হ্যাঁ রে, আমার বয়সটা বোঝা যায়, না?
তা কেন? তবে তুই একটু মোটা হয়ে গেছিস দিদি।
কী করব বল! জল খেলেও মোটা হই।
বিশ্বনাথ একজন সরকারি আমলা। রিটায়ার করার মুখে। কালোর ওপর চেহারাটা একসময়ে ভালই ছিল। কালো বলে বিয়েতে কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না বকুল। আপত্তি ছিল বকুলের মা বলাকারও। এ বংশে সবাই ফর্সা। ছেলেমেয়ে কেউ কালো নয়। তা হলে কালো জামাই কেন পছন্দ করা হচ্ছে?
গৌরহরি তাঁর স্ত্রী বলাকাকে বলেছিলেন, কালো বলে আমারও যে আপত্তি হচ্ছে না তা নয়। বকুল ফর্সা, কালো বরে তারও আপত্তি হওয়ারই কথা। কিন্তু বিশ্বনাথের যে-গুণটার জন্য সম্বন্ধ করছি তা হল ছেলেটি খুব সৎ। যে-ডিপার্টমেন্টে চাকরি করে সেখানে লাখপতি হওয়া কোনও ব্যাপারই নয়। এই ছেলেটি ঘুষ খায় না, মিথ্যে কথা বলে না, নেশা নেই। এর বাবাও সরকারি অফিসার ছিলেন, সেই মানুষটিও সৎ।
বলাকা বললেন, খুঁজলে কি অমন আর পাওয়া যাবে না?
যাবে বলাই, যাবে। খুঁজলে কী না পাওয়া যায়!
তা হলে আর একটু দেখো না। মেয়ে তো সুন্দরী, আর বয়সও বয়ে যাচ্ছে না।
গৌরহরি একটু চিন্তিত হলেন। বললেন, তুমি কখনও আমার মতের বিরুদ্ধে মত দাও না। এবার যখন দিলে তখন ভাবতে হবে। চট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না।
গৌরহরিকে যতই স্বাধিকারপ্রমত্ত এবং খেয়ালি বলে মনে করুক অন্য লোক, পারুল জানে, তার বিবেচনাশক্তি বড় কম ছিল না।
বলাকা বললেন, ওগো, তুমি আবার আমার কথায় কিছু মনে কোরো না। পাত্র ভাল স্বীকার করছি। কিন্তু ওরা আবার বাঙাল দেশের লোক, সেটাও একটু ভেবে দেখো।
গৌরহরি চিন্তিত মুখে বললেন, সবই ভেবেছি। আবার ভাবব। চট করে কিছু করব না। কিন্তু বলাই, একটা জিনিস ভেবে দেখেছ?
কী গো?
এমন পরিবার কি আজকাল খুঁজে পাবে যারা বংশানুক্রমে ছেলের বিয়েতে পণ নেয় না?
সেটা পাওয়া মুশকিল। কিন্তু আমাদের তো টাকার অভাব নেই। পণ দিয়ে যদি ভাল পাত্র পাওয়া যায়, না হয় দিলুম পণ!
গৌরহরি হাসলেন, বেশ বললে বলাই, বেশ বললে। পণ দিলে যদি ভাল পাত্র পাওয়া যায়! কিন্তু ভেবে দেখেছ কি যারা পণ নেয় তাদের কিছুতেই ভাল বলা যায় না?
ওটা যে রেওয়াজ।
মৃদু মৃদু মাথা নেড়ে, সহাস্যে গৌরহরি বলেন, রেওয়াজ নয়, রেওয়াজ নয়। করাপশন যখন ছড়িয়ে যায় তখন সেটাকে কাস্টম বলে মেনে নেওয়া যে ভয়ংকর রকমের অন্যায়।
বলাকা একটু ভয় পেলেন। দুঁদে উকিলের সঙ্গে পেরে ওঠা তাঁর কর্ম নয় বুঝে বললেন, পণ ছাড়াও কি পাত্র জুটবে না?
জুটবে। চেষ্টা করলে পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই। দেখছি চেষ্টা করে।
তুমি রাগ করলে না তো!
না। বলছি, মেয়েটার ভালমন্দ বিবেচনা করার অধিকার তো আমার চেয়ে তোমার কম নেই। এক্ষেত্রে আমার মতামত জোর করে চাপানো ঠিক হবে না।
বিশ্বনাথকে তোমার কি খুব পছন্দ?
সে কথা থাক বলাই। আমি আর তার কতটুকু জানি? সৎ হওয়াটাই বড় কথা নয়, অন্যান্য ব্যাপারও দেখা উচিত। এইজন্যই তো বলে, লাখ কথা ছাড়া বিয়ে হয় না।
বিশ্বনাথ এরকম বাতিলই হয়ে গেল সেদিন।
বুড়ো ঘটক সর্বানন্দ ভট্টাচার্য তখনও বেঁচে। এ সম্বন্ধ তাঁরই করা। তিনি একদিন বলাকার সঙ্গে এসে দেখা করে বললেন, মা, এ সম্বন্ধ তোমার পছন্দ নয় বলে শুনলাম।
বলাকা ঘোমটা দিয়ে আড়াল থেকে বললেন, ছেলে যে কালো।
সর্বানন্দ হাসলেন। সত্তর বছর বয়সেও ঝকঝকে দাঁত। সুঠাম চেহারা। বললেন, তাই তো মা! বামুন কালো হলেই গেরো! তবে কিনা সব ক্ষেত্রেই কিছু ব্যতিক্রম থাকে। তা হলে মা, মুগেবেড়ের ছেলেটার কথা ভেবে দেখো। কুলীন, ফর্সা, যেমনটি চাও তেমন।
কী করে?
পড়তি জমিদার। ছেলে ফেলনা নয়। ডাক্তার।
তবে তো ভালই কাকা।
হ্যাঁ। ভাল। দেখো, কথা কয়ে। আমি গৌরহরিকেও বলেছি। পাত্র অপছন্দের নয়।
পণ দিতে ওঁর তো খুব আপত্তি। এরা কি পণ চায়?
তা এখনও কিছু বলেনি। কথা এগোলে বোঝা যাবে।
মুগবেড়ের পাত্রের নাম সায়ন্তন। চেহারা ভাল, ডাক্তারি পাস, জমিদারের ছেলে। আর কী চাই! তরতর করে কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল। হ্যাঁ, পণের ব্যাপার একটু ছিল তবে ঠিক পণও বলা যায় না। পাত্রের বাবা মেয়ে দেখে পছন্দ করে আর পাঁচটা কথার পর দেনা-পাওনার প্রসঙ্গ উঠতে বললেন, পণ-টন নয়। তবে আমাদের অবস্থা এখন পড়তি। ছেলের বিলেত গিয়ে এম আর সি পি করার প্ল্যান। ফিরে এসে বাড়িতেই নার্সিংহোম করবে। অনেক টাকার পাল্লা। যদি লাখখানেক টাকা ধার হিসেবে দেন তা হলে আমি বাকিটা সামলে নিতে পারব। এ টাকাটা আমরা ধীরে ধীরে শোধ দিয়ে দেব। চাইলে সুদও পাবেন।
গৌরহরি শান্ত গলায় বললেন, সায়ন্তনকে আমার স্ত্রীর খুবই পছন্দ হয়েছে। সে উপযুক্ত পাত্র। এক লাখ টাকা ধার হিসেবে নয়, যৌতুক হিসেবেই দেব। ও নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।
ভদ্রলোক একটু ভাবিত হলেন, যৌতুক দেবেন!
দেব।
ভদ্রলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আমাদের আগের অবস্থা থাকলে এসব কথা উঠত না। অবস্থা বিপাকে পড়েই–ঠিক আছে, আপনার যা ইচ্ছে।
ওঁরা চলে যাওয়ার পর বাড়িটা কিছুক্ষণ থমথম করেছিল, মনে আছে পারুলের। বলাকার মুখে যুদ্ধজয়ের হাসি ছিল না। বকুলেরও মন খারাপ। ব্যাপারটা বড় বাড়াবাড়ি হয়ে গেল যেন।
পরদিন সর্বানন্দ এলেন। বলাকাকে ডেকে বললেন, কেমন মা, সব দিক রক্ষে হয়েছে তো!
