আচ্ছা, সাপ দেখে তোমার কী লাভ হবে বলো তো!
আমার ভীষণ একটা অ্যাট্রাকশন। সাপ তো ইভিল, যেমন, ডেভিল। সাপই ইভকে জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাইয়েছিল। তাই না?
তাতে কী হল?
সাপ ভীষণ মিস্টিরিয়াস একটা প্রাণী। আমার অনেকদিন ধরে একটা সাপ পুষতে খুব ইচ্ছে করে। সাপটা আমার গায়ে বেয়ে বেড়াবে, গলায় পেঁচিয়ে থাকবে, মাথার ওপর উঠে ফণা তুলে থাকবে। অনেকটা শিবের মতো।
ও মা! মাথাটা তো গেছে দেখছি! কী বিটকেল ইচ্ছে রে বাবা।
সবাই তাই বলে।
সাপ-খোপের চিন্তা মাথা থেকে তাড়াও তো।
আজ একটা কাণ্ড করে ফেলেছি।
কী করেছ?
আজ সকালে একটা সাপুড়ে যাচ্ছিল। আমি তাকে ডেকে একটা সাপ কিনতে চাইলাম। তাতে সে খুব অবাক হয়ে গেল। বলল, সাপ নিয়ে কী করবেন? বললাম, পুষব। লোকটা মাথা নেড়ে বলল, সাপ পোষা বিপদের কাজ। বিদ্যে না জানলে নাকি ওসব করতে নেই।
ঠিকই তো বলেছে।
তখন আমি তাকে কিছু টাকা বখশিস দিয়ে বললাম, তাহলে আমাকে সাপ ধরা শিখিয়ে দাও। খড়ের মাচার নীচে তিনটে গোখরো সাপ আছে, সেগুলো যদি সে ধরে তাহলে আমি কায়দাটা শিখে নেব। টাকার লোভে সে রাজি হয়ে গেল।
বাস্তুসাপ ধরতে বললে? কী সর্বনাশ! তারপর?
তখন বাড়িতে তেমন কেউ ছিল না। পিসি বর্ধমানে গেছে, জেঠিমা পাড়ায় বেরিয়েছে। শুধু বাচ্চারা কয়েকজন ছিল। সাপুড়েটা কী সব মন্ত্র বলে একটা শেকড়ের টুকরো মাচার নীচে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে লাগল। আর ভেঁপুতে কুক কুক করে অদ্ভুত শব্দ করতে লাগল।
মা গো! তুমি তখন কোথায় দাঁড়িয়েছিলে?
আমি ওর সঙ্গে সঙ্গেই ছিলাম।
তোমার দুর্জয় সাহস ভাই! তারপর কী হল?
হঠাৎ ফোঁস ফোঁস শব্দ করতে করতে ইয়া বড় একটা সাপ খুব তেড়ে বেরিয়ে আসছিল। কী সাংঘাতিক স্পিড! লোকটা চেঁচিয়ে আমাকে বলল, দিদি সরে যান! কিন্তু জানো, সাপটা যখন বেরিয়ে এল আমি তখন তার দুটো পুঁতির মতো চোখের দিকে চেয়ে একদম হিপনোটাইজড হয়ে গেলাম। একটুও নড়তে পারিনি।
ও বাবা!
লোকটা আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে না দিলে ইট কুড বি ফ্যাটাল। সাপটা আমার খুব কাছে চলে এসেছিল দুম করে।
ইস, কী যে হত আজ!
লোকটা কিন্তু খুব এক্সপার্ট। সাপটা বেরিয়ে আসতেই চট করে একধারে সরে গিয়ে এক ঝটকায় সাপটার লেজ ধরে তুলে ফেলে একটা ঝাঁকুনি দিল শুধু। তারপর ঝুড়িতে ভরে ফেলল। বলল, আমার আর ঝাঁপি নেই দিদি, আজ এই একটাই ধরলাম। অন্যগুলো এখন গর্তে নেইও, ওরা এই সময়ে নাকি খেতে বেরিয়ে যায়।
ব্যাপারটা বাড়ির লোক জানে?
হ্যাঁ। জানতে পেরেই তো আজ খুব চেঁচামেচি হল। জেঠিমা ফিরতেই বাচ্চারা তাকে সাপ ধরার কথা বলে দেয়। জেঠিমা ভীষণ ভয় পেয়ে চেঁচাতে থাকে, সর্বনাশ হয়ে যাবে! বংশ থাকবে না। ভিটেমাটি উচ্ছেদ হবে…আরও কত কী! খবর পেয়ে জ্যাঠামশাই এল, বাবা কোথায় গিয়েছিল, চলে এল। তারপর রতনদাকে ডাকিয়ে আনা হল। বাবা আমাকে ভীষণ বকল আজ। তারপর রতনদার মোটরবাইকে চেপে বাবা আর রতনদা বেরোল সাপুড়েকে খুঁজে বের করতে।
পাওয়া গেল তাকে?
হ্যাঁ। বাসরাস্তায় গুমটিতে বসেছিল। তাকে ধরে নিয়ে আসা হল। সে যেসব ওষুধ ছড়িয়েছিল সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে সাপটাকে ছেড়ে দিয়ে গেল ফের। আমি এখন বাড়িতে খুব আনপপুলার।
তুমি হাসছ! কাজটা মোটেই ভাল কয়নি। বাস্তুসাপ ধরাও ভাল নয় শুনেছি।
আমি জাস্ট শিখতে চেয়েছিলাম। আর কিছু নয়।
ওসব শিখতে অনেক সময় লাগে, গুরুর কাছে শিখতে হয়।
সোহাগ ঠোঁট উলটে বলে, তা হবে, কিন্তু আমার মনে হয় ব্যাপারটা কিছু কঠিন নয়। আসলে দরকার স্পিড, আর ঠিক জায়গায় ধরে ফেলা, আর ভয় না পাওয়া।
তার মানে! তুমি কি সাপ ধরার চেষ্টা করবে নাকি?
মনে হচ্ছে চেষ্টা করলে পারব।
খবদার সোহাগ ও-কাজও করতে যেও না।
একটু দূর থেকে নিউ স্পোর্টিং ক্লাবের বারান্দায় কয়েকটা ছেলেকে বসে থাকতে দেখতে পেয়েছিল পান্না। চেনা ছেলেই সব।
ক্লাবঘরটা পেরিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটা ছেলে বেশ উঁচু গলায় বলে উঠল, এখানে বেশি রংবাজি মারাতে এলে মুখের জিওগ্রাফি চেঞ্জ করে দেব। গাঁয়ে ফুটানি মারতে এসেছে..
পান্না অবাক হয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে ছেলেগুলোর দিকে চেয়ে বলে, কাকে বলছেন?
একটা ছেলে বলল, তোমাকে নয়। যাকে বলেছি সে বুঝতে পেরেছে।
কাকে বললেন?
বললাম তো তোমাকে নয়।
সোহাগ অন্য দিকে চেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। পান্নার হাতটা টেনে বলল, চলে এসো। দে আর কাওয়ার্ডস।
হাঁটতে হাঁটতে পান্না বলে, কাকে বলছিল বলো তো!
আমাকে।
তোমাকে! কেন বলছিল?
তা জানি না, আমি রাস্তায় বেরোলেই আজকাল কয়েকটা ছেলে আওয়াজ দেয়।
তুমি রুখে দাঁড়াওনি?
না, ঝগড়া করতে আমার ভাল লাগে না। তিন-চার দিন আগে যখন প্রথম ব্যাপারটা হয় তখন আমি একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কথাটা কি আমাকে বললেন? সে জবাব না দিয়ে চলে গেল।
খুব সাহস হয়েছে তো এদের! দাঁড়াও বিজুদাকে বলে ঠান্ডা করে দেব।
বিজুদা কে?
আমার জ্যেঠতুতো দাদা, স্পোর্টসম্যান, বিজুদাকে সবাই ভয় পায়।
তার মানে একজন পুরুষের সাহায্য চাইবে?
তাতে কী?
মাথা নেড়ে সোহাগ বলে, তাতে আমার আত্মসম্মানে লাগবে। পুরুষের অ্যাটাক থেকে বাঁচার জন্য পুরুষেরই সাহায্য নেওয়াটা কি ভাল?
এটা পুরুষ-মেয়ের ব্যাপার তো নয়, এরা বাজে ছেলে, এদের ঢিট করা দরকার।
