পথ্যি কী দেব ডাক্তারবাবু?
কেন, ভাতরুটি যা খেতে চায়?
এই জ্বরে ভাত?
হ্যাঁ, ভাতে কোনও ক্ষতি হবে না।
ডাক্তারটার মাথা খারাপ। মণিরাম জ্যাঠা জ্বর সারবার পরেও আরও দুদিন ভাত পথ্য দিতেন না। স্নান নিষিদ্ধ ছিল বেশ কয়েকদিন। বার্লি ছাড়া পথ্য ছিল না।
কী দিলেন ডাক্তাবাবু? ক্যাপসুল?
হ্যাঁ। কেন বলুন তো।
আমি ক্যাপসুল গিলতে পারি না।
সে কী? ক্যাপসুল না খেলে অসুখ সারবে কেমন করে?
লিকুইড নেই?
লিকুইড। না, এই হাই পোটেনসিতে লিকুইড পাওয়া যায় না।
আমি যে গিলতে পারি না। ক্যাপসুল গুলে খেতে রয়।
ডাক্তারবাবুটি হাসলেন। কিন্তু উপদেশ দেওয়া বা জবরদস্তির চেষ্টা না করে বললেন, সেভাবেই খাবেন। তবে একটু তেতো লাগবে হয়তো। অরেঞ্জ স্কোয়াশ থাকলে তাতে গুলেও খেতে পারেন।
ক্যাপসুল গিলতে পারি না বলে আপনি কই বকলেন না তো!
ডাক্তারবাবুটি ফের হাসলেন, অনেকের সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম থাকে, ওষুধ গিলতে ভয় পায়। বকবার মতো কিছু তো নয়। আমার এক জামাইবাবু আছেন, তিনিও ট্যাবলেট গিলতে পারেন না।
বাঁচল পান্না, শ্বাস ফেলল একটা।
আচ্ছা এনকেফেলাইটিস বলে একটা অসুখ আছে, না! সেটা হলে কী হয়?
খারাপ হয়।
মরে যায়?
মরতেও পারে।
আমার এনকেফেলাইটিস হয়নি তো!
আপনি খুব খারাপ খারাপ অসুখের কথা ভাবতে ভালবাসেন বুঝি?
আমার যে মনে হচ্ছে আমি মরে যাব।
অসুখ হলেই অনেকের ওরকম মনে হয়।
টাইফয়েড হয়নি তো!
সেটা এত আর্লি স্টেজে তো বলা যাবে না। তবে আপনার জ্বর হয়েছে ঠান্ডা লেগে। বুকে সর্দি জমেছে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
কয়েক মুহূর্তের জন্য তার ভিতরে চলে গেল পান্না। দেখতে পেল মণিরাম ডাক্তার ঘোড়ায় চেপে রুগি দেখতে যাচ্ছেন, সাদা জামার ওপর ফর্সা রোদ পড়েছে।
কিন্তু মণিরাম জীবনে কখনও ঘোড়ায় চড়েননি। তাঁর ছিল একখানা বশংবদ সাইকেল। তা হলে ঘোড়াটা এল কোথা থেকে?
পান্না যখন চোখ মেলল তখনও ডাক্তার যায়নি। তবে উঠে দাঁড়িয়েছে। এবার যাবে। কারেন্ট আসায় ডাক্তারবাবুটিকে স্পষ্ট দেখতে পেল পান্না। বেশি বয়স নয়। ত্রিশ-বত্রিশ হবে হয়তো। তার দিকে চেয়ে হেসে বলল, দু-একদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবেন। ভয় নেই।
পান্না চোখ বুজল এবং সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নের মধ্যে চলে গেল। মণিরাম জ্যাঠা পাশে এসে বসেছে। চোখে নিবিষ্ট দৃষ্টি।
দেখি, হাতখানা দে তো!
উঃ জ্যাঠা, আপনার হাত এত ঠান্ডা কেন?
ঠান্ডা! ঠাণ্ডাই তো হওয়ার কথা। তোর গায়ে যে জ্বর।
জ্যাঠা, আপনার কি ঘোড়া আছে?
হ্যাঁ। থাকবে না কেন?
ঘোড়ায় চেপে আপনি রুগি দেখতে যান?
হ্যাঁ। এই তো বিদ্যাধরীপুর থেকে এলুম। সেখানে কলেরা হচ্ছে।
ইস। তা হলে আমার হাতটা ছাড়ুন। আপনার হাতে যে কলেরার জীবাণু রয়েছে।
তা আছে। খুব আছে।
এখন আমাকে যে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে!
হ্যাঁ, ধোয়া ভাল। হাত ধোয়া খুব ভাল।
কতক্ষণ কে জানে। ফের চোখ মেলল সে। মাথার আইসব্যাগ থেকে সমস্ত শরীরে শীত ছড়িয়ে পড়ছে।
ওঃ মা, আইসব্যাগটা সরিয়ে নাও। ঠান্ডা লাগছে যে!
তোর যে জ্বর।
কত জ্বর?
একশো দুই-টুই হবে।
মোটেই না। আমার এখন একশো ছয় সাত হয়ে গেছে।
না না, অত নয়।
ডাক্তারবাবু কী বলে গেল?
কী আর বলবে?
আমার কী হয়েছে?
কী আবার হবে। জ্বর হয়েছে।
সাধারণ জ্বর নয় মা, আমি জানি।
এতই যদি জানো বাছা, তবে জ্বরটাকে ডেকে আনতে ভাসানে না গেলেই তো পারতে।
একটা দিন ভাসানে আনন্দ করব না?
আনন্দ তো এখন বেরোচ্ছে। এখন চিঁচিঁ না করে আনন্দ করলেই তো হয়।
তুমি একটা বিচ্ছিরি মা। পচা মা। অসুখ হলে কাউকে বকতে হয় বুঝি?
বকব না তো কি আহ্লাদ করব নাকি? পই পই করে বারণ করলুম, শুনলি সে কথা!
শোনো মা, আমি একটু আগে মণিরাম জ্যাঠাকে স্বপ্নে দেখেছি, জ্যাঠা এসে আমার নাড়ি দেখছিল। আমি কিন্তু আর বাঁচব না। মরা মানুষের স্বপ্ন দেখা খারাপ, তা জানো?
দুর্গা দুর্গা। ওসব কথা বলে না। বলতে নেই। বড় ডাক্তার দেখে গেছে। ভয়ের কী আছে মা?
ডাক্তারটি কে বলো তো! কখনও দেখিনি।
বর্ধমানের ডাক্তার। অনেক ডিগ্রি।
বর্ধমানের ডাক্তার যা বলে গেল শুনবে তো! জ্বরের মধ্যে আমাকে ভাত খেতে দেবে?
বড্ড ভয় পাই মা। কোনওকালে এমন অশৈলী কথা তো শুনিনি। আজকালকার তেজালো ওষুধের জোরে ওসব হয়তো চলে। কিন্তু ভাত না হয় জ্বর সারলেই খাস।
তা হলে ডাক্তার দেখিয়ে কী হবে?
পান্না ফের আচমকা স্বপ্নের জগতে চলে গেল। ঝোপের আড়াল থেকে কে একটা পাগলি তাকে ঢিল মেরেই লুকিয়ে পড়ল। ঢিলটা ঠং করে কপালে এসে লাগতেই মাথাটা ঝনঝন করে উঠল ভয়ংকর ব্যথায়।
কে? কে রে তুই?
পাগলিটা হি হি করে হেসে একটা ঝোপের আড়াল থেকে যখন আর একটা ঝোপের আড়ালে ছুটে গেল তখনই পান্না দেখতে পেল তার পরনে ঝালঝালে একটা বিবর্ণ জামা।
তুমি সোহাগ।
হি হি হি।
এমা! তুমি পাগল হলে কী করে?
ওরা যে আমাকে রেপ করল!
কারা রেপ করল তোমাকে?
ওই তো ওরা।
তুমি আমাকে ঢিল মারছ কেন?
ওরা পাজি। ভীষণ পাজি।
তোমাকে তো বলেইছিলাম ওদের একটু ভয় দেখানো দরকার। তুমি শুনলে না। বিজুদাকে কিছু করতেও দিলে না।
তোমার বিজুদা কি ভগবান?
তা কেন? বিজুদা একজন ডু গুডার।
ওকে আমার চাই না, বলে দিও। বেশ করেছে রেপ করেছে।
কাছে এসো সোহাগ। ঢিল মেরো না। আমি তো তোমার বন্ধু।
