যাঃ, তুমি মোটেই অহংকারী নও। আমার সঙ্গে ভাব হল কী করে বলো?
তুমি বোধহয় অন্যরকম।
একটুও না। তবে আমিও কিন্তু একটু অহংকারী। কীসের অহংকার জানি না বাবা। তবে আছে একটু। বন্ধুরা বলে, তোর ভীষণ দেমাক।
তুমি কথা বলতে গিয়ে হাঁফিয়ে পড়ছ। আর কথা বোলো না। চুপ করে চোখ বুজে শুয়ে থাকো। আমি কি তোমার জন্য কিছু করতে পারি?
কী করবে?
মাথা টিপে দিতে পারি বা আইসব্যাগ ধরতে পারি।
না, না, তুমি বসে থাকো। আমার এখন একটু ভাল লাগছে। অসুখ হলে বড় একা লাগে।
পান্না বাস্তবিক বড্ড ক্লান্ত বোধ করছিল। চোখ বুজতেই কেমন যেন এক আচ্ছন্নতায় তলিয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। হিজিবিজি স্বপ্নে ভরে গেল মাথা। তারপর চটকা ভেঙে চেয়ে দেখল, সোহাগ তখনও বসে আছে, চলে যায়নি। একটা হাত রেখেছে তার কপালে।
পান্না ক্ষীণ হেসে বলে, আমি একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আর তার মধ্যেই একটু স্বপ্নও দেখে ফেললাম।
তুমি ঘুমাও।
তুমি থাকবে তো?
একটু থাকব। আমার তো কোনও কাজ নেই।
চুপচাপ বসে থেকো না। কথা বলো। নিস্তব্ধতা আমার ভাল লাগে না।
তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
করো না। একটা লম্বামতো ছেলে, খুব ফর্সা, কাঁধে একটা বাঁদর নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, ছেলেটা কে বলো তো!
পান্না হি হি করে হেসে ফেলল, ও তো বিজুদা, ওর অদ্ভুত অদ্ভুত সব কাণ্ড। কোথা থেকে একটা বাঁদর এনেছে পুষবে বলে। আমাদের গায়ে ছেড়ে দেয় মাঝে মাঝে। যা ভয় পাই না।
দ্যাট হিরো!
বিজুদা কিন্তু ভীষণ ভাল। ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র।
উনি একজন ডু গুডার, তাই না?
হ্যাঁ। কেন বলো তো?
কাল যখন তোমরা ভাসানে যাচ্ছিলে তখন আমাকে একা প্যান্ডেলের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উনি এসে বললেন, তুমি যাবে না খুকি?
এই যে তুমি বললে তোমাকে কেউ ডাকেনি? বিজুদা তো ডেকেছিল।
মাথা নেড়ে সোহাগ বলল, মোটেই ডাকেনি।
তা হলে?
উনি কথাটা এমনভাবে বলেছিলেন যাতে আমি খুব অপমান বোধ করেছি।
সে কী? বিজুদা তো সেরকম নয়।
জুতোর পেরেক কোথায় ফোটে তা টের পায় শুধু জুতোটা যে পরে। আর আমি কি খুকি?
ওঃ, খুকি বলায় তুমি রাগ করেছ বুঝি?
সেটাও একটা কারণ। আর বলার ধরনটাও ছিল ঠাট্টার মতো। আমার একটুও ভাল লাগেনি।
তুমি ভুল বুঝেছ সোহাগ। বিজুদা সেরকম ছেলেই নয়।
সেটা তোমার চোখে। আমার চোখে নয়।
তোমাকে বিজুদা অপমান করবে কেন বলো তো! তুমি তো কিছু করোনি।
করেছি। আমি ওঁর সাহায্য রিফিউজ করেছি। যে বাজে ছেলেগুলো আমাকে দেখে কমেন্ট করত উনি তাদের শাসন করতে চেয়েছিলেন। আমি বড়মাকে বলে দিয়েছি ওর সাহায্যের কোনও প্রয়োজন আমার নেই।
ও, তুমি ভীষণ একগুঁয়ে মেয়ে। ছেলেগুলোকে যে একটু ভয় দেখানো দরকার সেটা কেন বোঝো না। প্রশ্রয় দিলে যে বাড়াবাড়ি করতে থাকবে। তোমাকে দেখে যে ভীষণ খারাপ খারাপ কথা বলছিল সেদিন।
সবাই ওকথা বলে।
কিন্তু আমার কথা হল, লড়াই যদি করতেই হয় তবে আমিই করব। আমার কোনও বডিগার্ডের দরকার নেই।
পান্না খুব ক্লান্তি বোধ করে চোখ বুজল। সোহাগকে তার মাঝে মাঝে খুব ভাল লাগে, মাঝে মাঝে খুব খারাপ। এখন খারাপ লাগছে।
সন্ধেবেলা একজন ডাক্তারকে ধরে নিয়ে এল বাবা। নতুন ডাক্তার। জ্বরের ঘোরে খুব আবছা চেহারাটা দেখতে পেল পান্না। লোডশেডিং বলে হ্যারিকেনের আলো জ্বলছে। সেই আলোয় বড় বড় ছায়া পড়েছে চারদিকে। ভূত-ভূত আলো-আঁধারিতে সবকিছুই যেন ভাসমান।
মাথার যন্ত্রণায় চোখে জল আসছে। সেই অস্পষ্ট চোখে সে হঠাৎ আবিষ্কার করল, ডাক্তারের মুখটা খুব গম্ভীর। তার কি তবে সাংঘাতিক কিছু হয়েছে? সে কি মরে যাবে?
আমার কী হয়েছে ডাক্তারবাবু?
স্টেথোস্কোপ বুকে লাগিয়ে ডাক্তার গম্ভীর গলায় বলল, কথা বলবেন না। জোরে শ্বাস নিন।
আমার সারা গায়ে খুব ব্যথা।
জানি। ব্যথা হওয়ারই কথা। জোরে শ্বাস নিন।
বুকে লাগছে যে শ্বাস নিতে।
যতটা জোরে পারেন।
আমি মরে যাচ্ছি না তো!
মরা কি মুখের কথা? দেখি পাশ ফিরে শোন তো একটু।
ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া নয় তো! কিংবা মেনিনজাইটিস।
আজকাল রুগিরা বেশ ভাল ডাক্তারি বুঝে গেছে দেখছি।
একটু আগে আমার মা পাশে বসে কাঁদছিল যে!
মায়েরা অল্পেই কাঁদে।
আপনি গম্ভীর কেন? বাবার মুখেও হাসি নেই।
আপনি চোখ বুজে থাকলেই ভাল হয়। আপনার কিছু হয়নি তেমন। পালসটা একটু দেখি।
লেপের তলা থেকে হাতখানা বের করে দিতেই যেন কত পরিশ্রম হল পান্নার।
এবার জিবটা বের করুন।…এবার হাঁ করুন তো, গলাটা একটু দেখব।
প্লিজ চামচ ঢোকাবেন না কিন্তু, আমার বমি হয়ে যাবে।
আচ্ছা আচ্ছা, চামচ ছাড়াই দেখে নিচ্ছি। বড় করে হাঁ করুন।
মণিরাম জ্যাঠাও এইভাবেই দেখতেন। খুব মন দিয়ে। নাড়ি ধরে অনেকক্ষণ চোখ বুজে থাকতেন। স্টেথোস্কোপ বসাতেন চেপে চেপে। নানারকম প্রশ্ন করতেন। পায়খানা, পেচ্ছাপ, খিদে সবকিছুর খতেন নিয়ে তবে প্রেসক্রিপশন লিখতেন। এ ডাক্তার অবশ্য অত সময় নিল না। প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বলল, জ্বর খুব বাড়লে ঠান্ডা জলে গা স্পঞ্জ করে পাখার বাতাস করবেন। জ্বর নেমে যাবে। প্যারাসিটামলটা দুবারের বেশি দেবেন না।
মা অবাক হয়ে বলে, ঠান্ডা জলে?
হ্যাঁ। ভয় নেই, কিছু হবে না।
ডাক্তারটা বোধহয় পাগল। এমনিতেই শীতে মরে যাচ্ছে পান্না, ঠান্ডা জল গায়ে দিলে সে তক্ষুনি হার্টফেল করবে।
