আজ সে জানালা দিয়ে চেয়ে মুড়িউলি রাইকিশোরীকে দুপুরের আলোয় দেখছে আর রূপের কথা আর বেহদ্দ পুরুষের কথা ভাবছে।
আজ জানালা দিয়ে কে তার বিছানায় একখানা ভাঁজ করা প্রেমপত্র ফেলে দিয়ে গেছে। ভাল কাগজও জোটেনি। শস্তা এক্সারসাইজ বুকের একখানা ফাঁস করে ছেঁড়া পাতা। হাতের লেখাটা অবশ্য তত খারাপ নয়।
আজকাল আবৃত্তিকারদের কল্যাণে জীবনানন্দ ঘরে ঘরে। চিঠির মধ্যেও সেই বিদিশার নেশা, পাখির নীড়ের মতো চোখ, হালভাঙা নাবিক এইসব আছে। ভাল করে পড়লও না পান্না। তার সতেরোখানা প্রেমপত্রের সঙ্গে আঠেরো নম্বরটাও রেখে দিল চন্দনকাঠের বাক্সে। নীচে যার নাম সই সেই মণীশকে সে চেনেও না। হয়তো কারও বাড়িতে এসেছে। কারও আত্মীয়স্বজন হবে।
প্রেমপত্র পেলে পান্না খুশি হয় না। আবার রেগেও যায় না। আসলে তেমন কোনও প্রতিক্রিয়াই হয় তার। এসব ছ্যাবলাদের সঙ্গে নিজেকে ভাবতে তার ইচ্ছেই হয় না কখনও।
তবু ট্রফি হিসেবে থাকে। প্রেমপত্র একধরনের সার্টিফিকেটও তো বটে।
দুপুরবেলাটা গড়িমসি। আলিস্যিতে ভরা তার শরীর। তবু উঠতে হল। আজ বড়মার বাড়িতে তার নেমন্তন্ন। নেমন্তন্ন প্রায়ই থাকে। একা ফাঁকা বাড়িতে বড়মা একা বসে খায় বলে তাকে প্রায়ই ডেকে পাঠায়। কিন্তু বড়মার বাড়িতে সে কিছুতেই মাছটা খেতে পারে না।
বড়মা অবশ্য জোর করে, কেন মাছ খাবি না? খা, একটু তফাতে বসে খেলেই হবে।
না বড়মা, নিরামিষই ভাল।
তোর যে তাহলে পেট ভরবে না?
কেন বড়মা? গোবিন্দভোগ চালের ভাত, সরবাটা ঘি, আলুভাজা, পোস্ত, আলুর দম, টক–এতেও ভরবে না?
তাহলেও তোর কষ্ট তো হবে।
একটুও না। মাছে আমার আজকাল আঁশটে গন্ধ লাগে।
আজ অবশ্য তা নয়। আজ নেমন্তন্ন করেছে পারুলদি, কী সব চাইনিজ আর ইটালিয়ান রান্না করবে বলে নানারকম জিনিস আনিয়েছে কলকাতা থেকে। কাল রাতে বলল, তোর জামাইবাবু একটু আনইউজুয়াল ডিশ পছন্দ করে। তুইও খাবি। দুবেলাই নেমন্তন্ন। মনে থাকে যেন।
আর কাকে বলবে?
কাউকে না। বাইরের লোক ডাকলে বাপু ঘরোয়া আড্ডার মেজাজটা থাকে না। নিজেরা বেশ গল্প টল্প করব। অনেকদিন বাদে নিজের হাতে রান্না করব, কীরকম হবে কে জানে বাবা। নুন-টুন কমবেশি হতে পারে।
কেন, তুমি রান্না করো না?
দুর! সময় পাই কোথায়? এক মিশিরজি আছে, সেই রাঁধে। আমাকে তো তোর জামাইবাবুর অফিস সামলাতে হয়।
তাই তো! পাস-টাস করলে আমাকে তোমার অফিসে একটা চাকরি দেবে?
কেন রে মুখপুড়ি, চাকরি করবি কেন?
খারাপ কী বল! চাকরি, না হয় বিয়ে করে ঘরসংসার- এই তো! আর কোনও অলটারনেটিভ আছে?
পারুলদি একথায় হাসল না, ভাবল। বলল, অলটারনেটিভ অনেক হয়তো আছে। কিন্তু আমরা তা ভাবি না। তবে তোকে বলি, বিয়ে না করে চাকরি করলেই কিন্তু কিছু সুখ হয় না, ওটা ভুল ধারণা। বিয়ে যদি দাসত্ব হয় তবে চাকরি আরও দাসত্ব। ওসব চাকরির চিন্তা মাথা থেকে তাড়া।
ধর, চাকরি না করে যদি বুটিকের দোকান করি বা ফ্যাশন সেন্টার বা বিউটি পার্লার!
ব্যস, ফুরিয়ে গেল তো! আজকাল সব মেয়েই কেবল ওসব লাইনে ভাবে। প্রফেশনাল হয়ে যে কিছু লাভ হয় না তা বুঝতে চায় না। ভাবে গাদা গাদা টাকা রোজগার করলেই বুঝি খুব সুখ।
কী করব তাহলে বল তো! ঘরসংসার? সেও তো ফুরিয়ে যাওয়া। কী সুখ আছে বল!
পারুলদি একটা গভীর শ্বাস ফেলে বলে, সত্যি বলতে কী, আমার কেবল মনে হয়, আমরা একটা ভুল জীবন কাটিয়ে যাচ্ছি। আমার কথাই ধর না। তোর জামাইবাবু তো ভীষণ ভাল একটা লোক। আমার কোনও অভাব নেই। কাজকর্ম, সংসার নিয়ে দিব্যি সময় কেটে যায়। তবু মাঝে মাঝেই কেমন যেন হাঁফ-ধরা লাগে।
চোখ গোল গোল করে পান্না বলল, তোমারও হাঁফ ধরে যায়! তাহলে আমাদের কী হবে?
তাই তো বলছি, অলটারনেটিভ খুঁজে কিছু লাভ নেই। স্বামীর দাসত্ব করবি না, ঠিক আছে। কিন্তু আর যা করতে যাবি কোনওটাই বেটার অলটারনেটিভ নয়। বেশি টাকা রোজগার করারও একটা একঘেয়েমি আছে। মনে হবে, দুর ছাই, এত টাকা দিয়ে কী হবে?
যাঃ, আমার তা কখনও মনে হবে না।
এ বয়সে বুঝবি না। টাকা জিনিসটাকে কিছুতেই ভালবাসা যায় না।
কেন?
টাকা হচ্ছে বায়িং পাওয়ার। কেনা-বেচার মিডিয়াম। তাই যদি হয় তাহলে শুধু বেচা-কেনার জন্যই তো টাকা। ওটার তো আর কোনও মূল্য নেই। কনভার্টিবিলিটি ছাড়া টাকার আর কোন গুণ আছে বল।
ও বাবা, ওসব শক্ত কথা বুঝতে পারি নাকি?
তোকে অত বুঝতে হবেও না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত আমার কাছে টাকা জিনিসটা অসাড় হয়ে যাচ্ছে।
তোমার অনেক টাকা আছে বলেই ওরকম মনে হয়।
মাথা নেড়ে পারুলদি বলল, না রে, তা নয়। মানুষ তো ভোগ করবে বলেই রোজগার করে। কিন্তু বুঝতে পারে না তার ভোগ করার ক্ষমতা খুব বেশি নয়। ধর আমি যদি পাঁচশোটা বেনারসি কি বমকাই কিনি, হাজার ভরি গয়না গড়াই, দশটা গাড়ি এনে গ্যারেজে ভরি বা দশটা বাড়ি তৈরি করি–কিছু লাভ হবে তাতে? ক্লান্তি লাগবে না?
ইস্, আগে হোক তো!
পারুলদি হেসে ফেলল, আচ্ছা যা, এখন ওসব বোঝার বয়স হয়নি তোর। পরে বুঝবি।
না পারুলদি, এসব বয়স হলেই বোঝা যায় না। এসব বোঝার জন্য অন্যরকম মন চাই। তুমি হলে বড়মার মতো। দেখ না, বড়মা কেমন যেন হয়ে গেছে। শাড়িগুলো বিলিয়ে দিল সবাইকে। গয়নাগুলো দিয়ে দিল। জ্যাঠামশাই চলে যাওয়ার পর থেকে বড়মা একদম পালটি খেয়ে গেছে। আমাকে তিনটে পিওর সিল্ক আর একটা আংটি দিয়েছে, জানো? হীরাকে দিয়েছে দুটো ঢাকাই, একটা বেনারসি আর ঝুমকো দুল।
