এই, কে রে ওখানে?
অমল চমকাল না। ধীরে শুধু মুখটা ঘোরাল।
কে? এখানে দাঁড়িয়ে কী হচ্ছে?
অমল জবাব দিল না। ছেলেটা সাইকেল থেকে নেমে কাছে এল।
আরে! অমলদা?
অমল চিনতে পারল। বিজু।
এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন অমলদা?
এমনি। দেখছি। অনেকদিন বাদে এলাম তো!
আসুন না ভিতরে।
না থাক।
থাকবে কেন? আসুন। বড়মা খুব খুশি হবে।
.
১৪.
পুরনো কৌটো বাউটো ডাঁই হয়ে জমে আছে খাটের তলায়, তাকে, রান্না আর ভাঁড়ারঘরে। মায়াবশে কিছুই ফেলা হয়নি তেমন। কত কৌটো বহুকাল খোলাই হয়নি। কী আছে তার মধ্যে কে জানে বাবা। আমসি, শুকনো কুল, ত্রিফলা কি গোলমরিচ। কৌটোগুলো বিদেয় না করলেই নয়। খাটের নীচে মশার আজ্ঞা হয়েছে, পোকামাকড় বেড়েছে, ইঁদুরের খুটখাট বাড়ছে, বাড়ির বেড়ালটা এই নিয়ে তিনবার প্রসব করল বলাকার খাটের তলায়।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকলে বলাকা কৌটো নিয়ে পড়লেন। তা শ দেড় দুই তো হবেই। নানা মাপ, নানা আকৃতির সব কৌটো, দু-চারটে সেই ইংরেজ আমলের জিনিসও আছে।
পুরনো, ভুলে-যাওয়া কৌটো খোলার মধ্যে একটি রহস্যরোমাঞ্চ আছে। কোন কৌটো থেকে কী বেরিয়ে পড়ে তা কে জানে! একবার একটা ওভালটিনের পুরনো কৌটোর মধ্যে হঠাৎ একছড়া সোনার হার পেয়েছিলেন বলাকা। বোধহয় কোনও কাজের মেয়ে চুরি করে লুকিয়ে রেখেছিল, কিন্তু নেওয়ার সময় পায়নি। সেই হারছড়া ছিল তাঁর মেজো জায়ের। পেয়ে সে কী আনন্দ!
দুখুরি কৌটো টেনে আনছে আর বলাকা একটা চ্যাপটা চাবির মুখ দিয়ে ভুটভাট শব্দে কৌটো খুলছেন। বেরোচ্ছেও জিনিস অনেক। একটা হালকা কৌটো না খুলেই বাতিল করতে গিয়ে কী ভেবে খুলে দেখলেন তার মধ্যে ঠাসা তেজপাতা। কবেকার কে জানে! আর একটা হালকা কৌটো থেকে তিনটে খুঁধুলের ছোবড়া বেরোল। শ্বশুর-শাশুড়ি আর তিন ভাইয়ের যৌথ সংসারেই জমেছিল এসব। কিছু জায়েরা নিয়ে গেছে, কিছু পড়ে আছে।
ভাগাভাগির ব্যাপারটা কখনও ভাল চোখে দেখেননি বলাকা। গৌরহরি যখন তার দুই ভাইয়ের অংশ বিপুল দামে কিনে নিয়েছিলেন তখন বলাকা রাগ না করে খুব আদুরে গলাতেই বলেছিলেন, ওগো, এত বড় বাড়ি দিয়ে আমরা কী করব? শ্বশুরমশাই তিন ছেলের জন্য তিনটে দালান করে গেছেন, আমাদের তো অকুলান হচ্ছিল না!
ভাইয়ে ভাইয়ে একটু তফাত থাকলে সম্পর্কটা ভাল থাকে।
সম্পর্ক কি খারাপ হচ্ছিল? কিছু তো বুঝতে পারিনি। বেশ তো ভাবসাবই ছিল সকলের।
তা ঠিক বলাই। বাইরের সম্পর্ক ভালই ছিল। কিন্তু হঠাৎ আমার রোজগারপাতি বেড়ে যেতে লাগল। তখন মনে হচ্ছিল শিবে আর রেমো কেমন যেন মুখ গোমড়া করে থাকছে। হয়তো হিংসে হতে লেগেছে। কাছাকাছি থাকলে ক্রমে ক্রমে ওটা বেড়ে যেত। তাই গোড়া মেরে রাখলুম।
কিন্তু মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলেরা বাইরে থাকে, এত বড় বাড়িটা খাঁ-খাঁ করে যে গো!
অভ্যেস হয়ে যাবে বলাই, ধৈর্য ধরো।
খেয়ালি পুরুষটির সব সিদ্ধান্তের উচিত-অনুচিত আজও বুঝতে পারেন না বলাকা। মন মানতে চায়নি তবু গৌরহরি যা বলেছেন তা বরাবরই মেনে নিয়েছেন বলাকা। মানুষটা তার চেয়ে পনেরো বছরের বড়, ইয়ারবন্ধু তো নয়। বরং যেন খানিকটা বাবার মতোই এক অভিভাবক।
পুরনো কৌটোর অন্ধকারে সেকেলে বাতাস জমে আছে আজও। মুখ খুললেই ভ্যাপসামতো গন্ধ। বলাকার বেশ লাগে। কত বছরের সঞ্চিত বাতাস তার মুখে এসে লাগে। গা সিরসির করে।
কৌটোয় কী খুঁজছ মা? পয়সা?
বলাকা হেসে ফেলেন, হ্যাঁ, পয়সাই খুঁজছি। পেলে তোকে দেব।
আমি সারা বাড়িতে কত পয়সা কুড়িয়ে পাই জান? সব একটা কৌটোয় জমিয়ে রেখেছি। ঝাঁট দিতে গেলেই পয়সা পাই।
স্মিতমুখে বলাকা বলেন, পয়সা জমিয়ে কী করবি?
তোমাকে একটা জিনিস কিনে দেব।
ওমা! আমাকে আবার কী জিনিস দিবি রে?
পয়সা জমিয়ে তোমাকে একটা মহাভারত কিনে দেব। সেদিন যে বলছিলে তোমার মহাভারতখানা কে যেন নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেয়নি!
ও বাবা! তাও মনে রেখেছিস! দিতে যে চেয়েছিস সেই ঢের। ওতেই তোর দেওয়া হয়েছে।
একটা কৌটোর মধ্যে কিছু খুচরো পয়সা পেলেন বলাকা। কেউ বোধহয় জমাতে শুরু করেছিল, বেশি পারেনি। মোট পাঁচ টাকা চল্লিশ পয়সা। বলাকা পয়সাটা দুখুরির হাতে দিয়ে বললেন, তোর কৌটোয় জমিয়ে রাখিস।
নীচের উঠোনে নিত্যানন্দ বসে আছে। সঙ্গে দুই ছেলে আর পাঁচখানা বস্তা।
দুখুরি বারান্দায় গিয়ে ডাক দিল, এসো গো, কৌটো নেবে যে!
নিত্যানন্দ ওপরে উঠে এল।
বলাকা বললেন, এই নে বাবা, কতগুলো জমেছে দেখ।
নিত্যানন্দ কাঁচুমাচু হয়ে বলে, ওসব পুরনো কৌটো মা, দশ-বিশ পয়সাতেও বিকোবে না।
দুর মুখপোড়া! তোর কাছে পয়সা কে চেয়েছে। এগুলো বিদেয় কর আগে। পয়সা লাগবে না।
নিত্যানন্দ একগাল হাসল। তারপর ছেলেদের ডেকে নিয়ে টপাটপ বস্তায় কৌটো ভরতে লাগল।
কৌটোগুলো বিদেয় হওয়ায় খাটের তলায় এখন হাওয়াবাতাস খেলছে, ঘরটাও হালকা দেখাচ্ছে।
বলাকা ঘরের আলমারি আর আসবাবগুলো দেখছিলেন। তাঁর এত লাগে না। ধীরে ধীরে বাহুল্য জিনিসগুলো বিদেয় করে দেবেন। জিনিস বিক্রি করা খুব অপছন্দ করতেন গৌরহরি। বলাকা বিক্রি করবেন না। বিলিয়ে দেবেন। তবে তার আগে ছেলেমেয়েদের মতামত নিতে হবে। ওরা যদি চায় তো ভাল, নইলে নেওয়ার লোক মেলা পাওয়া যাবে।
