মায়ের বারণ তেমন না শুনলেও চলে। মা কিছু নরম মানুষ। আর বাড়ির লোকের তো সবটাতেই বারণ। শুনলে কি চলে? তাদের তিন বাড়ির প্রায় সব মেয়েই যখন যাচ্ছে তখন পান্নাই বা পড়ে থাকবে কেন?
কিন্তু নিগ্রোর মাথার মতো মেঘটা একটু চিন্তায় ফেলেছিল পান্নাকে। মেঘটা ফুঁসে ফুলে উঠেছিল ক্রমে। যেন হঠাৎ এক অদৃশ্য আগ্নেয়গিরি মাটি খুঁড়ে উঠে এসেছে, ওগড়াচ্ছে তার ভিতরের চেপে রাখা রাগ।
বাদ্যিবাজনাসহ সামনে একটা পদাতিক মিছিল, পেছনে প্রতিমাসহ মেয়েদের লরি, তার পিছনে আরও দুটো লরিতে ক্লাব আর পাড়ার ছেলেমেয়েরা। লরির খোলের মধ্যে পাতা শতরঞ্চিতে ঠাসাঠাসি বসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে এক একবার আততায়ী মেঘটাকে দেখছিল পান্না। দেখেছিল পরমাণু বোমার মতো বিশাল ছত্রাকে আকাশের অর্ধেক ঢেকে ফেলেছে প্রায়, ছত্রাকের নীচে পাঁশুটে এক অতিকায় স্তম্ভ। সত্যিই কি অ্যাটম বোমা ফেলল নাকি কেউ?
দুটো কারণে মেঘটাকে ভয় পাচ্ছিল পান্না। এক তো আজকের ভাসান ভাসিয়ে দেবে। দ্বিতীয়ত, তার সর্দির ধাত। একটু ঠান্ডা লাগলেই ফুচফুচ হাঁচি আর খুকখুক কাশি আর ঘুসঘুসে জ্বর আর টিপটিপ মাথা ধরা। বৃষ্টির জল তার একদম সয় না। আর কেউ তার মতো নয়। আর সবাই বৃষ্টিতে ভিজে ঠিকঠাক থাকবে, পান্না থাকবে না। তবু বিজয়া দশমী বলে কথা। আজ একটু হুল্লোড় না করলে চলে? পান্না চেপে বসে রইল।
বৃষ্টির আগে একটা বাতাস আসবেই। অগ্রদূত। বাতাসে বৃষ্টির মিঠে গন্ধটা থাকে, আর থাকে হিম। ঝোড়ো বাতাসটা ওই ভিড়ের মধ্যেও ঠিক পান্নাকে খুঁজে নিয়ে ছুঁয়ে ফেলল, চোর চোর খেলার চোরের মতো। গায়ে কাঁটা দিল পান্নার।
মেঘ গম্ভীর গলায় সিংহের মতো ডেকে উঠল দূরে। তারপর গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসতে লাগল। এসব ঘটনা কেউ গায়ে মাখল না, কিন্তু পান্না আঁচল তুলে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টায় মাথা ঢাকা দিয়েছিল। বৃথা চেষ্টা।
পান্নাকে লক্ষ করে বরফকুচির মতো প্রথম বৃষ্টির ফোঁটাটি নিক্ষেপ করল মেঘ। পান্না কেঁপে উঠল শীতে। তারপর সরু, ঠান্ডা ভূতের অজস্র আঙুলে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল বৃষ্টি। নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা ছেড়ে অসহায়ভাবে পান্না শুধু বলেছিল, হায় ভগবান!
আর সেই বৃষ্টিতে আনন্দে অনেকেই কোলাহল তুলেছিল। বিশেষ করে বাচ্চারা। তারা যে-কোনও অঘটনই খুব পছন্দ করে। ভিজছে আর আনন্দে হি-হি করে হাসছে। হাত বাড়িয়ে চেটো পেতে ধরার চেষ্টা করছে বৃষ্টির জল।
আনন্দ পান্নাও করেছিল কিছুক্ষণ।
বৃষ্টির মধ্যেই দহের ফুটন্ত জলে প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে জলে নেমে দাপাদাপি করেছিল অনেকে। পান্না নামেনি। শরীর জুড়ে জ্বরের ঝংকার টের পাচ্ছিল সে।
পারুলদি বলল, এমা! তোর কী হবে রে পান্না?
কী আবার। জ্বর আসবে।
তুই যে কেন এলি! ছাতা-টাতা কিছু আনিসনি?
পাগল! বিসর্জনে কেউ ছাতা আনে?
শোন, তুই বরং ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বোস। আর ভিজিস না। যা ঠান্ডা জল!
ওখানে বসলে যে আলাদা হয়ে যাব।
কিছু আলাদা হবি না। সবাই তো সঙ্গেই রয়েছে। দাঁড়া, বিজুকে বলছি তোকে সামনে তুলে দিক।
তাই হল শেষ অবধি। ড্রাইভারের পাশে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল। আরও জনা দুই বুড়োবুড়ি। তাদের পাশে ঠাস হয়ে বসে ফেরার সময়ে পান্নার শরীর ভেঙে আসছিল। ভেজা শাড়ি শায়া, ভেজা শরীরে বাতাস লেগে শিহরিত হচ্ছিল গা।
যখন বাড়িতে এসে পৌঁছল তখন একশো দুই জ্বর। সকালে উঠল চারে। এবং দুপুরে সাড়ে চারে উঠে গেল। চিন্তিত মা ঘরবার করছে। মা মানেই বকুনি, মা মানেই শাসন।
কতবার বারণ করলুম যেতে, তবু শুনলি সেই কথা। তোর কি আর পাঁচটা মেয়ের মতো স্বাভাবিক ধাত? পচা শরীর তোর যখন-তখন ঠান্ডা লাগে, টনসিল ফোলে, তার ওপর ওরকম মুষলধারের বৃষ্টিতে অতক্ষণ ভেজা!
আরও চলত কিছুক্ষণ।
হঠাৎ সেই চিরাচরিত ঝ্যালঝালে লম্বা ঝুলের বিচ্ছিরি জামা পরা একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল দরজায়।
মাই গড! তোমার কি জ্বর? চোখ দুটো তো খুব লাল দেখাচ্ছে!
আবছা একটু হাসল পান্না। ক্ষীণ গলায় বলল, ওই চেয়ারটা টেনে বোসো।
কাল খুব ভিজেছ বুঝি?
হ্যাঁ।
শুনেছি তোমরা সব ভাসানে গিয়েছিলে।
তুমিও গেলে না কেন সোহাগ? কতবার বললুম।
অত ভিড় আমার ভাল লাগে না। আর যা শব্দ।
খুব আনন্দ হয়েছিল কিন্তু।
মুখ টিপে হেসে সোহাগ বলে, একটু একটু ইচ্ছেও হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ভাবলাম, আমি তো অনেককেই চিনি না।
যাঃ, না চেনার কী আছে! প্রতিমার লরিতে তো আমরাই সব ছিলাম বাবা। সব মেয়েরা। তোমার গডেসও ছিল।
সোহাগ একটু হাসল। তারপর ফের বলল, একটু একটু ইচ্ছে যে হয়নি তা নয়। চুপি চুপি গিয়ে প্যান্ডেলের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু কেউ ডাকল না দেখে আর এগোইনি৷
আমি দেখতে পেলে ঠিক তোমাকে তুলে নিতাম।
তোমাকেই খুঁজছিলাম। দেখতেই পেলাম না ভিড়ের মধ্যে। এই জন্যই ভিড় আমার ভাল লাগে না। ভিড়ে আইডেন্টিটি হারিয়ে যায়।
সবুজ সংঘের পুজো অনেকটা বাড়ির পুজোর মতোই। অচেনা তো কেউ নয়।
আমার কাছে সবাই প্রায় অচেনা।
তা অবশ্য ঠিক।
তোমরা চলে যাওয়ার পর আমার একটু মন খারাপ লাগছিল। মনে হল, আমি আর একটু মিশুক হলে ভাল হত।
তুমি কি লাজুক?
ঠিক তা নয়।
তবে কি অহংকারী?
একটু বোধহয় তাই। সবাইকে ইনফিরিয়র ভাবা ভীষণ অন্যায় জানি। কিন্তু আমার ওই এক স্বভাব।
