরে খুব মন দিয়ে দেখছে সে। একেই সে রোগা। এই অসুখে আরও কি রোগা হয়ে গেছে সে?
জ্বর ছেড়ে গেলে শরীরটা যেন বেশি ঠান্ডা মেরে যায়। খুব শান্ত এক শীতলতায় ভরে আছে শরীর। খুব দুর্বল। মুখে বিস্বাদ।
মা!
হুঁ।
আমি কি আজ চান করব?
পাগল!
গা থেকে বোঁটকা গন্ধ পাচ্ছি যে!
মোটেই কোনও গন্ধ নেই। আমি তো পাশেই শুই, গন্ধ হলে পেতুম না!
আমি পাচ্ছি যে!
গন্ধের নাক একটু কমাও মা। সবতাতেই গন্ধ-গন্ধ বলে নাক সিঁটকোলে তো হবে না। বড্ড গন্ধ বাই। তোর।
তাহলে কি নাকটা উকো দিয়ে ঘষে দেব?
আর উকো দিয়ে ঘষতে হবে না, এমনিতেই তো নাকটা একটু চাপা।
কই চাপা? দাও তো আয়নাটা! তুমি তো আমার সবকিছুই খারাপ দেখ।
আয়নায় নিজের নাক মোটেই চাপা বলে মনে হল না তার। একটু ছোট বটে, কিন্তু মোটেই চাপা নয়।
আমি কি খুব কুচ্ছিত মা?
কুচ্ছিত না হলেও ডানাকাটা পরি তো আর নও। জ্বরের আগে তাও যা একটু ছিল, জ্বরের পর তো হাড়গিলে চেহারা হয়েছে।
শুধু বার্লি গিলিয়ে রেখেছ, চেহারা তো খারাপ হবেই। ডাক্তারবাবু ভাত দিতে বলে গেল, তুমি কিছুতেই দিলে না।
আহা, ডাক্তাররা বড় পণ্ডিত কি না। নিদান দিয়ে দক্ষিণা পকেটে খুঁজে পগার পার হল, তারপর যত হ্যাপা সব আমাদের সামলাতে হবে।
ডাক্তারের কথা যদি না-ই শুনবে তবে ডাক্তার ডাকো কেন?
সে ডাকতে হয় বলে ডাকা। ডাক্তার ওষুধ দেবে, পথ্যি আমাদের হাতে।
বাঃ, বেশ মজা তো! ডাক্তারের কথা অর্ধেক শুনবে আর অর্ধেক ফেলে দেবে?
সেটাই রেওয়াজ। ডাক্তারদের কথা পুরো কেউ শোনে না। জন্মে শুনিনি একশো পাঁচ ছয় জ্বরে কেউ ভাত দেয়। মণিরাম ডাক্তার শুনলে মূর্ছা যেতেন। ওসব হালফিলের ডাক্তারের ওপর আমার ভরসা হয় না তেমন।
আজ তো জ্বর নেই, দেবে তো চাট্টি ভাত?
আজকের দিনটা থাক না, কাল খাস।
আমি কিন্তু আর বার্লি গিলতে পারব না। বার্লির বাটি ছুঁড়ে ফেলে দেব জানালা দিয়ে।
আচ্ছা, দুটো পাতলা রুটি দেব খন, আলু বড়ির ঝোল দিয়ে খাস।
রুটি! আমার যে অম্বল হয়ে যায়।
বাবা রে, বায়নাক্কার শেষ নেই তোর।
মুখটা যে কী বিস্বাদ! একটা লঙ্কা দেবে?
লঙ্কা!
লঙ্কা আর নুন খেলে জিবটা বোধহয় পরিষ্কার হবে।
পাগল নাকি? বরং আদাকুচি আর নুন খা। কাশিরও উপকার হবে।
তাই দাও বাবা। তার আগে এক কাপ চা। দেবে তো?
আবার চায়ের বায়না কেন? একেই তো লিভার ভাল নয়।
ওই এক কথা শিখেছ তুমি। লিভার ভাল নয়। কী করে জানলে যে আমার লিভার ভাল নয়? তুমি কি ডাক্তার? লিভার কাকে বলে তাই তো জানো না।
না জানলেও বুঝতে পারি। ওসব শিখতে হয় না আমাদের। তোর কটা শ্বাস পড়ল তারও হিসেব আমার আছে।
কাঁচকলা আছে। বলো তো সকাল থেকে কটা শ্বাস ফেলেছি? অত সোজা না। মা হয়েছ বলে মাথা কিনে নিয়েছ বুঝি!
তাই নিয়েছি। এই যে বৃষ্টিতে ভিজতে বারণ করলুম, শুনলি সেই কথা? মায়েরা সব আগাম খবর পায়, তা জানিস?
পান্না হেসে ফেলে, দুহাত বাড়িয়ে বলে, এসো তো আমার কাছে! একটু আদর করো।
