সোহাগ কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, আমাকে আজ আমার মাও বোধহয় চিনতে পারবে না।
মণ্ডপে এসে ব্যাপারটা খুব ভাল লাগছিল না সোহাগের। ভিড়, গরম, গণ্ডগোল আর অসহ্য ঢাকের বাজনা। কলকাতায় তারা পুজো দেখে বটে, কিন্তু সেটা সন্ধের পর এবং সেটা শুধু মজা দেখা মাত্র। এখানে সে অঞ্জলিও দেবে, যার কোনও মানে নেই।
ওমা! তুমি এসেছ! কী কাণ্ড! আমি তো তোমাকে চিনতেই পারিনি! এ যে একদম মেটামরফসিস!
এই বলে পান্না তাকে জড়িয়ে ধরল।
সোহাগ হেসে বলে, এ যেন ফ্যান্সি ড্রেস বলের পোশাক হয়ে গেল, না?
এ মা, তা কেন? তোমাকে ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে। মণ্ডপে যতগুলো মেয়ে আছে তার মধ্যে সেরা।
দিরি-দিরি-দিরি-দিরি করে ঢাকে একটা অদ্ভুত বাজনা শুরু হল।
পান্না বলল, এই রে! এবার বলি হবে। আমি ওসব দেখতে পারি না। চলো, একটু ওধারে যাই।
যেতে গিয়েই হঠাৎ সোহাগ এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল। শূন্যে উত্তোলিত খড়্গ, আর তার ওপাশে এক দীর্ঘ সুঠাম পুরুষ দাঁড়িয়ে। তার কাঁধে একটা বাঁদর। কয়েক পলক স্থির চেয়ে রইল সোহাগ।
১৫-২০. শত্রুভাবে ভজনা
১৬.
রাবণরাজা নাকি রামচন্দ্রকে শত্রুভাবে ভজনা করত। শত্রু ভাবলে কি ভজনা হয়? তবে আশ্চর্য ব্যাপার হল, যাকে ঘেন্না করা হয়, যার ওপর প্রবল আক্রোশ, তার কথা কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ে। ভালবাসার মানুষকে যত না মনে পড়ে তার চেয়ে ঢের বেশি মনে পড়ে ঘেন্না আর আক্রোশের লোকটাকে। ঘেন্না, আক্রোশ, রাগও কি তাহলে একরকম আকর্ষণ? কেউ কেউ বলে ঘেন্না আর ভালবাসা টাকার এ পিঠ ও পিঠ। কিন্তু তাই কি হয়! রাবণরাজা রামচন্দ্রকে হয়তো সারাক্ষণ ভাবত, কী ভাবে তার সর্বনাশ করবে বলে। সেটা কি ভজনা রে বাপু?
তৃতীয় ফ্রন্ট হল শীতল উদাসীনতা। ওই কুয়োয় নেমে গেলে মানুষ আর উঠে আসতে পারে কমই। ভালবাসলে মনে পড়ে, ঘেন্না বা রাগ থেকেও মনে পড়ে, কিন্তু উদাসীনতা ভেজা ন্যাতার মতো মনের সেলেটখানা মুছে ফেলে। তখন সেখানে আর কোনও আঁকিঝুঁকি নেই, কিচ্ছু নেই। কালো সেলেট হাঁ করে চেয়ে থাকে শুধু।
পাশের ঘরে মোনা, সোহাগ আর বুডঢা। আর মা-বাবার পরিত্যক্ত ঘরখানায় একা অমল। গত চার পাঁচ দিন সে দাড়ি কামায়নি। শেষ কবে কামিয়েছিল তা ভাল মনেও নেই। গাল গলা কুট কুট করে দাড়িতে। চুলে চিরুনি দিতে মনে থাকে না, ইচ্ছেও হয় না। কোঁকড়া চুল বলে না আঁচড়ালেও চলে।
এ-ঘরে সাবেক মস্ত খাট। তাতে নানা গেঁয়ো কারুকার্য। কাঠ আর স্টিলের গোটা তিনেক আলমারি। গোল মতো টেবিল, ভারী কাঠের চেয়ার, ট্রাঙ্ক বাক্স মিলিয়ে ঘরে গুদোমঘরের মতো অবস্থা। ইঁদুরের উৎপাত আছে, আরশোলা ঘুরছে সারাক্ষণ। জানালা কপাট খুলে রাখলেও বন্ধ বাতাসের গন্ধ যেতে চায় না। অমল টের পায়, কিন্তু গ্রাহ্য করে না।
ওই ঘরে তার পরিবার, তার দুই সন্তান, অনাত্মীয়া স্ত্রী, মাঝখানে এক ঠান্ডা অন্ধকার সমুদ্র। ওই সমুদ্র অতিক্রম করা বোধহয় আর সম্ভব নয়। সেই চেষ্টা আর করে না অমল। পণ্ডশ্রম। দু ঘরের মাঝখানের দরজাটাও ভোলা হয়নি। প্রয়োজন বোধ করেনি কেউ।
পারুলের প্রতি কি খুব অন্যায় করেছিল অমল? খুব? অনেক ভেবে দেখেছে সে, অন্যায় হলেও সেটা ক্ষমার অযোগ্য ছিল না, বিশেষ করে বিয়ে যখন ঠিক হয়েই ছিল। তার একটা অন্যায়ের প্রতিশোধ অনেক বেশি হয়ে গেল নাকি?
এখন মধ্যরাতে উঠে বসে আছে অমল। গ্রামে শীত পড়ে গেছে। হালকা, মনোরম শীত। মায়ের পুরনো একটা কাঁথা চাপা দিয়ে ভারী আরামে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। কিন্তু মধ্যরাতে চটকা ভেঙে গেল। প্রায়ই যায়। ঘুম একবার ভেঙে গেলে সে জেগে শুয়ে থাকতে পারে না। উঠে বসে সে শুনতে পেল, দূরে লাউডস্পিকারে কোনও যাত্রাপালার সংলাপ। সবুজ সংঘ নবমী পুজোয় কলকাতার একটা নামী দলকে আনিয়েছে। বাড়ি সুষ্ঠু লোক গেছে যাত্রা দেখতে। এমন কী মহিমও। শুধু অমলের পরিবারের কেউ যায়নি।
রাত কত হল জানার জন্য ঘড়ির দিকে চাইলেই হয়। কিন্তু সেই ইচ্ছেটাও হল না অমলের। কী হবে জেনে? উঠে সে চুপচাপ ভূতগ্রস্তের মতো চেয়ে থাকে। ঘর অন্ধকার, তবে দূরের প্যান্ডেল থেকে গাছপালার ফাঁক দিয়ে একটু আলো এসে লেগে আছে মশারিতে। এইসব নির্জন, নিঃসঙ্গ সময়ে পারুলের কথা ভাবতে চেষ্টা করে সে। আগে খুব মনে পড়ত পারুলকে। আবেগ উথলে উঠতে চাইত। স্ত্রীর সঙ্গে মিলনের সময়ে পারুলের মুখশ্রী আরোপ করে নিত মোনার মুখে। বেশ কিছুকাল মোনা আর পারুলের এক সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নিতে পারত সে। সে এক আশ্চর্য রসায়ন। প্রবল কল্পনাশক্তি বাস্তবের অনেক ঘাটতি পূরণ করে নেয়।
এখন কেন যে পারুলের মুখ আর তেমন স্পষ্ট মনে পড়ে না কে জানে! পারুলের মুখের ওপর আরও নানা মুখের আদল এসে পড়ে। তখন ভীষণ কষ্ট হয় তার। পারুল কি হারিয়ে যাচ্ছে তার স্মৃতি থেকে। অ্যালবাম খুলে সে কতবার মুখটা ফের স্মৃতিতে গেঁথে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তবু তার স্মৃতিতে বিন্দু বিন্দু অন্ধকার চলে আসে কেন? হাজার মুখের টুকরো এসে কেন যে ভেসে বেড়ায় মনশ্চক্ষে।
একটা শীতল ভয়ও আজকাল ছুরির মতো ঢুকে যায় বুকে। যদি মোনার বদলে পারুল তার বউ হত তা হলেই কি সুখী হত সে? নিজেকে সে বিরহী ভেবে, বঞ্চিত হতাশ প্রেমিক ভেবে একরকম সান্ত্বনা পেয়ে যায়। কিন্তু যদি এরকম হত, পারুলকে বিয়ে করত সে এবং তারপর ধীরে ধীরে প্রেম অবসিত হয়ে ঘৃণা আর আক্রোশ ঘুলিয়ে উঠত দুজনের মধ্যে, তারপর আসত শীতল উদাসীনতা–তা হলে কী হত? না পাওয়া পারুলকে দেবীর আসনে বসানো সোজা, কিন্তু পাওয়া পারুলকে কি পারত সে? পারুলের অপমৃত্যু ঘটে যেত কবেই। এবং আজ এই মধ্যরাতে ও-ঘর আর এ-ঘরের মধ্যে যে অথৈ সমুদুরের ব্যবধান সেই সমুদুর চলে আসত তার আর পারুলের মাঝখানেও।
