সে তো শুধু কালো, আর তো কিছু নয়!
না। উদ্বাস্তু পরিবার। তবে শিক্ষিত। খেটে খায়। তাদের গুণ ওইটুকুই।
তাকেই দেখো না আবার।
সেখানে তো একরকম অমত জানিয়েই দেওয়া হয়েছে। এখন কী আর
তোমার চোখ বড় একটা ভুল করে না গো। তুমি যখন তাকে পছন্দ করেছ তখন সে ভালই হবে। দেখো না গো একটু।
ভাল করে ভেবে দেখ বলাই।
ভাল করেই ভেবেছি।
তারা কিন্তু দানসামগ্রীও নেবে না। বিশ্বনাথের বাবা সাফ বলেছে, জিনিসপত্র সোনা-দানা রাখার জায়গা তাদের নেই। এসব তারা নেবে না।
তোমার পায়ে পড়ি।
ঠিক আছে বলাই, তোমার কথা আর কবে ফেলেছি?
কালো, কিন্তু কেষ্টঠাকুরের মতো কমনীয় মুখশ্রীর ভালমানুষ বিশ্বনাথ লাজুক মুখে যেদিন বিয়ে করতে এল সেদিনই তাকে খুব ভালবেসে ফেলল পারুল।
বিশুদা তার এগারো বছর বয়সি শালিটিকে বাসরঘরে একটাই মাত্র ইয়ার্কির কথা বলেছিল, আগের দিনে বিয়ে করলে শালি ফাউ পাওয়া যেত, জানো?
শুনে কী যে রোমাঞ্চ হয়েছিল পারুলের। ওই বয়সটাই অমনি।
তারপর সারাক্ষণ জামাইদার সঙ্গে লেগে লেগে ছিল সে। কী ভাল! কী নরম কথাবার্তা, কী লজ্জাশরম!
সেই বিশুদা এখন প্রবীণ এক মানুষ! চুল পেকেছে কিছু, গোঁফেও পাক। শোনা যায় তিনি বড় চাকরি করলেও তেমন সচ্ছলতা অর্জন করতে পারেননি। এখনও তাঁর বাড়িতে শৌখিন জিনিস দেখা যায় না। বকুলের গায়ে গয়না ওঠেনি, তার আলমারি ভর্তি শাড়ি নেই, যথেচ্ছ খরচ করার মতো টাকাও তারা হাতে পায় না। তাদের দুটি ছেলেই লেখাপড়ায় ভাল, এইটুকুই যা সান্ত্বনা। বড়টি এখন চল্লিশ হাজার টাকা মাইনের চাকরি করে।
না, বিশ্বনাথ জাগতিক অর্থে একজন সফল মানুষ নয়। কিন্তু এই মানুষটাকে শ্রদ্ধা করতে কখনও পারুলের অসুবিধে হয়নি।
বিশুদা, আমি আপনার সঙ্গে আমার বাবার স্বভাবের খুব মিল পাই, তা জানেন?
বিশ্বনাথ একটু হাসল। তারপর বলল, তা একটু আছে বোধহয়।
কী মিল বলুন তো!
সেটা তোরা ভেবে বলবি। আমার কেন যেন গৌরহরি চাটুজ্জেকে খুব পছন্দ হত। বিয়ের আগেই বউয়ের চেয়ে শ্বশুরের প্রতিই আমার আকর্ষণ হয়েছিল বেশি, তাই বিয়ে করতে আপত্তি করিনি।
বকুল বলল, বাবা তোমাকে ভালবাসত খুব। বলত, বিশ্বনাথের মতো ছেলে হয় না। এ মা, ওই দেখ তোমার নাম এনে ফেললাম! কী হবে!
গঙ্গাজল খাও।
তিনজনে একটু হাসাহাসি হল।
পারুল বলল, পতির নামে গতি। অত ভাবছিস কেন?
বিশ্বনাথ স্নিগ্ধ চোখে পারুলের দিকে চেয়ে বলল, হ্যাঁ রে, পারুল, তোকে একটা কথা বলব?
বলুন না।
ভাবছি, তুই আবার টেনশনে না-পড়ে যাস।
কীসের টেনশন?
অমলকে তুই শেষ অবধি কেন বিয়ে করিসনি তা জানি না। তাই জিত্তেস করছি, অমলের কি কিছু দোষ ছিল?
পারুল একটু গম্ভীর হয়ে বলে, দোষ না থাকলে তাকে বাতিল করলাম কেন বিশুদা?
কিন্তু কী জানিস, অমলকে সেদিন রাস্তায় দেখে খুব মায়া হল। কেমন উদাস, উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, গায়ে ধুতির খুঁট জড়ানো। আমাকে অবশ্য চিনতে পারেনি। কী ব্যাপার কিছু জানিস?
না। তবে ওদের বোধহয় কিছু প্রবলেম আছে।
পরশু দিন সন্ধেবেলায় বেগুনক্ষেতের ওপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে এবাড়ির দিকে চেয়ে ছিল। আমি একটু চিন্তায় পড়লাম। ভাবলাম, সেই পুরনো প্রেম থেকে আবার পাগলামি দেখা দিচ্ছে না তো!
চেয়ে ছিল?
হ্যাঁ।
চেয়ে থাকার তো কিছু নেই। অনায়াসে এ বাড়িতে আসতেই তো পারে।
সেটাই স্বাভাবিক হত। দূর থেকে চেয়ে থাকাটা ভাল লক্ষণ নয়। তুই একটু সাবধানে থাকিস।
পারুল হেসে ফেলল, কেন বলুন তো! আপনার কি ধারণা অমল রায় এখনও আপনার প্রৌঢ়া শালিটির প্রতি দুর্বল?
ওরে পাগলি, তুই প্রৌঢ়া হলে আমি তো ভবলীলাই সাঙ্গ করেছি। তোর চেয়ে আমি কত বড় জানিস?
জানি। উনিশ বছর।
তবে? যাক গে, তোকে জানিয়ে রাখলাম।
বিশুদা, অমলদাকে আমিই আমার সঙ্গে দেখা করতে বলে পাঠিয়েছি। কিন্তু বেচারা হয়তো এখন একটু লজ্জা পাচ্ছে। আসতে চেয়েও চক্ষুলজ্জায় আটকাচ্ছে। তাই হয়তো চেয়ে থাকে।
সিরিয়াস কিছু নয় বলছিস?
দুর! ওসব কবে চুকেবুকে গেছে।
প্রেম-ট্রেমের কিছুই জানি না রে ভাই। আমার সব দৌড় তো ওই যে ওই উলবুনুনির কাছে গিয়ে গিয়ে শেষ হয়।
বকুল ভ্রূ কুঁচকে কী যেন ভাবছিল। হঠাৎ বলল, অমলকে আসতে বলেছিস কেন? ওর এখন না-আসাই ভাল। জ্যোতিপ্রকাশ যদি কিছু ভাবে?
পারুল হেসে বলল, তুই যেন কী দিদি! আমরা কি সেই আগের আমরা আছি কি? ম্যাচিওরড হইনি? তা ছাড়া আমি তো আমার কর্তার কাছে কিছু গোপন করিনি। সব বলে দিয়েছি। সেও তো বিশুদার মতোই একজন সরল সহজ মানুষ। কিছু মনেই করেনি।
না বাবা, কী থেকে কী হয়ে যায়! তোর বড্ড সাহস পারুল।
ও মা, সাহসের কী?
ওই তো শুনলি, বাইরে থেকে চেয়ে থাকে। চেয়ে থাকা কি ভাল?
অমলদার বয়স কত হল জানোনা?
পুরুষমানুষ সব বয়সেই খারাপ। বেশি বয়সে আরও খারাপ।
.
অমল ধরা পড়ে গেল পরদিন সন্ধেবেলায়। নানা আঘাটায় ঘুরে সে বেগুনক্ষেতটার বেড়ার ধারে এসে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। ক্ষেতের ওপাশে গাছপালার ফাঁক দিয়ে দোতলার আলো-জ্বলা ঘরটা দেখা যায়। যেন স্বপ্নের ঘর। রোজই কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে অমল। কাউকে দেখা যায় না। দেখতে চায়ও না অমল। কয়েক মিনিট সে তৃষিতের মতো চেয়ে থেকে ফিরে যায়।
আজ সে হয়তো একটু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ একটা সাইকেল কোথা থেকে সাঁ করে এসে তার কাছেই ব্রেক কষল।
