পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বগতোক্তির মতো বলল, পাগল।
হ্যাঁ পারুল, সোহাগ প্রবলেম চাইল্ড। স্বাভাবিক নয়। ওর একটা অদ্ভুত মনোজগৎ আছে, যেটাকে আমি বুঝতে পারি না। ও আমাদের বাধ্য নয়। ও আমাকে অনেকবার বলেছে, তোমার ছবিটা দেখলে নাকি ওর মন ভাল হয়ে যায়।
এসব শুনে আমার একটু ভয়-ভয় করছে। এরকম কেন হবে?
শুধু সোহাগ নয়, আমার ছেলে বুডঢার মুখেও শুনেছি। মোনা মুখে অতটা বলেনি বটে, কিন্তু অসম্ভব নয় যে, মোনাও তোমার একজন ভক্ত।
পারুল প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, কী যে সব কাণ্ড তোমাদের কিছু বুঝতে পারি না বাবা! এখন তো ওদের সঙ্গে দেখা করতেই আমার ভীষণ লজ্জা করবে। ভেবে রেখেছিলাম মহিমকাকাকে বিজয়ার প্রণাম করতে গিয়ে ওদের সঙ্গে পরিচয় করে আসব। দেখছি তা আর হবে না।
পালাবে পারুল? তাতেই কি সব উলটে যাবে?
আমার আড়ালে আমাকে নিয়ে যা খুশি হোক, আমাকে তো আর সাক্ষী থাকতে হবে না। না বাপু, এসব মোটেই ভাল কথা নয়।
অমল বিষণ্ণ গলায় খুব ধীরে ধীরে বলল, আমাকে তুমি তোমার জীবন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলে পারুল। আমার কোনও চিহ্নই রাখোনি। কিন্তু আমরা তোমাকে বুকে তুলে নিয়েছি। যত অদ্ভুতভাবেই হোক, তোমাকে এক ধরনের অ্যাকসেপটেন্স দিয়েছে আমার পরিবার। ব্যাপারটা আমার ভালই লাগে।
কিন্তু আমার ভয় করে, লজ্জা হয়।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। জায়গাটা খুব একটা নির্জন বা শব্দহীন নয়। অদূরে ঝোপঝাড়ে অনেকে এসে পেচ্ছাপ করে যাচ্ছে। যাতায়াত করছে অনেক মানুষ। মাইক বাজছে, কোলাহল শোনা যাচ্ছে।
এবার আমি যাই অমলদা?
যাবে! চলল, একটু এগিয়ে দিই।
তার দরকার নেই। ওই তো বাড়ি দেখা যাচ্ছে। তুমি বরং একবার বাড়িতে এসো। আমার কর্তার সঙ্গে পরিচয় করে যেও।
ম্লান মুখে অমল বলে, কতবার যাব বলে তোমাদের বাড়ির ফটক অবধি গেছি। কেন যে শেষ অবধি ঢুকতে পারিনি তা জানি না। ফটক থেকেই ফিরে এসেছি।
এত লাজুক তো তুমি ছিলে না।
না পারুল, এটা লাজুক বলে নয়। আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে। কেন যেন মনে হয় আমি ভুলভাল কথা বলে ফেলব, অদ্ভুত কিছু করে ফেলব।
ওমা! ওরকম কেন মনে হয় তোমার?
সেইটেই বুঝতে পারি না। আমার আজকাল এমনও মনে হয় যে, লোকে আমাকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করে।
উদ্বিগ্ন পারুল বলে, অমলদা, তুমি কি ভুলে গেছ যে, তুমি একজন ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিলে! তোমার কত ডিগ্রি, কত বড় চাকরি, কত সম্মান!
আমার মেধা, ডিগ্রি বা সম্মানকে কি আজ তুমি মূল্য দাও পারুল? একদিন কিন্তু সব মাড়িয়ে দিয়ে তুমি আমার জীবন থেকে সরে গিয়েছিলে।
সেটা অন্য প্রসঙ্গ অমলদা। অন্য ঘটনা। তোমার গুণের দাম কি তা বলে কমে গেছে।
অমল মাথা নেড়ে বলে, ওসব দিয়ে কিছু হয় না পারুল। ডিগ্রি হল, চাকরি হল, টাকা হল, তবু মনে হয় কী করে জীবনযাপন করতে হয় সেটাই তো এখনও জানা হল না।
এত ফ্রাষ্ট্রেশন কেন তোমার? আমার জন্যই কি?
তোমার জন্যই কিছুটা। কিন্তু সবটুকু বোধহয় তুমি নও। ধরো যদি তোমাকে বিয়ে করতে পারতাম তা হলে কি তুমি আমার কাছে ক্ৰমে পুরনো এক অভ্যাসের মতো হয়ে যেতে না? বরং বিয়ে হয়নি বলেই আজও অ্যালবাম খুলে তোমার ছবি দেখি। বিয়ে করা বউয়ের ছবির দিকে কেউ কি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে? না পারুল, তোমাকে অন্যভাবে তো পেয়েছিই। আরও ভালভাবে।
বেশ বললে! শুনে কান জুড়িয়ে গেল। কিন্তু তোমার এই হতশ্রী দশা তবে কেন হল বলো তোর
বুঝতে পারি না পারুল। যত দিন যাচ্ছে তত মনে হচ্ছে, ছাইভস্ম অনেক শিখলুম, কিন্তু তা দিয়ে কিছু হয় না।
একটা কথা সত্যি করে বলবে?
বলব না কেন? তোমাকে তো সবই বলা যায়। যায় না পারুল?
না যায় না! সব আমাকে কেন বলবে অমলদা? বোলো না। আমি শুধু জানতে চাই নিজের বউয়ের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কেমন?
মাথা নেড়ে অমল বলে, ভাল নয়। একটুও ভাল নয়। প্রথম প্রথম একরকম ছিল। বিয়ের পরেই ও তোমার কথা জানতে পারে, কিছু অশান্তিও হয়। আবার একটা আপসরফাও হয়ে গিয়েছিল। তারপর কেমন করে যেন একটা ঘেন্নার সম্পর্ক তৈরি হল। সামান্য ছুতোনাতায় পরস্পরকে অপছন্দের মাত্রা বাড়তে লাগল। আক্রোশে হাত কামড়াতে ইচ্ছে করত। কিন্তু তবু সে একরকম ছিল, আক্রোশ-ঘেন্নাও একটা সম্পর্ক বজায় রাখে। কিন্তু ভয়াবহ হল ঠান্ডা উদাসীনতা। কী বলব তোমাকে, এখন ওকে সামনে দেখেও ওর কথা মনে পড়ে না।
তুমি সাইকিয়াট্রিস্ট দেখিয়েছ?
অমল একটু মলিন হেসে বলে, সাইকিয়াট্রিস্টরাই এখন সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত ডাক্তার। সাইকিয়াট্রিস্ট, ম্যারেজ কাউন্সেলর কিছু বাকি নেই।
তা হলে তোমার প্রবলেম তো খুব অ্যাকিউট।
হ্যাঁ। কিন্তু ওসব নিয়ে ভেবো না পারুল। আমার কথা বাদ দিয়ে এবার তোমার কথা বলো।
আমার তো কথা কিছু নেই।
শুনেছি জ্যোতিপ্রকাশ গাঙ্গুলি একজন ভাল মানুষ।
সে তার মতো ভাল।
কথাটার মানে কী পারুল?
তোমার মতো অত কোয়ালিফিকেশন তার নেই। অনেক কষ্ট করে, নিজের চেষ্টায় যা হওয়ার হয়েছে।
অমল একটু হেসে বলে, আমাকে কি একটু খোঁচা দিলে নাকি পারুল? দাও। খোঁচাটা আমার ভালই লাগল।
মোটেই খোঁচা দিইনি। জানতে চাইলে বলে বললাম।
বুঝলে, আগে খুব অহংকার ছিল আমার। ব্রিলিয়ান্ট বা কাজের লোক দেখলে হিংসে হত। মনে হত আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ বুঝি কেউ নেই। এখন হয়েছে তার উলটো। একটা ন্যালাক্ষ্যাপা লোককেও মনে হয় আমার চেয়ে বড় মানুষ বুঝিবা। অহংকারটা যে কোথায় গেল কে জানে।
