বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, পাগলি, প্রোটেকশন কি পুরুষেরও দরকার হয় না? না হলে এত পুলিশ, মিলিটারি, এত আইনকানুনের তো প্রয়োজনই থাকত না। প্রোটেকশন যে একটা ভীষণ দরকারি জিনিস। না বাপু, পুরুষমানুষের সাহায্য নিতে আমার তো কখনও অপমান লাগেনি।
কিন্তু প্রোটেকশন নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেলে কি মানুষ খুব নাবালক থেকে যায় না? বিপদ হলে একজন এসে বাঁচাবে এরকম ধারণা থাকলে মানুষের ডেভেলপমেন্ট কি ভাল হয়?
ও বাবা! ওসব যে শক্ত শক্ত কথা! তা ভাই, তোমার মতো করে আমি তো ভাবতে শিখিনি। কিন্তু স্বীকার করি, তোমার মতো করে ভাবাও বোধহয় খারাপ নয়। আজকাল তো পুরনো ধ্যানধারণা পালটে যাচ্ছে।
হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেলল সোহাগ, বলল, হ্যাপিনেস মানেই কিন্তু সেন্স অফ সিকিউরিটি। আমার কখনও বিপদ হবে না, কখনও অভাব হবে না, আমার সব কিছু ঠিকঠাক থাকবে, আমাকে বাঁচানোর জন্য কিছু লোক সবসময়ে প্রস্তুত থাকবে, কেউ আমার নিন্দে করবে না! তাই না?
বলাকা ভারী অবাক হলেন। বললেন, তোমার বয়স কত?
আমি খুব পাকা, না? আমি সতেরো প্লাস।
ভাই, তুমি মোটেই এঁচোড়ে পাকা নও। তোমার বেশ মাথা আছে।
তা কিন্তু নয়। পড়াশুনোয় আমি ডাব্বা। তবে আবোলতাবোল ভাবতে খুব ভালবাসি।
কিন্তু কথাগুলো তো খারাপ বললে না! সুখ ওটাকেই বলে বটে। হ্যাঁ গো মেয়ে, সুখী মানুষকে তোমার ঘেন্না হয় না তো?
জোরে মাথা নাড়া দিয়ে সোহাগ বলে, না তো! আমার তো আপনাকে ভীষণ ভাল লাগে।
বলাকা হেসে ফেললেন, আমাকে আবার সুখী মানুষের সর্দার ভেবো না। অত কি সুখ আমার! গাঁয়ে পড়ে আছি, শোকাতাপা মানুষ, নিঃসঙ্গ জীবন। যত সুখী ভাবছ ততটা নই। তবে দুঃখও তেমন কিছু খুঁজে পাই না। আসল কথা কী জান, সুখদুঃখের বোধটাই বোধহয় ভোঁতা হয়ে গেছে। সেও একরকম ভালই।
আমি আপনাকে হ্যাপি বলিনি। আমি বলেছি আপনাদের ফ্যামিলিটা খুব হ্যাপি। সবাই কেমন হাসিখুশি ডগোমগো। আপনি তো তা নন।
বলাকা একটু হাসলেন।
সোহাগ বলল, পান্নার কাছে শুনেছি আপনার হাজব্যান্ড মারা যাওয়ায় আপনি খুব ভেঙে পড়েছিলেন। সবাই ধরে নিয়েছিল আপনিও বেশিদিন বাঁচবেন না।
বলাকা স্মিতমুখে বললেন, অনেকে এখনও মনে করে আমি বেশিদিন বাঁচব না।
আপনি আপনার হাজব্যান্ডকে খুব ভালবাসতেন, না?
কী জানি ভাই, তোমার মতোই ভালবাসার তত্ত্ব আমারও জানা নেই। শুধু টের পেতুম, ও মানুষটা আমার শ্বাসবায়ুর মতো, বুকে ধুকপুকুনির মতো। সে ছাড়া নিজেকে ভাবতেই পারতাম না।
সেটা কী করে সম্ভব? ইগো নেই? স্বাধীন মতামত নেই? ব্যক্তিত্ব থাকবে না?
তাই তো! সেসব বোধহয় আমার ছিল না। আমি বোধহয় খুব বোকা ছিলাম। আর তার জন্যেই এতগুলো বছর তো দিব্যি হাসিমুখে কাটিয়ে দিতে পেরেছি। তোমরা কি পারবে?
মাথা নেড়ে সোহাগ বলে, না। আমি কখনও আপনার মতো হতে পারব না। আমি চিরকাল একজন আনহ্যাপি মেয়ে হয়ে থাকব।
.
১৫.
যিশু এসে দাঁড়ালেন কদমগাছের তলায়। সন্ধিক্ষণ সমাগত। একটি আর্তনাদ শোনার জন্য অপেক্ষা করছে পৃথিবী। সেই আর্তনাদকে কোলাহলে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য ঢাক বাজছে। ঢাকি নাচছে।
ঈশ্বরপুত্র কখনও সুখী ছিলেন না। তিনি কখনও সুখী হবেনও না। সুখী হতে নেই তাঁর। বুকে দুহাজার বছরের পুরনো দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তিনি কদমগাছের গায়ে হাতের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ছাগশিশুটি ঘাসপাতা খেতে খেতে মাঝে মাঝে মুখ তুলে তাঁকে দেখছে।
মণিরাম… মণিরাম, তুমি যেখানেই থাকো মূল মণ্ডপের সামনে চলে এসো, তোমার পিসিমা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন। মণিরাম… আজ রাত নয় ঘটিকার পর সবুজ সংঘ আয়োজিত নাট্যাভিনয় নটীর পূজা-নটীর পূজা… যাঁরা অঞ্জলি দেবেন তাঁরা দয়া করে লাইন দিয়ে আসুন…
যিশু চেয়ে আছেন। ছাগশিশুটি চেয়ে আছে। চোখে চোখ।
আমার অনন্ত ক্ষুধা প্রভু। ক্ষমা করুন।
ক্ষুধার কথা আমার মতো আর কে জানে বাছা। ক্ষুধা অনন্ত, তার কোনও নিবৃত্তি হল না আজও।
ক্ষুধা, ভয়, বংশবিস্তার ছাড়া আমাদের আর কী আছে প্রভু? বড় সামান্য এ জীবন।
জীবন সামান্য নয়। একটি জীবাণুরও জীবন এক আশ্চর্য ঘটনা, কত বিচিত্র অণু-পরমাণুর সমাহারে ওই শরীর রচিত হয় আর তার প্রকোষ্ঠে দীপাধারের মতো রহস্যময় প্রাণের শিখা। না বাছা, জীবন সামান্য নয়।
আপনার দীর্ঘশ্বাসে মথিত হচ্ছে বাতাস। সন্ধিক্ষণ সমাগত। শিয়রে শমন। আমি আমার শেষ আহার গ্রহণ করছি, যূপকাষ্ঠে একটি আঘাত আমার সব আলো নির্বাপিত করে দেবে। প্রভু, আপনার চোখের জলটুকুই আমার এ সামান্য জীবনকে অসামান্য করে তুলেছে। আপনি আমার জন্য কাঁদছেন ইহজীবনে এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু ঘটেনি কখনও।
আমার চোখের জল কখনও শুকোয় না বৎস। কান্না ছাড়া আমি তোমাকে আর কী-ই বা দিতে পারি।
মাইক টেস্টিং…হ্যালো, হ্যালো… ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর…ইলেকট্রিশিয়ান কালু, ইলেট্রিশিয়ান কালু, মণ্ডপের বাঁদিকে স্টিক লাইটটা খুলে গেছে, এখনই ঠিক করে দাও, নইলে অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে… আজ রাত নয় ঘটিকার পর নাট্যাভিনয় নটীর পূজা… নটীর পূজা… সবুজ সংঘের নটীর পূজা.. পরিচালনা করবেন পারুল গাঙ্গুলি… মুখ্য ভূমিকায় পান্না চ্যাটার্জি, অনামিকা রায়… ভলন্টিয়াররা দেখো, অঞ্জলি দেওয়ার জায়গায় বড্ড ভিড় জমে গেছে…
