বলাকা দুপুরে ঘুমোন না। সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে টুকটাক কাজ করেন। কাজ না পেলে শুধুই ঘুরে বেড়ান বা বই পড়েন। একা থাকা তার অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে।
দুপুরে আজ বলাকা উঠোনে চাটাই পেতে শীতের লেপ-কম্বল রোদে দিয়েছেন। কাক-টাক যাতে এসে বসতে না পারে তার জন্য হাতে গৌরহরির হাতির দাঁতের হাতলওয়ালা লাঠিটা নিয়ে বসে আছেন। কাক-শালিক এসে কাছাকাছি হুটোপাটি করলেই বলছেন, হুশ।
এবাড়ির কাক-শালিকগুলোও তার চেনা। রোজই ঘুরে ফিরে আসে। বলাকার হাতে লাঠি হলেও চোখ জুড়ে মায়া। ওরাও তো জন। নিঃসঙ্গে সাথী।
আমি একটু আসতে পারি?
উঠোনে ঢোকার আগলটার বাইরে মেয়েটা দাঁড়িয়ে।
ও মাঃ! এসো ভাই, এসো!
মেয়েটা সসংকোচে ঢুকল।
ওই মোড়াটা টেনে এনে আমার কাছে বোসো।
লক্ষ্মী মেয়ের মতো মেয়েটা বসল।
আজ এলে! আজ যে বাড়ি ফাঁকা! তোমার বান্ধবী পান্নাও গেছে ওদের সঙ্গে পিকনিক করতে।
জানি। আমি তো আপনার কাছে এসেছি, আর কারও কাছে নয়।
কী ভাগ্যি আমার! তোমার বয়সি মেয়েরা আজকাল আর আমার মতো বুড়ির কাছে আসতে চায় না। জেনারেশন গ্যাপ না কী বলে যেন ছাই।
সোহাগ একটু হাসল। তারপর বলল, আপনারা খুব হ্যাপি ফ্যামিলি, তাই না?
বলাকা ভ্রূ কুঁচকে একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, এটা একটা আশ্চর্য কথা বললে! আমি তেমন করে ভেবে দেখিনি কখনও। কিন্তু সত্যিই বোধহয় আমাদের হ্যাপি ফ্যামিলি। তেমন কোনও সমস্যা নেই। ঝগড়াঝাটি নেই। বউমারা খারাপ নয়, জামাইরাও ভাল। আমার দুঃখ নেই।
মেয়েটা তাকে খুব অবাক করে দিয়ে বলল, কিন্তু হ্যাপিনেস কি সবসময়ে ভাল?
ওমা! বলে কী গো মেয়েটা! হ্যাপিনেস ভাল নয় বুঝি?
সোহাগ মলিন মুখ করে বলে, আমি তো একটু পাগল, তাই আমার মাথায় খুব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা আসে।
কী কথা?
কেন যেন মনে হয়, খুব হ্যাপি হওয়া ভাল নয়।
কেন বল তো!
তাতে মানুষের সার্চ কমে যায়, সে অলস হয়ে পড়ে, তার মন ঘুমিয়ে পড়ে।
বলাকা একটু অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে চেয়ে থাকেন। তারপর মৃদু স্বরে বলেন, মানুষ তো সুখী হতেই চায়, আর সেটা চায় বলেই তো সে কত পরিশ্রম করে, কষ্ট করে। তাই না? তোমার কি মনে হয় আমার মন ঘুমিয়ে পড়েছে?
মেয়েটা খুব লজ্জার হাসি হাসল, কিন্তু জবাব দিল না।
বলাকা বললেন, সুখ তো এমনিতে আসেনি। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তার জন্য। সব সময়ে তো আর সুখে থাকিনি।
মেয়েটা কিছু বলল না, সামনের দিকে চেয়ে বসে রইল।
তুমি কী বল? অসুখী হওয়াই ভাল?
মেয়েটা মাথা নেড়ে বলে, জানি না। আমরা তো ভাল নেই। আমরা খুব আনহ্যাপি।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ। আমাদের পরিবারের মধ্যে সবাই সবার অ্যান্টি।
সে কী! তা কেন?
জানি না। ওইরকমই হয়ে গেছে।
এরকম হওয়া তো উচিত নয় ভাই।
আমার খুব মনে হয়, আমি অন্য কোনও ফ্যামিলিতে জন্মালে খুব ভাল হত।
তুমি তোমার মা-বাবাকে ভালবাস না?
কী জানি! ভালবাসা ব্যাপারটাই তো বুঝতে পারি না। শব্দটা আমার কাছে অদ্ভুত লাগে।
মা বাবাকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয় না?
না। একটুও না। আমার তো সব সময়ে কোনও নির্জন জায়গায় পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
বলাকা একটু ভেবে সন্তর্পণে বললেন, অমল কত ভাল চাকরি করে। তোমার মাও তো অনেক পাস টাস শুনেছি। অমল ছেলেও তো খুব ভাল। তাহলে তোমার এরকম মনে হয় কেন?
বোধহয় আমিই স্বাভাবিক নই।
আমার তো কখনও তা মনে হয়নি! তোমাকে আমার বেশ লাগে। সাজগোজ নেই, নিজের প্রতি বিশেষ নজর নেই, চুলটা অবধি ভাল করে আঁচড়াও না কখনও। বেশ তো সরলসোজা মেয়ে তুমি।
সাজতে আমার ভাল লাগে না। কী হবে সেজে?
এ তো বুড়ো বয়সের প্রশ্ন। তোমার বয়সে কি এরকম কেউ ভাবে?
আমি বোধহয় মনে মনে বুড়োই হয়ে গেছি।
দুর পাগল!
আমি একটা কথা বলতে এসেছি।
কী কথা?
এই গ্রামে কতগুলো ছেলে মাঝে মাঝে আমাকে টিজ করে।
তাই নাকি?
সব জায়গাতেই এসব একটু-আধটু হয়। আমি মাইন্ড করি না। আমি কাউকে ভয়ও পাই না।
কিন্তু টিজ করবে কেন? দাঁড়াও, আমি বিজুকে বলে দেবোখন।
আমি সে কথাটাই বলতে এসেছি।
বিজুকে বলার কথা তো!
না, বিজুকে বারণ করার কথা।
ওমা! কেন?
সেদিন পান্নার সঙ্গে বেরিয়েছিলাম, তখন ওর সামনেই কতগুলো ছেলে আমাকে টিজ করেছিল। পান্না বলেছিল, ওর দাদা বিজুকে বলে ওদের ঢিঢ করে দেবে। আমি বারণ করেছিলাম। কিন্তু পান্না শোনেনি। ও ওর বিজুদাকে বলে দিয়েছিল।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। আর তার ফলে সেই ছেলেগুলোকে একটা ক্লাবের ছেলেরা এসে খুব মারে। মার দিয়েই হয়নি, ওদের নিয়ে এসে আবার আমার কাছে ক্ষমাও চাইয়েছে। আমার খুব খারাপ লেগেছে।
কেন, এ তো ভালই হয়েছে। ছেলেগুলো আর তোমার পিছনে লাগবে না।
এই ছেলেগুলো হয়তো আর লাগবে না। কিন্তু সেটা তো সলিউশন নয়। আমাকে তো সব জায়গায় কেউ প্রোটেকশন দেবে না। আর প্রোটেকশন আমি তো চাইও না। আমার খুব অপমান লেগেছে।
বলাকা হাসলেন, তুমি আজকালকার মেয়ে তো, তাই পুরুষদের প্রোটেকশন নিতে চাও না বোধহয়। কিন্তু ভাই, চিরকাল যে তাই হয়ে এসেছে।
আপনার কি মনে হয় না, এখন কিছু অন্যরকম হওয়া উচিত?
আমি পুরনো আমলের মানুষ, চিরকাল পুরুষের ছায়ায় বড় হয়েছি, আমি কি আর তোমাদের মতো করে ভাবতে শিখেছি?
সেই জন্যই কি আপনি এত হ্যাপি?
কী বলছ বুঝিয়ে বলো।
চিরকাল পুরুষের প্রোটেকশনে ছিলেন বলেই আপনার গায়ে কোনও আঁচ লাগেনি। এই প্রোটেকশন নেওয়াটাকে আপনার অপমান বলে মনে হয় না?
