বলাকা হতাশার গলায় বললেন, মনটা ভাল নেই কাকা। এত টাকা দিয়ে বিয়ে!
তা মা, ভাল পাত্র চেয়েছিলে পেয়েছ। গৌরহরি টাকা কবুল করেছে, পুরুষের মতোই কাজ করেছে।
কিন্তু কাকা, ওঁরা তো ধার হিসেবেই চেয়েছিলেন। উনিই যৌতুক দিতে চাইলেন।
সর্বানন্দ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বিয়ের শুরুতেই একটা ধারকর্জের সম্পর্ক কি ভাল লক্ষণ মা? শুভ কাজে ঋণ সুলক্ষণ নয়। তার চেয়ে এই তো ভাল হয়েছে।
আমার খারাপ লাগছে। উনি হয়তো আমার ওপর একটু রাগ করেই কাণ্ডটা করলেন।
সর্বানন্দ মাথা নেড়ে বললেন, তা নয় মা, তা নয়। গৌর তোমার ওপর রাগ করেনি। সেও ধারকর্জের মধ্যে যেতে চাইল না, উকিল মানুষ ত, মানুষ চরিয়ে খায়। মনুষ্য চরিত্র ওরা খুব বোঝে। ধর, ধার দিলে যদি ওঁরা শোধ দিতে না-পারেন বা ইচ্ছে করেই শোধ না-দেন তখন গোলমাল বেধে উঠতে পারে। আত্মীয়-কুটুম মানুষ তাঁরা, মামলা-মোকদ্দমাও করা যাবে না, ঝগড়া বিবাদ করলেও বিপদ। তিক্ততা যাতে না ঘটে তার জন্যই গৌরহরি গোড়া মেরে রাখল। ভালই হল, তোমার মেয়েরও খানিক হক থাকবে। শ্বশুরবাড়িতে মাথা উঁচু করে থাকতে পারবে।
আমার স্বামী কখনও টাকাকে টাকা মনে করেন না। ওইটেই ওঁর দোষ। যেখানে তিন টাকায় হয় সেখানে উনি তিনশো টাকা দিয়ে বসেন।
সর্বানন্দ ফের হাসলেন। বললেন, গৌরহরি কাঁচা মানুষ নয় মা। মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবেই সে টাকাটা দিতে রাজি হয়েছে। পুরনো জমিদারবাড়ি তো! তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনেক ঝুল ময়লা পোকামাকড় থাকে যে! অনেক প্রথা আছে, সহবত আছে, সেসব মেনে চলার হ্যাপা আছে। তোমার মেয়ে সব সয়ে বয়ে নিতে যদি না পারে মা? টাকাটা সেই ব্যাপারে কাজ দেবে। মেয়ের দোষঘাট আর তত দেখবেনা কেউ। কাজটা গৌরহরি ঠিকই করেছে।
সম্বন্ধটা কি ভাল হল বলে আপনি মনে করেন?
ভাল মানে! খুব ভাল। পাঁচজনকে বুক ফুলিয়ে বলার মতো সম্বন্ধ।
আমারও তাই মনে হচ্ছিল। এখন যেন মনটা কেমন আড় হয়ে আছে।
ওসব নিয়ে ভেবো না। কথা পাকা হয়ে গেছে। বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দাও।
পারুলের মনে আছে বিয়ে পাকা হয়ে যাওয়ার পর তার দিদি বকুল যেন কেমন মনমরা হয়ে গেল। বলতে লাগল, আমার বিয়ে দিয়ে বাবা তো সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে। এ বিয়েতে আমার সুখ নেই।
সবাই তাকে বোঝাতে লাগল।
দুই বোন তখন এক খাটে শোয়। এক রাতে বকুল বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছিল।
পারুল বলল, দিদি, কাঁদছিস কেন? এ মা, বিয়ে হবে, এখন কেউ কাঁদে?
আমার ইচ্ছে যাচ্ছে না রে। এ বিয়ে ভাল হবে না।
কেন? জামাইদা দেখতে কেমন সুন্দর, ডাক্তার, বড়লোক–আর কী চাস তুই?
সে আমি জানি না। আমার ভাল লাগছে না।
এক লাখ টাকা নগদ দিয়ে ক্ষান্ত হবেন না বলে গৌরহরি সোনা-দানা, দানসামগ্রীরও বেশ এলাহি আয়োজন করতে লাগলেন।
বলাকাকে বললেন, এক লাখ টাকাটা তো ওরা পাবে। আমার মেয়ে তো পাবে না। তার হাতে কী থাকবে বল! গয়নাগুলোই হবে তার অ্যাসেট।
বড় বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু!
তা হোক বলাই, তা হোক। এই আমার প্রথম মেয়ের বিয়ে। একটু পাগলামি করতে দাও।
পাত্রপক্ষ কি জানে যে, তুমি এতসব দিচ্ছ?
জানবে না কেন? সর্বানন্দ ঘটক রীতিমতো তাদের সব খবর পৌঁছে দিচ্ছে।
তারা কি খুশি?
খুশি না হওয়ার কী আছে?
বলাকা আর কিছু বললেন না। শুকনো মুখে উঠে গেলেন।
বিয়ের বোধহয় সাতদিনও তখন বাকি নেই, হঠাৎ এক মধ্যরাতে পারুলের ঘুম ভেঙে গেল বকুলের ধাক্কায়।
কী রে দিদি?
চুপ। আয় আমার সঙ্গে।
কোথায়?
পাশের ঘরে মা-বাবার কথা হচ্ছে। চল শুনি।
এঃ মা।
আয় না।
পিঠোপিঠি না হলেও তাদের দুই বোনের ভাব ছিল সাংঘাতিক। ভীষণ বন্ধুর মতো। কোনও কথাই গোপন থাকত না তাদের মধ্যে।
চুপি চুপি দুই বোন উঠে পাশের ঘরের দরজায় কান পাতল।
বলাকা বলছিলেন, আমার ঘাট হয়েছে তোমার কথা না-শুনে। বরাবর দেখে আসছি তুমি যা বল, ঠিকই বল। আমিই বারবার ভুল করে ফেলি।
তা কেন বলাই? আমি তোমার ওপর তো নির্ভরই করি। করি না বলো! যদি জানতাম তুমি বিচক্ষণ নও তা হলে কি নির্ভর করতাম। না, তা নয়। আমি তোমার মতো সাংসারিক বুদ্ধি রাখি না। আমি আমার ছেলেমেয়ের মানসিকতারও খোঁজ রাখি না। এসব ভালমন্দ বিচার করার ভার আমি তোমার ওপরেই দিয়ে রেখেছি।
তোমার পায়ে পড়ি, এ বিয়ে ভেঙে দাও।
সে কী বলছ বলাই! এখন বিয়ে ভাঙা কি সম্ভব?
কেন নয়?
এতদূর এগিয়ে কি পিছোনো যায়?
আর কেউ না পারুক, তুমি ঠিক পারবে বুদ্ধি করে বিয়েটা ভেঙে দিতে। ওগো, দশটা গাঁয়ের লোক যে তোমার বুদ্ধি-পরামর্শ নিতে আসে সে কি এমনি?
কিন্তু বিয়ে ভাঙতে চাইছ কেন?
তুমি যখন টাকাটা যৌতুক হিসেবে দিতে চাইলে তখন ভদ্রলোক একবারও আপত্তি করলেন না, মনে পড়ে?
খুব পড়ে।
ওখানেই আমার খটকা। ভদ্রলোক হলে অন্তত একবার আপত্তি করত।
দুনিয়াটা চিনলে না বলাই। শতকরা নিরানব্বই জনই তো ওরকম। কাকে ফেলে কাকে বাছবে।
বাপু, আমার মন সায় দিচ্ছে না।
তা হলে আর মনমতো পাত্র পাবে কোথায় বলো! পাত্র তো অনেক দেখলাম। সবাই কিছু না কিছু প্রত্যাশা করেই। কারও খাঁই বেশি, কারও কম। কারও চোখের চামড়া নেই, কেউ রয়ে-সয়ে চায়। কিন্তু চায় তো সকলেই। কী করবে বলো!
তোমার সেই বিশ্বনাথের কী হল?
বাঃ বলাই! সে যে কালো বলে বাতিল হয়েছে।
