শ্বাসকষ্টের মতো একটা কষ্ট হচ্ছিল অমলের। শারীরিক নয়, কষ্টটা অন্যরকম। মাথাটা বড্ড গরম। সে কৃতী ছাত্র, সফল মানুষ। কিন্তু এখন যেন তার সব সফলতা ছাড়া জামাকাপড়ের মতো পড়ে আছে কোথায়। অন্ধকারে বড় বিবসন মন হয় নিজেকে। বড় গৌরবহীন!
অমল উঠল। মশারি তুলে বেরিয়ে একটু জল খেল গেলাস থেকে। চেয়ারের ওপর পাকার হয়ে পড়ে থাকা আলোয়ানটা গায়ে জড়িয়ে নিল সে। ঘুম অসম্ভব। ঘরের মধ্যে সে হাঁফিয়ে উঠছে।
দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে এল সে। জ্যোৎস্না রাত্রি। ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে রেখে সে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল উঠোনে। ভুলু কুকুরটা দু বার ভুক ভুক শব্দ করে দৌড়ে এসে ন্যাজ নাড়তে লাগল। একবার মনে হল, দরজায় তালাটা লাগিয়ে আসে। অ্যাটাচি কেসে কয়েক হাজার টাকা আছে। জরুরি কাগজপত্র, দামি কলম, ক্যালকুলেটর, পারসোন্যাল অর্গানাইজার। চোরের আনাগোনা আছে এখানে। দোনোমোনো করেও ভাবল, থাক গে, গেলে যাবে।
বাইরের ঠান্ডায় এসে বেশ ভাল লাগছিল তার। ঘাসে শিশির জমে আছে। হিম পড়ছে। সামান্য কুয়াশায় জড়ানো ভারী ভুতুড়ে রাত। সে হাঁটতে লাগল। গত কয়েকদিন একা একা ঘাটে আঘাটায় অনেক ঘুরে বেড়িয়েছে সে। মনটা সেই থেকে জড়বস্তুর মতো হয়ে আছে। কোনও উত্তেজনা নেই, আবেগ নেই, রাগ নেই, ঘেন্না নেই, শুধু নিথরতা আছে।
খানিকক্ষণ হাঁটার পর তার মনে হল, এও পণ্ডশ্রম। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্তি আসবে মাত্র।
ছেলেবেলায় গাঁয়ে যাত্রা এলে যেন বারুদে আগুন লাগত। বাবা-মাকে ফাঁকি দিয়ে চুরি করে পালিয়ে গিয়ে কত যাত্রা দেখেছে। সিরাজদ্দৌল্লা, কেদার রাজা, শাজাহান, কঙ্কাবতীর ঘাট, কর্ণার্জুন। সব মনে আছে।
একটু ইচ্ছে, একটু অনিচ্ছের দোটানায় পড়ে খানিকটা সময় গেল। তারপর সে যাত্রার আসরের দিকেই এগোতে লাগল। পকেটে পয়সা নেই। টিকিট কাটতে হলে পারবে না।
না, টিকিট কেটে নয়। খোলা আসরেই যাত্রার আয়োজন হয়েছে। কয়েক হাজার লোকের জমজমাট ভিড়। আশেপাশে বাদাম, তেলেভাজা, ঝালমুড়ির দোকানও বসেছে অনেক। রইরই কাণ্ড।
এত কাল পরে যাত্রা দেখতে কেমন লাগবে কে জানে। ভিড় ঠেলে এগোনোও কঠিন। অমল একটু ঘুরে ফিরে একটু ফাঁকামতো জায়গায় দাঁড়াল। বড় দূরে স্টেজ। কুশীলবকে খুব ভাল করে ঠাহর করা যাচ্ছে না। তবে মাইকের দৌলতে সংলাপ শোনা যাচ্ছে।
জনৈকা কুলসুমের সঙ্গে জনৈক ফিরোজের প্রেমের ডায়ালগ হচ্ছে। ফিরোজ বলছে সে গরিব, পিতৃমাতৃহীন অনাথ, আবদাল্লা নামক জনৈক সওদাগরের অধীনে কাজ করে আর কুলসুম ধনীকন্যা, সুন্দরী, সুতরাং সে বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াতে চায় না। আর কুলসুম বলছে, তার বুকে যে চিরন্তন প্রেমের শিখা জ্বলে উঠেছে তা দিয়ে তারা সব বাধা অতিক্রম করবে।
অমল একটা হাই তুলল। কানের ভিতর দিয়ে বাতাস বেরিয়ে গেল।
কোথা থেকে বুকে ভলান্টিয়ারের ব্যাজ আঁটা একটা ছেলে ছুটে এসে বলল, আরে অমলদা! আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কেন? আসুন আমার সঙ্গে।
অমল সংকুচিত হয়ে বলল, না না, এই তো বেশ আছি।
পাগল! বাইরে দাঁড়ালে ঠান্ডা লেগে যাবে। আসুন, স্টেজের ওপাশে ভি আই পি-দের এনক্লোজারে চেয়ারের ব্যবস্থা আছে।
আমি তো ভাই বেশিক্ষণ দেখব না। চলে যাবো।
তা হোক না। যতক্ষণ খুশি দেখবেন। বিজুদা আমাকে পাঠাল। চলুন।
অনিচ্ছুক পায়ে এগোতে হল অমলকে। ভিড়ের পিছন দিয়ে ছেলেটা পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। গ্রিনরুমের পাশেই স্টেজ ঘেঁষে একটা বাঁশ দিয়ে ঘেরা জায়গায় সারি সারি চেয়ার পাতা। গাঁয়ের মান্যগণ্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা বসে আছে। সামনে জায়গা ছিল না। ছেলেটা কোথা থেকে একটা চেয়ার এনে তাকে সামনের সারির পাশেই বসিয়ে দিয়ে বলল, আমরা আপনাকে ইনভাইট করতে গিয়েছিলাম। চিঠি পাননি?
অমল অস্বস্তি বোধ করে বলল, না তো!
বউদির হাতে কার্ড দিয়ে এসেছিলাম।
ও। তা হবে।
ছেলেটা চলে যাওয়ার পর অমল একবার চারদিকে চেয়ে দেখল। বহু মুখ, বহু মানুষ। সকলেরই স্টেজের দিকে চোখ। নায়িকা স্টেজের ওপর পড়ে ফিরোজ, ফিরোজ চিৎকার করে কাঁদছে। ফিরোজ চলে গেছে। ঝাঁকর ঝাঁকর করে বাদ্যি বাজনা বেজে উঠল। নায়িকা উঠে বসল। তারপর ধীরে ধীরে দাঁড়াল। তারপর দিগন্তের দিকে হাত বাড়িয়ে বিরহের গান ধরল। গানের অর্থ অনেকটা এরকম, কত দূরে যাবে তুমি? আমি যে তোমার হৃদয়ের পিঞ্জরে বসে নিরন্তর তোমার নাম ধরে ডাকব…ইত্যাদি।
ঘুম পাচ্ছিল। ফের একটা হাই তুলল সে। ফের কানের ভিতর দিয়ে বাতাস বেরিয়ে গেল। রাত্রে পায়েস খেয়েছিল একবাটি, অম্বলে গলা জ্বলছে। পায়েসে বড্ড মিষ্টি দেওয়ার ধাত বউদির।
দুটি অপরূপ চোখ ভিড়ের থেকে এক ঝলক তাকে দেখে টপ করে আড়াল হল।
কে?
একটু সচকিত হল অমল। কার চোখে হঠাৎ চোখ পড়ল তার? বারবার লক্ষ করেও বুঝতে পারল না কিছুতেই। অস্বস্তি হচ্ছে। বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে।
বাঁদিক থেকে মেয়ে-পুরুষের একটি দল উঠে চলে যাচ্ছে। রাত হয়েছে। শেষ অবধি অনেকেই থাকে না। হয়তো দূরে যাবে। নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে দলটাকে একটু দেখল অমল।
নায়িকা কুলসুম শাশ্বত প্রেমের জয় ঘোষণা করে যে গান গাইছিল তাতে বাধা পড়ল। কর্কশ এক পুরুষের গলা গর্জন করে উঠল, গান থামাও কুলসুম, তুমি কি আত্মপরিচয় বিস্মৃত হয়েছ? ভুলে গেছ তোমার বংশমর্যাদা?
