ও লো ও হচ্ছে ভড়ং। নজর ঠিকই রাখছে। ওপরসা-ওপরসা অমন ভাব দেখাচ্ছে। যেমন মা তেমনই তো ছা হবে।
বড়গিন্নি কেমন লোক তা জানি না মা, তাকে চোখেও দেখিনি আজ অবধি। কিন্তু ছেলের নিন্দে করতে পারব না।
তোর বুদ্ধিনাশ হয়েছে, বুঝলি! ছেলে-ছেলে করে হ্যাঁদাচ্ছিস, বলি কোন পেটে ধরেছিস ওই ধেড়ে ছেলেকে? গাণ্ডেপিণ্ডে গেলাচ্ছিস, গুরুঠাকুর বানিয়ে পারলে পুজো করিস, বলি আজ অবধি পাপমুখে একবারও মা ডাক বেরিয়েছে?
কথাটা ঠিক। মাকে আজও মা বলে ডাকেনি দাদা। এটা একটা কাঁটা হয়ে আছে মরণের মনের মধ্যে।
এত আয়োজন, তবু সুমন তেমন খায় না। খেতে বসে কেবল থাক থাক আর দেবেন না, বলে বাধা দিতে থাকে।
রান্না কি ভাল হয়নি বাবা?
রান্না? না রান্না তো বেশ ভালই। আমি বেশি খেতে পারি না।
এ কথাতেও মা আড়ালে দুশ্চিন্তা করে। মার কেবল ভয়, আদরযত্ন হচ্ছে না। কথাটা মরণও খুব ভাবে। তার এই প্রায়-অচেনা দাদাকে খুশি রাখতে তাদের আর কী কী করা উচিত সেটা বের করার চেষ্টা করে সে। আজও সে দাদাকে আপনি থেকে তুমি বলতে পারেনি।
তার ছোট বোনটার নাম দেওয়া হয়েছে হাম্মি। তার খুব হামা দেওয়ার নেশা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই খাট থেকে নেমে পড়ার জন্য হুড়োহুড়ি। সাতসকালে সারা ঘর হামা দিয়ে বেড়ায় সে। দোতলা থেকে পাছে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে সেইজন্য দোতলার সিঁড়ির মুখে কাঠের আগল লাগানো হয়েছে। হাম্মিকে যে একবারও কোলে নেয়নি বা একটুও আদর করেনি সুমন, এটাও লক্ষ করেছে তারা। হয়তো মায়ের ভয়টা মিথ্যে নয়। বাইরে ভদ্রতা বজায় রাখলেও ভিতরে ভিতরে সুমন হয়তো তাদের পছন্দ করে না।
সুমন আসার চার-পাঁচদিনের মাথায় একদিন সকালে হাম্মি হামা দিতে দিতে লম্বা বারান্দা পেরিয়ে সোজা গিয়ে সুমনের ঘরে ঢুকে পড়েছিল। তারপর কী হয়েছিল কেউ জানে না। হঠাৎ দেখা গেল বারান্দার কোণে সুমন দাঁড়িয়ে আছে, তার কোলে হাম্মি এবং সুমন তাকে কী যেন আঙুল তুলে দেখাচ্ছে আর কথা কইছে আর হাম্মি খুব অবাক হয়ে চেয়ে আছে।
উঠোন থেকে তার মা আর্তনাদ করে উঠল, ও বাবা হারু, তোমার ঘরে গিয়ে ঢুকেছিল বুঝি! পেচ্ছাপ-টেচ্ছাপ করে দেবে বাবা, ওকে নামিয়ে দাও।
হারু অর্থাৎ সুমন একটু হেসে বলল, তাতে কী? বাচ্চারা তো ওসব করেই। থাক আমার কাছে একটু।
থাকল হাম্মি। সম্পর্কের শীতলতা সে-ই ভাঙল প্রথম। আর তারপর থেকে সে রোজই নিয়মিত সুমনের ঘরে হানা দেয় এবং কোলে-টোলেও উঠে দিব্যি বসে থাকে।
ষষ্ঠীর দিন বিকেলে হইহই করে এসে পড়ল বাঙাল। সঙ্গে মুটে এবং মুটের মাথায় বোঝা। পুজোর জামাকাপড়, রাবড়ি, গলদা চিংড়ি, নতুন ফুলকপি, সোনামুগের ডাল আরও নানা জিনিসপত্র। উঠোনেই জামা খুলে বারান্দায় বসে হাওয়া খেতে খেতে উঁচু গলায় বলল, পূজা কাটাইল্যা দিনে কইলকাতায় পইড়া থাকে কেডা?
মা ঘোমটা দিয়ে চা করে নিয়ে এসে হাসি-হাসি মুখ করে বলে, অত কী এনেছ গো? পয়সা তোমাকে কামড়ায়?
চা খেতে খেতে বাঙাল নিমীলিত নয়নে চেয়ে বলে, তোমার লিগ্যা কিছু আনি নাই। তোমারে দেওনও যা, ভস্মে ঘি ঢালনও তা। বছর বছর যে শাড়িগুলি কিন্যা দেই হেইগুলি কি পাতিলের মইধ্যে গুইজ্যা রাখ নাকি? পরতে পার না?
মা ভারী লজ্জা পেয়ে বলে, আচ্ছা মানুষ যা হোক, অত দামি শাড়ি পরে কোথায় যাব বলো তো! আমি কি ঘর থেকে বেরোই? সংসার সামলাতে হয় না আমাকে?
বেনারসিখান কই?
সে তোলা আছে। বিয়েবাড়ি-টাড়ি নেমন্তন্ন হলে পরে যাব।
আর পরছ! তোমার পরনে তো হাউল্যা-জাউল্যা কাপড় ছাড়া আর কিছু দ্যাখলাম না!
এক ছড়া সোনার হার বের করে মার হাতে দিয়ে বাঙাল বলল, হেই লিগ্যা এইবার আর কাপড় আনি নাই। এইটা আনছি।
মার চোখ কপালে উঠল, ও মা গো! তাই বলে সোনার হার! কী কাণ্ড বাবা! এত খরচ করার কোনও দরকার ছিল বুঝি! সোনা-দানাই কি আমাকে পরতে দেখ?
রসিক বাঙাল একটু করুণ মুখে চেয়ে থেকে বলল, আইচ্ছা, তুমি কেমন মাইয়ালোক কও দেখি! কাপড় চাও না, সোনা-দানা চাও না, শ্যাষে কি বৈরাগী হইয়া যাইবা নাকি? তাহইলে তো সাড়ে সব্বনাশ! এই যৌবনে যোগিনীরে লইয়া আমি করুম কী?
মা হেসে ফেলল, আচ্ছা বাবা, পরবখন হার। তবে বাপু, বেশি দিও না আমাকে, আমি অত সামলাতে পারি না।
কথাটা শুনে রসিক বাঙালের মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটল। বলল, বুড়া বয়স লইয়া মাইনষের চিন্তা থাকে। কোনখানে পড়ব, কোনখানে মরব, কারে ভোগাইব, গু-মুতে নান্দিভাস্যি করব কিনা। তা বোঝলা, আমি বুড়া বয়সে আইয়া তোমার কাছেই মরুম।
ছিঃ, ষষ্ঠীর দিনটায় ওসব কী কথা! ওসব মুখে আনতে আছে?
রসিক বাঙাল মিটিমিটি হেসে বলে, আ গো, এইটা আহ্লাদের কথাই। তোমার মাথায় তো বুদ্ধি নাই, বলদা মাইয়ালোক, তুমি বোঝলা না।
পড়ার ঘর থেকে দৃশ্যটা দেখতে পেয়েছিল মরণ। দুজন দুজনের দিকে অপলক চেয়েছিল কিছুক্ষণ। চা জুড়িয়ে যাচ্ছিল।
.
পৃথিবীর কোনও কোনও প্রাণী সহজেই পোষ মেনে যায়, আবার কোনও কোনও প্রাণী সহজে মানতে চায় না। যেমন কুকুর সহজেই বশংবদ হয়ে যায়, বেজি হতে চায় না।
বিজু কোথা থেকে একটা বাঁদর নিয়ে এসেছে। ছোট বাচ্চা। সরু শেকল পরিয়ে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে খুব। আজ অষ্টমী পুজোর সকালে সেটাকে কাঁধে নিয়ে এসে হাজির।
