দেখো বড়মা, কেমন কিউট দেখতে। ভাল না?
বলাকার মোটেই পছন্দ হচ্ছিল না ব্যাপারটা। বললেন, তুই তো নিজেই বাঁদর, আবার একটা বাঁদরের দরকার কী?
আমার অনেক দিনের শখ বড়মা। বাজারে একটা লোক নিয়ে এসেছিল, পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কিনে ফেললাম।
ছিষ্টি অনাছিষ্টি করবে বাবা। কাঁধে নিয়ে ঘুরছিস, হেগেমুতে দিলে কী হবে?
সে তো মানুষের বাচ্চারাও করে ফেলে। তাতে কী? ট্রেনিং দিয়ে নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
না বাবা, ওসব আমার পছন্দ নয়।
হ্যাঁ বড়মা, তুমি কি শুচিবায়ুগ্রস্ত হয়ে গেলে নাকি? আগে তো এরকম ছিলে না। শুদ্ধাচার ভাল, শুচিবায়ু ভাল নয়।
কী জানি বাপু, আজকাল আমার যেন ঘেন্নাপিত্তি বড় বেড়ে গেছে। মনটা খুঁতখুঁত করে সবসময়ে। তোর জ্যাঠা চলে যাওয়ার পর থেকেই এরকম।
একটু কোলে নিয়ে দেখো না।
ও মা গো!
বিজু হি হি করে হাসে। বলে, পারলে না তো বড়মা। শুদ্ধাচারে নিজেকে গুটিয়ে রাখলে!
বলাকা মৃদু হাসলেন, বড্ড খিতখিত করে বাবা, ও আমি পারব না। তবে বাঁদরটা দেখতে কিন্তু বেশ। কেমন পিটপিট করে তাকাচ্ছে দেখ।
এদের এক প্রজাতিই তো আমাদের পূর্বপুরুষ ছিল। তাই কাঁধে নিয়ে বেড়াই।
আর একবারও তো একটা বেজি পুষেছিলি। সেটা পালিয়ে গেল জঙ্গলে।
হ্যাঁ। বেজি জাতটা একটু নেমকহারাম আছে।
এটাও না পালায়।
পালালে পালাবে। আমি ঠিক করে রেখেছি, একটু বড়-টড় করে ছেড়ে দেব। ইচ্ছে হলে থাকবে, না হয় চলে যাবে। দুনিয়াতে পার্মানেন্ট বলে তো কিছু নেই।
কত কথাই শিখেছিস। তা হ্যাঁরে বিজু, তুই কি শেষ অবধি ষণ্ডাগুণ্ডা হলি?
কেন বড়মা, হঠাৎ ওকথা কেন?
শুনতে পাই তুই নাকি মারপিট করিস?
ধুর! মারপিট করব কেন? কখনও-সখনও বেয়াদব লোকদের একটু-আধটু শাসন করতে হয়।
সোহাগ বলছিল। কয়েকটা পাজি ছেলে ওর পিছনে লেগেছিল বলে তুই নাকি মেরেছিস ওদের।
সোহাগটা কে? অমলদার মেয়ে নাকি?
হ্যাঁ।
বেশ বাহারি নাম তো!
একটু পাগলিমতো আছে, তবে মেয়েটা ভাল। ওসব আর করতে যাসনি। ছেলেগুলো গিয়ে ক্ষমা চাওয়ায় মেয়েটা লজ্জায় পড়েছে।
ফচকে ছেলেরা টিটকিরি দেয়, সেটা কি ও এনজয় করে নাকি?
কী জানি বাবা! বলছিল, কেউ ওকে প্রোটেকশন দেয় সেটা ওর পছন্দ নয়।
ওকে প্রোটেকশন দেওয়াটা তো বড় কথা নয়। গ্রামেরও তো একটা সমাজ আছে। বাইরে থেকে আসা একটা মেয়েকে টিটকিরি দেবে কেন? গ্রামের বদনাম হয় না!
এটা নারীবাদের যুগ বাপু, মেয়েরা বোধহয় পুরুষের সাহায্য নিতে পছন্দ করে না।
নারীবাদ কি তাই বড়মা যে, মেয়েরা নিজেদের সব সমস্যার সমাধান নিজেরাই করবে? পুরুষের সাহায্য লাগবে না? আমার তো মনে হয় নারীবাদের জন্য পুরুষের সাহায্য বেশিই লাগবে।
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আমিও তো তাই জানি। তোর জ্যাঠার সঙ্গে এতকাল ঘর করে কখনও তো মনে হয়নি যে আমার আরও একটু পাখা মেলার দরকার। বাইরে থেকে তাকে অনেকে অত্যাচারী পুরুষ বলে ভাবত। খামখেয়ালি তো ছিলই একটু, কিন্তু অমন ভালবাসা যে বাসতে পারে তার সঙ্গে কি বিবাদ হয়? সে ঘিরে রেখেছিল বলে কখনও আঁচটুকুও গায়ে লাগেনি। পুরুষমানুষ মেয়েদের প্রোটেকশন দেবে না তো কে দেবে?
সোহাগকে বোলো, আমি ওকে বাঁচাতে কিছু করিনি, যা করেছি তা গ্রামের প্রেস্টিজ বাঁচাতে।
সে বলবখন, তুই আর ওর মধ্যে থাকিস না।
আচ্ছা বড়মা।
মনটা খারাপ হয়ে গেল বিজুর। এই গ্রামটাকে সে বুকের পাঁজরের মতো ভালবাসে। ইদানীং নেশাভাং, চুল্লুর ঠেক, সাট্টা, জুয়া, মদ আর বদমাইশি ঢুকে গেছে প্রচুর। সে তার মতো এই বেনোজল ঠেকাতে চেষ্টা করে।
.
আজ অনেক ভেবেচিন্তে একটা শাড়িই পরল সোহাগ।
কাল থেকে পিসি টিকির-টিকির করে যাচ্ছে, ও সোহাগ, কাল অষ্টমী পুজো, কাল একটা শাড়ি পরিস।
আমি যে শাড়ি পরতেই জানি না।
আমি পরিয়ে দেবখন।
শাড়ি পরে কী হবে বলো তো?
তোকে কেমন দেখায় একটু দেখব।
শাড়ি তো সবাই পরে, কী আর নতুন জিনিস হবে?
তুই তো পরিস না, তোকে নতুন রকমই দেখাবে। আমার কাছে আসিস চুল আঁচড়ে বিনুনি করে দেব। আমার সঙ্গে অঞ্জলি দিতে যাবি।
সোহাগ সাজতে ভালবাসে না। উলোঝুলো থাকতেই তার ভাল লাগে। মায়ের সঙ্গে এই নিয়ে তার কম যুদ্ধ হয়নি।
ভেবেচিন্তে সে আজ সকালে উঠে চান করেছে। পিসির ঘরে গিয়ে বলল, এবার কী করতে হবে বলো তো?
সন্ধ্যা এক গাল হেসে বলল, আয় তোর চুলটা আগে বাঁধি।
পিসি যত্ন করে চুল বেঁধে মুখটা তোয়ালে দিয়ে মুছে বলল, শাড়ি আছে?
আছে।
নিয়ে আয়।
সোহাগ তার মায়ের একখানা নীল সিল্কের শাড়ি নিয়ে এল।
এটা কেমন?
চমৎকার। ফর্সাদের সব রঙেই মানায়।
শাড়ি পরিয়ে কুঁচি ঠিক করতে করতে সন্ধ্যা বলল, কিছু খাসনি তো?
না।
তাহলে চল অঞ্জলি দিয়ে আসি। আজ অষ্টমীতে খুব ভিড় হবে।
স্টিলের আলমারির গায়ে লাগানো আয়নায় নিজেকে আপদমস্তক দেখে সোহাগ বলল, ওঃ পিসি! আই লুক ঘ্যাস্টলি?
কী বলছিস?
আমাকে যে ভীষণ বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে।
সন্ধ্যা হেসে বলল, তোকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। একদম অন্যরকম।
অন্যরকম কেন হব আমি? আমি তো আমার মতো হতে চাই।
তাই তো আছিস। শুধু বাইরেটাই যা অন্যরকম দেখাচ্ছে, তা বলে কি আর তুই সোহাগ নোস নাকি?
অন্যরকম হতে আমার ভাল লাগে না।
সে জানি। তুমি একটি জিদ্দি মেয়ে। কত খোশামোদ করে শাড়ি পরালাম, দয়া করে এখনই ছেড়ে ফেলো না। অঞ্জলিটা আগে দিয়ে আসি চল।
