অহংকার কি ভাল অমলদা?
অহংকারকে সাধকরা জয় করেন, সে অন্য ব্যাপার। অনেক মহৎ কাজ। আমার তো তা নয়। আমার হল ইনফিরিয়ারিটি কমপ্লেক্স।
ইনফিরিয়ারিটি কমপ্লেক্স বলে কিছু হয় না তা জানো?
মনোবিজ্ঞানে না থাক, কথাটা তো চালু আছে পারুল। যা বোঝার বুঝে নাও।
আজ অনেক দুঃখের কথা বলেছ। আর নয়। রাত দেড়টা বাজে। এবার বাড়ি যাও। ঘাড়ে গলায় জল দিও, চোখে ভাল করে জলের ঝাপটা দিও, জয়েন্টগুলো ভিজিয়ে নিও। তারপর ঘুমোও।
নির্বোধের ঘুমের অভাব হয় না। আমার ঘুম খুব গাঢ়। ইদানীং হঠাৎ হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। ঘুম ভেঙেছিল বলেই হাঁটতে হাঁটতে যাত্রা দেখতে চলে এলাম। ভাগ্য ভাল, তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
ভাগ্য ভাল না খারাপ তা কে বলবে? আমার মনটা আজ তুমি খারাপ করে দিয়েছ।
আচ্ছা আমি কি একটু বেশি কথা বলছি বলে তোমার মনে হয়?
না তো! বেশি বলেনি, তবে যা বলেছ সবই নেগেটিভ কথা।
আমার মনে হয়, আজকাল বোধহয় আমি একা একাও কথা বলি।
ওরকম ভেবো না অমলদা। নিজেকে নিয়ে বেশি ভাবলে শেষে তুমি ক্ষ্যাপাটে হয়ে যাবে।
ক্ষ্যাপাটে কি এখনই নই পারুল? বলে মৃদু মৃদু হাসতে থাকে অমল।
মায়াভরা চোখে তার দিকে চেয়ে থেকে পারুল বলে, একটু ক্ষ্যাপাটে হওয়া পুরুষমানুষদের পক্ষে মন্দ নয়। হিসেবি, কৃপণ, উচ্চাকাঙ্ক্ষীর চেয়ে বরং একটু ক্ষ্যাপাটে হওয়া ভাল।
একটা কথা জিজ্ঞেস করব? খুব সংকোচ হচ্ছে।
সংকোচের কী? বলো।
আমাদের সম্পর্কের কথাটা কি জ্যোতিপ্রকাশবাবুকে বলেছ?
বলেছি।
সেই ঘটনাটার কথাও?
পারুল ঠোঁট কামড়াল, চাপা গলায় বলল, হ্যাঁ।
উনি কিছু মনে করেননি!
মনের কথা জানি না। তবে আমাকে গ্রহণ করেছেন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অমল বলে, উনি তাহলে শক্তিমান পুরুষ। তুমি ঠিক মানুষকেই পেয়েছ পারুল।
হিসেবটা অত সহজ নয়। সুন্দরীদের কিছু প্লাস পয়েন্ট থাকে। তাদের অনেক দোষঘাট রূপের তলায় চাপা পড়ে যায়। পরস্পরের মনের কথা ইহজীবনে কি সবটা বোঝা যায়?
উদাস মুখে অমল বলে, তাই হবে। অত জানার দরকারই বা কী?
একটা কথা বলি। অ্যালবাম থেকে আমার ফটোটা সরিয়ে নষ্ট করে দিও।
অবাক হয়ে অমল বলে, নষ্ট করব? নষ্ট করলে আমি কী নিয়ে থাকব পারুল? আমরা কী নিয়ে থাকব?
.
১৭.
মানুষের শরীরের ভিতরে যেসব হাজারো জটিলতা রয়েছে তার খবর পান্নার জানা নেই। কিন্তু কণ্ঠনালির ভিতরে শ্বাস আর খাদ্যের নলের মধ্যে যে একটি ভয়ংকর বিপজ্জনক ফোকর রয়েছে সে খবরটা সে খুব ভাল জানে। যখন ছোট ছিল, অস্পষ্ট স্মৃতির সেই সময়ে কেউ তাকে ভয়টা দেখিয়ে রেখেছিল, খাদ্যনালি থেকে মাঝে মাঝে ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল শ্বাসনালিতে গিয়ে আটকে দম বন্ধ করে দেয়। সেই শৈশবের শেখা ভয় পান্নাকে আজও ছাড়েনি। বরং যত বয়স বাড়ছে তত ভয় বাড়ছে। জ্ঞানবয়সে আজ অবধি ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল গিলে খেতে পারল না পান্না।
এ-বাড়ির বাঁধা ডাক্তার ছিলেন মণিরাম। ধুতি জামা পরা ডাক্তার আজকাল আর দেখা যায় না। মণিরাম সেই বিরলবেশের ডাক্তার। কে জানে ওই পোশাকের জন্যই শেষ দিকটায় মণিরামের পশার কমে গিয়েছিল কিনা। ধুতি পরা ডাক্তার দেখে অকারণেই এ যুগের রুগিরা নাক সিঁটকোয়। ঠিক ঠিক নির্ভর করতে পারে না বোধহয়। কিন্তু মণিরাম বিচক্ষণ ডাক্তারই ছিলেন। বর্ধমান থেকেও তাঁর ডাক পড়ত। ইদানীং জনা দুই ছোকরা প্যান্ট-শার্ট পরা ডাক্তার এসে মণিরামকে অস্তাচলে ঠেলে দিয়েছিল।
মণিরামই পান্নাকে বলেছিলেন, ক্যাপসুল গিলতে পারিস না, কিন্তু অত বড় ভাতের গরাসটা গিলিস কী করে?
ভাতের গ্রাস আর ক্যাপসুল কি এক হল জ্যাঠামশাই?
না, তা হল না। কারণ ক্যাপসুল ভাতের গরাসের চেয়ে অনেক ছোট।
তা হোক, ক্যাপসুল বলে কথা। ও আমি গিলতে পারব না। জলে গুলে খেয়ে নেব।
মণিরাম মাথা নেড়ে বলতেন, সে তো অশৈলী কাণ্ড। সব ট্যাবলেট আর ক্যাপসুল কি গুলে খাওয়া যায়? খাওয়া উচিতও নয়। খা দেখি আমার সামনে, কেমন না পারিস।
পান্না পারেনি। চেষ্টা করেছিল, কিংবা বলা ভাল চেষ্টা করার ভান করেছিল, তারপর জলসুদ্ধ ক্যাপসুল ফেলে দিয়েছিল মেঝেয়। মা সেই ভেজা ক্যাপসুল কুড়িয়ে শেষে জলে গুলেই খাইয়েছিল। মণিরাম মাথা নেড়ে বলেছিলেন, এভাবে তো সারাজীবন পারবি না। এখন থেকে ছোট ছোট হোমিওপ্যাথিক বা বায়োকেমিক ট্যাবলেট গিলে গিলে প্র্যাকটিস কর। নইলে পরে বিপদে পড়বি।
প্র্যাকটিস আর করা হয়নি। কণ্ঠনালির রহস্যময় জটিলতা তাকে আজও আতঙ্কিত করে।
ডা. মণিরাম বেঁচে নেই। তাঁর পুরনো স্টেথোস্কোপ, প্রেশার মাপার যন্ত্র, গোরু-ছাগল-পুকুর-জমি-বাড়ি সব পড়ে আছে। ছেলেরা কেউ ডাক্তার হয়নি বলে স্টেথো আর প্রেশারের যন্ত্রে ধুলো পড়ছে।
পান্নার জ্বর এল বিজয়া দশমীর শেষ রাতে। জ্বর যে আসবে তা পান্নার জানাই ছিল। বিজয়া দশমীর বিকেলে নিগ্রোর চুলের মতো কোঁকড়া ও কালো একটা মেঘ দিগন্তে আততায়ীর মতো উঠে এল। তখন প্রতিমা লরির খোলে ভোলা হয়ে গেছে আর মেয়েরা সব হাঁচোড়-পাঁচোড় করে উঠছে লরিতে। লরিতে ওঠাও যেন এক যুদ্ধ। টুলের ওপর দাঁড়িয়ে শাড়ি সামলে উঠতে গিয়ে সে মুখ থুবড়ে পড়ল লরির নোংরা পাটাতনে।
মা অবশ্য বারণ করেছিল, যাসনি পান্না। দহে অনেক জল। তুই কিন্তু সাঁতার জানিস না।
