খুড়ো চললেন?
হ্যাঁ মা।
এত তাড়াতাড়ি? মায়ের সঙ্গে দেখা হল?
হ্যাঁ। এই একটু দেখে গেলুম। ঘুরে ঘুরে সবার খোঁজখবর নিই আর কী। আজ মহিমার মেজো ছেলে অমলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কত কাল পর, চিনতেই পারছিল না।
একটু ভ্রূ কোঁচকাল পারুল, কে বললেন?
সেই যে মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করেছিল মনে নেই? এখন কেষ্টবিষ্টু হয়ে উঠেছে। বড় ভাল লাগল দেখে।
পারুল ফুল তুলতে তুলতেই বলল, অমলদা এসেছে বুঝি?
হ্যাঁ।
আর কথা নেই। ধীরেনের কথা বড্ড তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। ধীরে হেঁটে সে রাস্তার দিকে যাচ্ছিল।
ধীরেনখুড়ো!
ধীরেন থমকে দাঁড়ায়, কী মা?
আপনি কি এখন দুধ জোগাড় করতে যাচ্ছেন?
ধীরেন ক্লিষ্ট একটু হেসে বলে, দেখি যদি পাই।
দিন তো, ঘটিটা আমাকে দিন।
অ্যাঁ!
পারুল ঘটিটা তার অবশ হাত থেকে নিয়ে লঘু পায়ে ভিতরবাড়িতে চলে গেল। ধীরেন একটু আশাভরসায় বুক বেঁধে দাঁড়িয়ে রইল। নিজেকে একটু কাঙাল ভিখিরির মতোই লাগছে বটে, কিন্তু সে তো তাই। সমাজের নীচের তলাতেই বাস ছিল তার। হয়তো আরও কয়েক ধাপ নেমে গেছে। কে জানে! তবে কী এসে যায় তাতে? এইসব বড় বড়, উঁচু উঁচু মানুষের দয়াধর্মের ওপরেই তো বেঁচে থাকা, ছোট ছোট ইচ্ছাপূরণ!
দেবী যেমন বর দেন তেমনই ছোট ঘটিটা দুধে ভরে নিয়ে এসে তার হাতে দিল পারুল। মুখটা কচুপাতায় ঢেকে দিয়েছে। কী বুদ্ধি মেয়েটার।
সাবধানে নিয়ে যাবেন খুড়ো।
কৃতজ্ঞতায় গলে যেতে ইচ্ছে করে ধীরেনের। চোখে জল আসতে চায়। একটু উথলানো গলায় বলে, দিলে মা! দিলে!
বেশি তো নয়। ছোট্ট ঘটি আপনার।
যথেষ্ট মা, এই যথেষ্ট।
আর খুড়ো!
হ্যাঁ মা।
অমলদার সঙ্গে যদি দেখা হয় তাহলে একবার আমাদের বাড়িতে আসতে বলবেন। বলবেন আমি বলেছি।
ধীরেন মাথা হেলিয়ে বলে, আচ্ছা মা। এখনই বলে আসব?
পারুল একটু হেসে বলল, আমি কয়েকদিন এখানে থাকব। যখন হয় বলবেন, আপনার সময়মতো।
হ্যাঁ মা।
দুধ! শেষ অবধি ঘটি ভর্তি দুধ! আনন্দে ধীরেনের বুকটা একটু তোলপাড় হল৷ এবার একটু পাঁউরুটি জোগাড় হলেই হয়। ঘটিটা দু হাতে মণিরত্নের মতো ধরে ধীরেন সাবধানে হাঁটে। হোঁচট টোচট খেলে দুধ চলকে যাবে বাবা। আর হঠাৎ যদি এখন তার পেচ্ছাপ পেয়ে বসে তাহলেও বিপদ। পাজি পেচ্ছাপটা যে কখন পেয়ে বসে তার কিছু ঠিক নেই। শালা ঠিক মিদ্দারের ভূতের মতো। যখন তখন এসে হানা দেয়। কাণ্ডজ্ঞান থাকে না তখন।
পাঁউরুটি কিনতে বাসরাস্তায় এসে ধীরেন চায়ের দোকানে বসল একটু। অনেক কিছু ভাবার আছে। এই দুধ নিয়ে বাড়ি গেলে কি তার ভোগে লাগবে? চারদিকে লোভী চোখ। ঘটিটা সাবধানে টেবিলের ওপর রেখে এক হাতে যখের মতো ধরে থাকল ধীরেন। তারপর অনেকক্ষণ ভাবল। ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক কাপ চা আর কোয়ার্টার রুটি নিল ধীরেন। চায়ে ডুবিয়ে পাঁউরুটি কিছু খারাপ নয়। চায়ের মধ্যেও তো একটু দুধ থাকে রে বাপু। চোখ বুজে মনে মনে ভেবে নিলেই হয় যে, দুধে ভিজিয়েই খাচ্ছি।
কাঙাল গরিবদের ভগবান কল্পনাশক্তিটাও খুব দেন বটে। ওইটুকু আছে বলেই তারা পান্তাকে পোলাও মনে করে খেয়ে নিতে পারে। না না, পোলাও-টোলাও গরিবেরা ভালবাসে না। তাদের জিভে পোলাও বা লুচির কোনও স্বাদ নেই। তারা ভালবাসে মিঠে ভাত, লঙ্কার ঝাল বা তেঁতুলের টক। তাই দিয়েই ভরপেট উঠে যায়।
চায়ে ভিজে গেলাসের মধ্যে পাঁউরুটিটা টইটম্বুর হয়ে উঠল। দৃশ্যটা মুগ্ধ চোখে দেখল ধীরেন। তারপর একটু একটু চুমুক দিয়ে আর দু-তিন আঙুলে চায়ে ভেজা পাঁউরুটির দলা মুখে দিয়ে খেতে লাগল সে। খুব ধীরে ধীরে। অন্য হাত দুধের ঘটির ওপর সতর্ক পাহারা দিচ্ছে।
অনেকক্ষণ সময় নিল ধীরেন। সব জিনিস রয়ে-সয়ে করতে হয়। জিভ, টাকরা কণ্ঠনালি বেয়ে পেট অবধি স্বাদের আলো ছড়িয়ে নেমে যাচ্ছে চায়ে ভেজানো পাঁউরুটি। পুরো এই ব্যাপারটা খুব মন দিয়ে উপভোগ করছে সে। প্রতিটি বিন্দু।
দুধটুকু থাক। এটুকু বাড়িতেই নিয়ে যাবে সে। দুধ-উপোসি শিশুরা আজ দুধ দেখে ভারী খুশি হবে। না, ধীরেনের বরাতে জুটবে না। তা না জুটুক। আজ তার একটু মহৎ হতে বড্ড ইচ্ছে করছে।
.
১২.
প্রস্ফুটিত কমলের মতো তোমার আশ্চর্য আনন। মনে হয় এখনই মধুকর গুনগুন করে উড়ে এসে ভুল করে ফুল ভেবে বসবে ওই আননে। এইভাবে পুরুষের স্তাবকতা শুরু হল, শেষ হল না আজও। কত ভূর্জপত্র, তালপাতার পুঁথি, কত কাগজ আর কলমের কালি খরচ হয়ে গেল, রচনা হল কত কাব্য, মহাকাব্য, নাটক, উপন্যাস। উপমায় উপমায় চাঁদ, ফুল, শ্রাবস্তীর কারুকার্য গেল ফুরিয়ে। পুরুষ দমেনি এখনও।
দেখন সুন্দরী না হলেও হয়। হয়তো মুখে জুতসই একটা তিল বা আঁচিল, ঠোঁটের একটু অভিমানী ভাঁজ, মুখের ডৌল, চোখ বা চাহনি, হয়তো বা গজদন্ত, গালের টোল কিছু একটা হলেই হল। বোকা পুরুষ তাই নিয়েই মাতল, মজল, পাগল হল। ডোবাল জাহাজ, ছারখার করে দিল দেশ, লাগাল ধুন্ধুমার যুদ্ধ। না পারলে হয়তো মদ খেয়ে হল দেবদাস বা কবি, আত্মহত্যা করে বসল, পাগল বা সাধু হয়ে গেল।
হ্যাঁ গা, শুধু রূপটুকু চাই? কুরূপার বুঝি প্রেম নেই?
ওই যে বারান্দার উত্তর কোণে এসে বসে আছে রাইকিশোরী। সামনে মুড়ির বস্তা, বেতের দাড়িপাল্লা নামিয়ে রেখে আঁচলে মুখের ঘাম মুছছে। ওর একটুও শ্রী নেই। খবুটে পুরুষালি গড়ন, দাঁত উঁচু, মুখে অনেক খানাখন্দ। কোনও পুরুষ বিরলে বসে একবারটিও ভাববে না ওর কথা। এক লাইন কবিতাও কোথাও লেখা হবে না ওর জন্য। তবু হয়তো ওরও একদিন বিয়ে হয়ে যাবে। প্রকৃতির নিয়মে ছেলেপুলে হবে, সংসার করবে। কিন্তু প্রেম হবে না।
