কয়েকটি মেয়ে এসে কুলসুমকে ধরে নিয়ে গেল। কুলসুমের ঝলমলে পোশাক-পরা বাবা স্টেজ জুড়ে দাপাদাপি করে নিজের বংশপরিচয় দিয়ে যেতে লাগল…
এসব ভাল লাগার জন্য যতখানি মস্তিষ্কহীন হওয়া দরকার ততটা এখনও হতে পারেনি অমল। যখন ভাল লাগত তখন ছিল ভাল লাগারই বয়স। পারিপার্শ্বিকে যাই ঘটুক বুভুক্ষুর মতো গিলে খেত সে। রাজরাজড়াদের গল্প, পৌরাণিক কাহিনী, চাঁদ সদাগর, মনসা মাহাত্ম্য কিছুই খারাপ লাগত না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠতে যাচ্ছিল অমল।
একটা লম্বা ছিপছিপে ছেলে কাছে এসে বলল, উঠছেন?
হ্যাঁ।
মণ্ডপের পিছনে পারুলদি অপেক্ষা করছেন। একটু দেখা করে যাবেন।
হাঁ করে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল অমল। বুকটায় ধকধক হচ্ছে।
আমি বিজু। চিনতে পারছেন না?
অমল হাসল, হ্যাঁ হ্যাঁ। কত বড় হয়ে গেছ।
সেদিনও তো দেখা হল আপনার সঙ্গে।
অমল অপ্রতিভ হয়ে বলে, কিছু মনে থাকে না আজকাল। তুমি কেমন আছ বিজু? কী করছ?
এখনও কিছু করছি না। পাস-টাস করে বসে আছি।
ভিতরে তাড়াহুড়ো অনুভব করছে অমল। বিজু কী পাস করেছে তা আর জানার ইচ্ছে হল না তার। বলল, আচ্ছা আচ্ছা, বেশ ভাল।
আলোয়ানের এক প্রান্ত খসে পড়েছিল মাটিতে। টানতে গিয়ে চেয়ারের সঙ্গে আটকে গিয়ে চেয়ারটাই পড়ে যাচ্ছিল কাত হয়ে। বিজু চেয়ারটা ধরে ফেলে আলোয়ানটা ছাড়িয়ে কাঁধে তুলে দিয়ে বলল, সাবধানে যাবেন।
একটু দিগভ্রান্ত অমল আসর থেকে বেরিয়ে মণ্ডপটা কোনদিকে তা বুঝতে পারছিল না। এত ভিড় চারদিকে। ঠাহর করতে একটু সময় লাগল তার। তাড়াহুড়োয় পড়লে মানুষের কতরকম ঠিক ভুল যে হতে থাকে।
অমলদা!
অন্ধকারে মুখটা প্রথমে দেখাই গেল না। ফিকে অন্ধকারে পারুল দাঁড়িয়ে।
পারুল!
চেহারাটা কী করেছ বলো তো!
কেন, খারাপ দেখছ?
রোগামোটার কথা বলছি না। অমন উলোঝুলো কেন? দাড়ি কামাওনি, চুল আঁচড়াওনি, দোমড়ানো পাজামা, বিচ্ছিরি আলোয়ান–এ কী রকম ভাব তোমার!
অমল হাসল, আসলে ঘুম আসছিল না বলে হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। হাঁটতে হাঁটতে যাত্রা হচ্ছে দেখে ঢুকে পড়েছি।
কতকাল পরে দেখা, কিন্তু এমন পোশাকে আর চেহারা দেখে চমকে গিয়েছিলাম। কই, বাড়িতে এলে না তো! খবর পাঠিয়েছিলাম ধীরেন খুড়োকে দিয়ে, বলেনি?
বলেছে।
তবে?
অমল শ্বাসকষ্ট টের পাচ্ছে। শরীর কাঁপছে এখনও। মৃদু স্বরে বলল, কোন মুখে আসব বলো! খুব লজ্জা হচ্ছিল।
পুরনো কথা ভাবো বুঝি খুব?
ভাবব না?
আমি তো ভেবেছিলাম, তুমি এখন মস্ত মানুষ হয়েছ, বিরাট চাকরি, অনেক দায়িত্ব, ঘন ঘন দেশ বিদেশ যেতে হয়, তুমি নিশ্চয়ই পুরনো কথা মনে রাখোনি।
অমল একটু চুপ করে থেকে বুকের থরথরানিটা সামলানোর চেষ্টা করতে লাগল। তারপর বলল, সেরকমই তো হওয়ার কথা। কিন্তু আমার আজকাল কী যেন হয়েছে।
কী হয়েছে?
আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে। ইন্ট্রোভার্ট হয়ে যাচ্ছি।
আত্মবিশ্বাস কমছে কেন?
পারুলকে এবার চারদিকের আলোর আভায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল অমল। বলল, সামথিং ইজ রং। কিন্তু এসব কথা থাক। তোমার কথা বলো।
আমি! আমার আর কী কথা বলল। আর পাঁচজন মেয়ের মতোই ঘরসংসার করছি। নতুন কিছু নয়।
ভাল আছ তো পারুল? সব দিক দিয়ে ভাল?
তাই কি হয়? সব দিক দিয়ে কেউ কি ভাল থাকে?
তোমাকে বেশ ভাল দেখাচ্ছে। এখনও বয়সের ছাপ পড়েনি। দেখে মনে হয়, তুমি সুখী হয়েছ। তাই না?
নিজের কথা নিজে কি বলতে পারি? কিন্তু তোমাকে দেখে আমার একটুও ভাল লাগছে না।
অমল মাথা নেড়ে বলে, আমি ভাল নেই। কিংবা আমি যে কেমন আছি তা বুঝতে পারছি না।
কোনও অসুখ-টসুখ করেনি তো!
না, তেমন কিছু অসুখ আছে বলে জানি না। আর থাকলেই বা কী! ওসব নিয়ে ভাববার কিছু নেই।
বউয়ের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?
ভালই।
জিজ্ঞেস করলাম বলে কিছু মনে করলে না তো! এ প্রশ্নটা আমি তোমাকে করতেই পারি, তাই না?
হ্যাঁ, পারোই তো! মোনাও তোমার কথা জানে।
পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, শুধু মোনা নয়, তোমার মেয়ে সোহাগও জানে। আর সেইটেই দুঃখের কথা। তুমি ওদের কাছে সব বলে দিয়েছ। কাজটা ভাল করোনি অমলদা।
অমল অপ্রতিভ হয়ে বলে, কী থেকে যে কী হয়ে যায় তা বলা মুশকিল। আমি আজকাল নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। কিন্তু ভারী আশ্চর্যের কথা, ওরা যেমনই হোক, তোমাকে কেউ অপছন্দ করে না। কী করে যে এটা সম্ভব হয় বুঝতে পারি না।
পারুল একটু হাসল, সোহাগ আমাকে গডেস বলে মনে করে। সেটা আবার আমার পক্ষে অস্বস্তিকর। তোমার বউ কী মনে করে তা অবশ্য জানি না।
অমল মাথা নেড়ে বলে, বললে তুমি বিশ্বাস করবে না।
কেন করব না?
অবিশ্বাস্য। সে তোমার সম্পর্কে কখনও একটিও খারাপ কথা বলে না। একবারের জন্যও না। বরং একবার অ্যালবামে তোমার ছবিটা দেখছিলাম, দেখে বলেছিল, দেখ দেখ, তোমার বিবেক জাগ্রত হোক।
হেসে ফেলল পারুল, যাঃ।
বললাম তো, তোমার বিশ্বাস হবে না।
অ্যালবামে আমার ছবি রাখার কী দরকার ছিল?
আমি তো রাখিনি। ছবিটা আমার পারসোনাল ফোল্ডারে ছিল। সেটা অ্যালবামে রেখেছে মোনা। তোমার বোধহয় একটা হিপনোটিজম আছে পারুল।
ওসব বাজে কথা। আমি খুব সাধারণ একটা মেয়ে। সোহাগ আমাকে কেন গডেস ভাবে বলল তো! আইডিয়াটা কি তুমিই ওর মাথায় ঢুকিয়েছ?
না পারুল। আমি ওদের মাথায় কখনও কোনও আইডিয়া ঢোকাতে পারিনি। ছেলেমেয়েকে সময়ও দিতে পারলাম কই? দিনরাত ভূতের মতো খেটেছি। ওরা তাই ওদের মতোই হয়েছে। কিছু শিখিয়েছে ওদের মা। আর বাকিটা নিজেরাই শিখে নিয়েছে। তুমি কবে, কী ভাবে সোহাগের জীবনে ঢুকে গেছ তা আমি জানি না।
