না পান্না। বিজুদাকে বলার দরকার নেই। সব জায়গায় তো আর আমি এক একজন করে প্রোটেক্টর খুঁজে পাব না। পৃথিবীর সব জায়গাতেই অল্পবিস্তর এসব হয়। সেসব আমাকে একাই তো হ্যান্ডেল করতে হবে।
ওদের তোমার ওপর এত রাগ কেন বলো তো!
আমি তো ওদের পাত্তা দিইনা, তাই বোধহয়। দিন সাতেক আগে একটা ছেলে নির্জন রাস্তায় আমার সঙ্গে একটু ঘনিষ্ঠ হওয়ায় চেষ্টা করে। আমি মাঝে মাঝে খুব ঘোরের মধ্যে থাকি, জানো তো! সেদিনও ছিলাম। ছেলেটা কী বলছিল আমাকে, শুনতে পাইনি। ছেলেটা আমার হাতে একটা কাগজ গুঁজে দিয়ে চলে যায়। তাতে ভুল ইংরিজিতে বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি কথা লেখা ছিল।
এ মা! কী লেখা ছিল তাতে?
ফোর লেটার ওয়ার্ডও ছিল।
কে ছেলেটা বলো তো!
তাকে আবার দেখলেও চিনতে পারব না। বললাম না, আমি তখন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম।
এসব আগে এখানে কখনও হত না, আজকাল হচ্ছে।
প্লিজ তোমার বিজুদাকে বোলো না।
যে ছেলেটা চেঁচাল তাকে আমি চিনি। শিবেন্দ্র, কামার পাড়ার দিকে থাকে। দাঁড়াও খোঁজ নিতে হবে।
কিন্তু আমাকে নিয়ে কোনও হইচই হোক আমি চাই না। আমরা তো কিছুদিন পরেই চলে যাব।
শোনো সোহাগ, আমাদের গ্রাম সম্পর্কে তুমি যদি খারাপ ইমপ্রেশন নিয়ে যাও তাহলে তুমি হয়তো আর আসতে চাইবে না, একটা খারাপ ধারণা নিয়ে বসে থাকবে।
উদাস মুখে সোহাগ বলল, একমাত্র গভীর অরণ্য ছাড়া সব জায়গাই তো খারাপ, কলকাতা ভাল নয়, মিউনিক ভাল নয়, লন্ডন ভাল নয়, নিউ ইয়র্ক ভাল নয়। না পান্না, আমার কোনও রাগ বা অভিমান হচ্ছে না।
তুমি খুব অদ্ভুত!
সবাই তাই বলে।
জানো, আজ একটা ছেলে আমাকে প্রেমপত্র দিয়ে গেছে!
সোহাগ হাসে, তাই বুঝি?
হ্যাঁ। সেটা অবশ্য লাভ লেটার, অসভ্য কথা নেই।
.
পরনে ধুতি, গায়ে হাতাওয়ালা একটা গেঞ্জি, আর ধুতির খুঁটটা তার ওপর জড়ানো, এই পোশাকে অমল গাঁয়ের রাস্তায় ঘুরতে বেরিয়েছিল, ভারী অন্যমনস্ক, এসে অবধি সে গাঁয়ের কারও সঙ্গে দেখাসাক্ষাতের চেষ্টা করেনি, পুরনো বন্ধুদের খোঁজখবর নেয়নি, কারও বাড়িতে গিয়ে বসেনি, শৈশবের স্মৃতিচারণাও তার ভাল লাগে না।
কয়েকদিন ছুটি আছে তার। ঘরে বসে বই পড়ে আর একা একা ঘুরে ঘুরে ছুটিটা কাটিয়ে দেবে সে, বাবা, ভাই, বোন, বউ, ছেলেমেয়ে কারও সঙ্গেই সে আজকাল স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। শুধু একা থাকতে ভাল লাগে। হৃদয় খুঁড়লেই ব্যথা-বেদনার উৎসমুখ খুলে যায়।
জনহীন জায়গাগুলো তার জানা, সন্ধের পর খেলার মাঠ, পতিত জমি, জংলা জায়গা, শুধু রতনের সঙ্গে তার কিছু কথাবার্তা হয়। ছেলেটার সংসারী বুদ্ধি নেই। মোটরবাইক হল তার নেশা। সারা দিন ঝাড়ে, মোছে, যত্ন করে, টুকটাক সারাইও করে নেয়। মোটরবাইকই তার ধ্যানজ্ঞান। অন্য খেয়াল নেই, সে অমলকে প্রায়ই দুর্গাপুর বা কালনা নিয়ে যেতে চায় তার বাইকে। বর্ধমান ঘুরিয়ে আনল কাল, বেশ চালায়।
ঘুরে ঘুরে তেষ্টা পেল অমলের। একটু চা পেলে হত। কোনও অসুবিধে নেই। যে কোনও বাড়িতে ঢুকে পড়লেই হল। আদর করে বসিয়ে চা খাওয়াবে। চা পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু আজকাল কথা বলা বা শোনা তার কাছে অসহ্য ঠেকে।
বাড়িতে ফিরে ধীর পায়ে দোতলায় উঠতেই মোনালিসা দরজা খুলে দিয়ে বলল, এসো দেবদাস। তোমার পারু তোমাকে দেখা করতে বলে পাঠিয়েছে।
থতমত অমল বলে, কে?
পারু গো পারু। ভুলে গেলে নাকি?
অমল গোরুর মতো নিস্পৃহ চোখে চেয়ে থাকে।
.
১৩.
আমি ভারী অবাক হয়ে দেখছি তোকে।
কেন, অবাক হওয়ার মতো কী দেখলেন?
আমার হিসেবমতো তোর বয়স এখন পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ। ঠিক তো!
না মশাই, আপনার শ্যালিকার বয়স এখন আটত্রিশ।
বাজে বকিস না। আচ্ছা, ছত্রিশই ধরছি।
স্নেহের পাত্রী বলে সত্যি কথাটা স্বীকার করতে চান না তো!
তা নয়। হিসেব করেই বলছি।
আচ্ছা, নয় তাই হল, এবার অবাক হওয়ার কথাটা বলুন।
আমি দেখছি তোর শরীরে এক ফোঁটাও চর্বি জমেনি। আশ্চর্য সেটাই।
কেন, এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে বিশুদা?
কিছু মানুষ থাকে দড়কচা-মারা চেহারা, তাদের কখনও চর্বি হয় না। কিন্তু তোর তো সেরকম সিঁটকোনো চেহারা নয়। তোর চর্বি হওয়ার কথা। এমনকী তোর পেট বা কোমরেও ভাঁজ পড়ে না। হ্যাঁ রে, ডায়েটিং করিস নাকি।
খাটে বসে আপন মনে উল বুনে যাচ্ছিল বকুল। সে পারুলের চেয়ে নয় বছরের বড় দিদি। এতক্ষণ চুপ করে থেকে এবার বলল, চিরকাল ডায়েটিং করাই তো ওর স্বভাব। সেই ছেলেবেলাতেও একটুখানি খেয়েই ওর পেট ভরে যেত।
বিশ্বনাথ মাথা নেড়ে বলে, যতই কম খাক, চর্বি না জমার কথা নয়। ওর দেখো, একটুও নেই। বেশি ডায়েটিং করলে চেহারায় একটা অসুস্থ শীর্ণতার ছাপ পড়ে, ওর তাও হয়নি।
পারুল হাসছিল, এসব ম্যাজিক মশাই, ম্যাজিক।
তুই কি ব্যায়াম করিস?
খুব বেশি কিছু নয়। সকালে বরের সঙ্গে একটু হাঁটি। আর সামান্য কয়েকটা আসন করি।
তোর বয়সটাও এক জায়গায় আটকে আছে। এখনও কলেজের ছাত্রী বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।
বকুল বলে, ওগো, ওকে অত নজর দিও না তো! তোমার নজর বাপু খুব খারাপ। জানিস পারুল, ও যখনই আমাকে ভাল দেখে তখনই আমার শরীর খারাপ হয়।
বিশ্বনাথ হাসে, নজরের দোষ কী বল! পারুল যে আমাকে বড্ড অবাক করে দিয়েছে। দু-তিন বছর বাদে দেখা, একইরকম আছে। একটুও বদলায়নি।
