তুমি কি বাঁধন কাটতে চাইছ মা?
বলাকা হেসে বললেন, আমাকে নিয়ে তোর এত ভয় কেন বল তো পারুল?
পারুল মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, তোমার হাবভাব আমার মোটেই ভাল লাগে না। এবার তোমাকে আমি জামশেদপুর নিয়ে যাবই। চোখের আড়ালে তুমি কী করে বসবে তার ঠিক নেই।
ও কথা বলছিস কেন? আমি তো বেশ আছি।
তুমি যেন কেমন উদাসী হয়ে গেছ।
দুর পাগল! উদাসী হওয়ার কি জো আছে? তোর বাবা চলে যাওয়ার পর দুনিয়াটা কেমন পানসে হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, মনে হত বেশিদিন বাঁচব না।
তুমি বাবার সঙ্গে সহমরণে যেতে চেয়েছিলে মা। আমার সব মনে আছে।
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সে আর তোরা যেতে দিলি কই? গেলেই যে বাঁচতুম। তাকে ছাড়া যে বেঁচে থাকা কী কঠিন তোরা বুঝবি না।
খুব বুঝি মা। আর বুঝি বলেই ভয় পাই। সংসার থেকে তুমি যেন তোমার মন গুটিয়ে নিচ্ছ।
পারুলের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলাকা বলেন, তা যদি পারতুম তাহলে তো ভালই হত। মন তুলে নিই সাধ্যি কি? ওই যে দুখুরি ওটার জন্য নতুন করে মায়ার বাঁধনে পড়লুম, গোরু, কুকুর, বেড়াল, এই বাড়ি, কাজের লোকেরা কার জন্য মায়া না করে পারি বল? মন তুলে নেওয়া কি সোজা কথা? আর তোর বাবার আক্কেল দেখ, এত বড় একখানা বাড়ি আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে গেছে। তাও দেওররা, জায়েরা থাকলে একটু জনমনিষ্যি থাকত। সারাদিন এই বিশাল বাড়িটায় থাকা কি সোজা?
তাই তো বলি আমার কাছে চলো।
এ-জায়গা ছেড়ে দুনিয়ার আর কোথাও গিয়ে থাকতে মন চায় না। শীতকালে গিয়ে দু-চারদিন থেকে আসবখন।
বলাকাকে নিয়ে যেতে চায় সবাই। তারা ভাবে, এখানে একা পড়ে থাকা মায়ের পক্ষে কষ্টকর। কিন্তু সেটা ওদের দিক থেকে ভাবা। বলাকার দিক থেকে ভাবনা অন্যরকম।
এই যে দুধের মতো সাদা গোরু আলো। দুখানা মায়াবি চোখ দিয়ে যখন চেয়ে থাকে বুকটা উথলে ওঠে। গৌরহরির প্রিয় এই গোরুটা এমন ভালবাসত তাকে যে গৌরহরি এসে গায়ে হাত দিয়ে না দাঁড়ালে দুধ ছাড়তে চাইত না। গৌরহরি চলে যাওয়ার পর কী বুঝল কে জানে, খুব ডাকত সারা দিন। দুখানা চোখ যেন টলটল করত। অবোলা জীবের সেই শোক যেন বলাকাকেও আচ্ছন্ন করেছিল। বলাকা গিয়ে রোজ আলোর গলায় মাথায় হাত বোলাতেন। মানুষের ভাষায় কত কথা বলতেন। গোরুর তা বুঝতে পারার কথা নয়। কিন্তু যেন বলাকার মনে হত আলো সব বুঝতে পারছে। ধীরে ধীরে যেন আলোর শোক কমে গেল। বলাকা নতুন মায়ার বন্ধনে পড়লেন। আসলে নতুন নয়, গৌরহরির প্রিয় যা কিছু সেগুলিকে ভালবেসে যেন গৌরহরির অস্তিত্বই ফের খুঁজে পান বলাকা। আজকাল তার মনে হয়, না, মানুষ অত সহজে মরে না। মরার পরও তার কত কী থেকে যায়। অস্তিত্ব কি শুধু দেহটাতে? তার সত্তাও যে ছড়িয়ে থাকে কত কিছুর মধ্যে।
এসব গূঢ় সত্য সবাই কি বুঝতে পারে? ছেলে-মেয়েরা ভাবে মা বড় একা। ওটা একপেশে দেখা। গৌরহরি যেদিন চলে গেলেন সেদিন তাঁর সঙ্গে বলাকারও চলে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তার পর ধীরে ধীরে তিনি ফের নানা অনুষঙ্গে ফিরে পাচ্ছেন গৌরহরিকে। এখন তার একাকিত্ব তত তীব্র নয়।
ওই যে স্টিলের আলমারিটা, ওটা নিবি পারুল? তোর বাবা বোম্বে থেকে অর্ডার দিয়ে আনিয়েছিল। সিকিম জিনিস, এত দিনেও একটুও রং চটেনি।
পারুল হেসে বলে, থাক না মা এসব তোমার কাছে। যেখানে যা আছে সব একইরকম থাক। তাহলে বাড়িতে এসে অচেনা ঠেকবে না কিন্তু, ছেলেবেলাটা ফিরে আসবে। না মা, তুমি সব বিলিয়ে দেওয়ার মতলব ছাড়।
কী ভাবি জানিস? আমি পট করে মরে গেলে
নরম হাতে বলাকার মুখ চাপা দিয়ে পারুল বলে, জানি তুমি মরার জন্য পা বাড়িয়েই আছ। ওসব চিন্তা কর বলেই সারাক্ষণ তোমার জন্য আমার ভাবনা হয়। মরতে চাও কেন মা? বাবা নেই বলে? আর এই যে আমরা আছি আমরা কি বাবার অংশ নই? পিতা তো জায়ার ভিতর দিয়েই ফের জন্মায় সন্তান হয়ে। জান?
মরতে চাই কে বলল? তা নয় মা, আসলে আট-দশটা আলমারি, বাক্স- প্যাঁটরা সবই প্রায় ফাঁকা। হয়ে গেছে। এগুলো পড়ে থেকে
থাক মা, পড়েই থাক।
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, নিলে তোদের ভোগে লাগত।
এখনও ভোগেই লাগছে। এই যে বাড়িতে এলে বাক্স-প্যাঁটরা, আলমারি, খাট-পালঙ্ক দেখতে পাই। তাতেই মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। সেটা কি উপভোগ নয়? ভোগ মানে কি আলমারিটাতে ঠেসে জিনিসপত্র ভরে রাখা?
বলাকা হার মানলেন।
সারা বাড়িতে এখন আনন্দের হাট। মেয়ে-জামাই, ছেলে-বউমা, নাতি-নাতনি মিলে সারাদিন আড্ডা হচ্ছে, বেড়াতে যাওয়া হচ্ছে, পিকনিকেরও তোড়জোড় চলছে। বলাকা দূর থেকে এসব খুব উপভোগ করেন। বড় একটা ওদের মধ্যে গিয়ে পড়েন না। তাতে বোধহয় তাল কেটে যায়। ওদের একটা বয়সের বন্ধুত্ব আছে, সেখানে গুরুজনদের গিয়ে হুট করে ঢুকতে নেই। ডাকলে আলাদা কথা।
.
আজ সকালে দুটো ভাড়া করা গাড়িতে বোঝাই হয়ে ওরা কাটোয়ার দিকে কোথায় যেন পিকনিকে গেল। বলাকাকেও টানাটানি করেছিল, বলাকা যাননি। তবে দুখুরিটাকে পাঠিয়েছেন। বেচারা সারাদিন তো তার কাছেই পড়ে থাকে, যাক আজ একটু আনন্দ করে আসুক।
দুপুরবেলা চুপিসাড়ে মেয়েটা এল। ঠিক চোরের মতো। মুখে একটু ভয় মেশানো হাসি। পরনে সেই ঝালঝালে পোশাক। সাজগোজের বালাই নেই।
