পারুলদির চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। একটু চুপ করে থেকে বলল, ঠিকই বলেছিস হয়তো, মায়ের মনটাই হয়তো পেয়েছি। মা যেন বেঁচেই ছিল শুধু বাবার জন্য। বাবাই ছিল মায়ের ধ্যানজ্ঞান। এখন মা যেন ঠিক বেঁচেও নেই। মাঝে মাঝে ভয় হয় মা বোধহয় মনে মনে সহমরণেই চলে গেছে। চলে ফিরে বেড়াচ্ছে, কথা কইছে, মজার কথা শুনে হাসছে, কিন্তু মা যেন মা নেই।
উঃ পারুলদি, ওভাবে বোলো না। শুনে এখন আমার কেমন ভয়-ভয় করছে। সহমরণ কেন হবে? বড়মার মনটা খুব খারাপ, তা তো হতেই পারে।
পারুলদি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, সারাদিন আমি কেবল মাকে ঘুরে ঘুরে দেখি, স্টাডি করি, বুঝবার চেষ্টা করি। বড্ড ভয় হয়, এত শোক সইতে না পেরে মাও যদি চলে যায়?
না না, বড়মা কেন মরবে? শোক কত কেটে গেছে দেখ না? এখন বড়মা অনেক সামলে গেছে।
মাকে দেখে রাখিস। মা তো কিছুতেই আমাদের কারও কাছে গিয়ে থাকবে না। তোরাই ভরসা।
একটা কথা জিজ্ঞেস করব পারুলদি?
বল না।
সোহাগ খুব তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। তোমাদের বাড়িতে অনেক লোকজন আছে বলে আসতে চায় না।
কেন রে, আমার কাছে আসতে চায় কেন?
কী জানি। তোমাকে ওর খুব পছন্দ।
তোর সঙ্গে ভাব হয়েছে বুঝি?
হ্যাঁ।
তোকে বলেছিলাম না ওর সঙ্গে বেশি মিশিস না।
কী করব বলল, বেচারার বন্ধু নেই। আমার কাছে আসে গল্প করতে।
এঁচোড়ে পাকা মেয়ে, না?
না পারুলদি, একটু পাগলি, কিন্তু ভারী ভাল মেয়ে।
মাও বলছিল, ওর নাকি আমাকে গডেস বলে মনে হয়।
হ্যাঁ। ও তো কতবার সে কথা বলে।
আর কী বলে?
তোমার প্রতি ওর ভীষণ সফটনেস!
বাজে কথা কিছু বলে না তো?
কী বাজে কথা?
খারাপ কিছু?
তোমার সম্পর্কে? না তো!
আমার গা ছুঁয়ে বল।
পান্না অবাক হয়ে পারুলের হাত ধরে বলল, গা ছুঁয়ে বলছি।
ফিক করে একটু হেসে পারুল বলে, তা হলে আনিস একদিন। সবাই চলে যাওয়ার পর।
ওরা বোধহয় খুব বেশিদিন থাকবে না। পুজোর পর কলকাতা চলে যাবে।
তা হলে পরে কখনও হবে।
একটু আনিই না একদিন পারুলদি?
পারুল একটু গম্ভীর হয়ে বলল, এখন বড় হয়েছিস, কাজেই তোকে বলা যায়। অমলদার সঙ্গে আমার একটা রিলেশন ছিল। সবাই জানে। ওর মেয়ে এলে সকলের সামনে আমার একটু অস্বস্তি হয়।
দুর! তুমি ভীষণ পিউরিটান। তাতে কী হয়? সেসব তো কবে চুকেবুকে গেছে।
পারুল হাসল, সে অবশ্য ঠিক। কিন্তু মেয়েটাকে কেন যেন আমার পছন্দ হয় না।
কেন হয় না বলো তো!
কী জানি। ভিতর থেকে একটা অপছন্দের ভাব আসে।
সোহাগ কিন্তু হেলপলেস মেয়ে।
কেন, হেলপলেস কেন?
ওর মা বাবার সঙ্গে রিলেশন খুব খারাপ। ওর মা বাবার ধারণা ওর মধ্যে কেউ ইভিল স্পিরিট ঢুকিয়ে দিয়েছে।
যাঃ!
হ্যাঁ গো। আমেরিকায় থাকতে নাকি একটা বাজে গ্রুপ ওকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর নাকি ব্রেনওয়াশ করে ফেরত দেয়।
ধ্যেত! গাঁজাখুরি গল্প বলেছে।
গল্পটা ও বলেনি।
তাহলে?
বলেছে ওর মা।
ওর মাকে তুই চিনিস নাকি?
হ্যাঁ, সোহাগ নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
মহিলা কেমন?
খারাপ নয় তো!
ওটা একটা কথা হল? খারাপ না হোক, একটা রকম আছে তো!
আমার তো ভালই লাগে। কাছে গেলে গল্প-টল্প করে।
কীসের গল্প?
বিদেশের গল্প।
আমার কথা কখনও জিজ্ঞেস করেনি তো!
না। কিন্তু ভদ্রমহিলা ভীষণ ডিপ্রেশনে ভোগেন।
কেন?
তা জানি না।
.
রাইকিশোরী নামটা শুনলেই একটা কবিতার মতো কিশোরী মেয়ের ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠবেই উঠবে। সরু কোমর, সদ্য ফুটে-ওঠা বুক, অবাক মুখ, আর চোখে মুগ্ধ চেয়ে থাকা। হায়, এই রাইকিশোরী কিছুতেই মেলে না ছবিটার সঙ্গে।
বস্তা তুলে বড় টিনে সাবধানে এক অবিশ্বাস্য দক্ষতায় মুড়ি ঢেলে দিচ্ছে সে। এবাড়িতে মুড়ির খুব টান। চারটে মুনিশ ওই পুবের বারান্দায় বসে বড় বড় অ্যালুমিনিয়ামের কানা উঁচু থালায় মুড়ির পাহাড় নিয়ে বসবে। একটা তরকারি আর ডাল ঢেলে দিতে হয় মুড়ির মাথায়। তার ওপর জল ছিটকে ছিটকে মুড়িটা মেখে নিয়ে বড় বড় সূর্যমুখী লঙ্কা কামড়ে খেয়ে নেবে চোখের পলকে। দুদিন বাদে বাদেই রাইকিশোরীকে আসতে হয়।
সামান্য একটু সেজে নিতে নিতে দৃশ্যটা জানালা দিয়ে দেখছিল পান্না। কোনও মণীশ ওকে চিঠি দেবে কি কখনও? মুড়ি ফেরি করে করে যৌবন যায় রাইকিশোরীর। রূপহীনার তো প্রেম নেই।
আয়নায় নিজেকে একটু মন দিয়ে দেখে পান্না। না, নিজের চোখ দিয়ে নয়। অজানা এক মণীশের চোখ দিয়ে।
হাই।
পান্না হেসে বলে, হাই।
কোথাও বেরোচ্ছ?
সে একটু পরে গেলেও হবে। বোসো না।
আমি কি তোমাকে ডিস্টার্ব করলাম?
না তো! বোসো।
বসব না। আমার আজ চারদিকটা খুব ভাল লাগছে। শরৎকালটা এখানে ভীষণ ভাল, না?
ভীষণ।
চলো একটু হেঁটে আসি।
চলো।
আমার একটা মুশকিল হয়েছে।
কী মুশকিল?
চলো, হাঁটতে হাঁটতে বলব।
উঠোন পেরিয়ে সরু পথটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে ভারী উদাস গলায় সোহাগ বলে, বাস্তুসাপ কাকে বলে জানো?
হ্যাঁ। কেন জানব না? এখানে অনেকের বাড়িতে আছে।
আমাদের বাড়িতেও আছে। সাপের একটা হিপনোটিক পাওয়ার আছে, তাই না?
ও বাবা! ওসব জানি না। সাপ শুনলেই আমার গা সিরসির করে।
আমি রোজ আমাদের খড়ের মাচানটার কাছে গিয়ে উবু হয়ে বসে সাপগুলোর জন্য অপেক্ষা করি।
তুমি একটা ক্ষ্যাপা মেয়ে। ওরকম করতে আছে?
আমার ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু একদিনও আমার সামনে বেরোয় না।
