ওই গৌরহরিদার বাড়ি। এই গাঁয়ের টাটা-বিড়লা যা-ই বলো তা ছিল ওই গৌরহরি চাটুজ্যে।
দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বাড়িটা নিরীক্ষণ করে ধীরেন কাষ্ঠ। দুই ভাইয়ের অংশ কিনে নিয়েছিলেন হরিদা দুনো দামে। যা করার ইচ্ছে তা করবেনই। জান কবুল। ওরকম মানুষকে রোজ সকালে উঠে পেন্নাম করতে হয়। বড় বড় থাম, মজবুত খিলানের ওপর বাড়ি। তিন তিনটে দোতলা দালান, কত যে ঘর তার হিসেব নেই। হরিদা কি জানতেন না শেষ অবধি কেউ গাঁয়ের মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে না? ছেলেরা যাবে, মেয়েরা যাবে, পড়ে থাকবে বুড়োবুড়ি? জানতেন। জেনেও ভাইয়েদের অংশ কিনে নিয়েছিলেন। রাজা-জমিদারের মতো মেজাজটা ছিল খুব।
সসংকোচে বাগানের লোহার ফটক পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকল ধীরেন। ভিতর থেকে অনেক লোকের গলা পাওয়া যাচ্ছে। ছেলেরা এসেছে বোধহয়।
উঠোনের মুখে একটা ছেলের সঙ্গে দেখা। বিজু, নরহরির ছেলে। ভারী ফর্সা, সুন্দর চেহারা। কী যেন খেলে-টেলে। ফুটবল বা ক্রিকেট যাই হোক। লেখাপড়াতেও চৌখশ।
ধীরেনখুড়ো নাকি?
ধীরেন সরে সাইকেল যাওয়ার রাস্তা দিয়ে বলল, হ্যাঁ বাবা।
কিছু মনে করবেন না খুড়ো, পানুকে যে মেরেছিলাম সে এমনি নয়। পাতা খায় বলেই মেরেছি। যারা ওসব নেশা করে তাদের দোষ কী জানেন? তারা আর পাঁচজনকে জুটিয়ে নিতে চেষ্টা করে। পুরো গাঁয়ের আবহাওয়াই নষ্ট করে দেবে। একটু খেয়াল রাখবেন।
ধীরেন হাঁ করে চেয়ে থাকে। পানু তার ছোট ছেলে। সে যে বিজুর কাছে মার খেয়েছে এখবরটাই জানা নেই ধীরেনের। তবে পাতার কথাটা সে আবছা শুনেছে। খুব খারাপ নেশা নাকি, কিন্তু ধীরেনের কীই বা করার আছে! ছেলেরা এখন দূরের মাস্তুল, দরিয়ায় অনেক তফাতে চলে গেছে। পড়লে, মরলে শোক হবে বটে, কিন্তু নোঙর নেই যে!
সসংকোচে ধীরেন বলে, ঠিকই তো, ঠিকই করেছ বাবা মেরেছ।
একটু সামলে রাখবেন। নইলে ঘটিবাটি চাঁটি করে দেবে। এ নেশা যে করে তার কাণ্ডজ্ঞান থাকে না।
ধীরেন মাথা নাড়ে। বুঝেছে, আবার বোঝেওনি সে। বিড়ি-আসটা খায়, ঠিক আছে। ধেনো-টেনো খেলেও না হয় একরকম। দুনিয়া যত এগোচ্ছে নেশাও তত এগোলে বড় কঠিন পরিস্থিতি।
যান ধীরেন খুড়ো, ভিতরে যান।
ভিতরে এক আনন্দের হাট। স্বর্গের ছবি যেন। দুটো বিশাল বারান্দার সিঁড়ির বিভিন্ন ধাপে নানা বিভঙ্গে বসে আছে সুন্দর সুন্দর সব নারী ও পুরুষ। খুব হাসছে, হল্লা করে কথা বলছে।
ধীরেন হঠাৎ শিহরিত হয়ে মাথা নেড়ে আপনমনে বলে উঠল, না, না, উচিত হচ্ছে না। এখানে আমার ঢোকাটা উচিত হচ্ছে না।
সে তাড়াতাড়ি এই সুন্দর দৃশ্যটি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য পিছু হটে চলে আসছিল। একটি মেয়ে তাড়াতাড়ি উঠে এসে সামনে দাঁড়াল, এ কী খুড়ো, চলে যাচ্ছেন যে!
পারুল, বরাবরই জগদ্ধাত্রীর মতো দেখতে ছিল। এখন যেন আরও জমকালো হয়েছে।
ধীরেন ভারী অপ্রস্তুত হয়ে বলে, না মা, তেমন কোনও কাজ ছিল না। এমনিই দেখা করতে আসা। ঘুরে ঘুরে খোঁজখবর নিই আর কী।
আসুন না ভিতরে, মার সঙ্গে দেখা করবেন না?
আজ থাক।
থাকবে কেন খুড়ো? আমরা যখন থাকি না তখন তো আপনারাই যা হোক খোঁজখবর নেন। আপনাদের ভরসাতেই তো মা আছে এখানে। আসুন।
কী সহবত! তার মতো নকড়াছকড়া লোককেও কী আপ্যায়ন। গৌরদা তার ছেলেমেয়েকে কী শিক্ষাটাই দিয়ে গেছে! বুক ভরে যায়।
হাতে ওটা কী খুড়ো? ঘটি নাকি?
সসংকোচে ঘটিটা ফের আড়াল করতে করতে ধীরেন হে হে করে একটু হাসে, ও কিছুনয় মা। গাঁয়ের মানুষ তো, এক কাজে বেরিয়ে অন্য কাজও সেরে নিই। একটু দুধের খোঁজে বেরিয়েছিলুম, তাই।
পেলেন না?
সে হবে খন।
উঠোনে নিমের ছায়ায় পাতা একখানা কাঠের চেয়ারে সাদা থান পরা বউঠান বসা। গায়ের রং আগে দুধে-আলতায় ছিল, এখন শ্বেতপাথরের মতো। একটু ফিরে তাঁকে পাশচোখে দেখছেন।
ধীরেন ঠাকুরপো বুঝি! এই দেখুন আমার বাচ্চারা সব এসেছে। সবাইকে তো চিনবেনও না।
ধীরেন খুব হাসি হাসি মুখ করে কয়েক পা এগোল। বড্ড লজ্জা হচ্ছে তার। এমন সুন্দর দৃশ্য যেন মা দুর্গা আর কার্তিক গণেশ আর লক্ষ্মী সরস্বতীরা সব জড়ো হয়েছে। তার মধ্যে সে এক মহিষাসুর যেন ঢুকল এসে।
বলাকা তার দিকে চেয়ে বলে, অনেকদিন দেখিনি আপনাকে। চেহারাটা খারাপ হয়ে গেছে কেন?
ধীরেন বড় বেকায়দায় পড়েছে, জোড়া জোড়া চোখ তার দিকে।
অসুখ-বিসুখ করেনি তো ঠাকুরপো?
না বউঠান, বুড়ো হচ্ছি তো!
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তা তো সবাই হচ্ছি।
আজ যাই বউঠান, আপনারা গল্প-টল্প করুন। অসময়ে এসে পড়েছি।
কোনও কথা ছিল নাকি?
না না, এই খবরটবর নিতেই আসা। আসি তাহলে?
আসবেন মাঝে মাঝে।
ঘাড় কাত করে সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে আসছিল ধীরেন। শুনতে পেল, পেছনে একটা মেয়ে বলে উঠল, জানো, জ্যাঠামশাইয়ের কাজের দিন ধীরেন জ্যাঠা আমার ঘরের পাশে সাপ দেখে কাপড়ে পেচ্ছাপ করে ফেলেছিল!
একটু হাসির ঢেউ উঠল। বড় যন্ত্রণা হয় ধীরেনের। যা ঘটে তার কোনওটাই সে আর আটকাতে পারে না। ছেলে পাতা খায়, অন্য ছেলে সাট্টা খেলে, সে আটকাতে পারে না। এই যে পেচ্ছাপ বেরিয়ে পড়ে তাও কি পারে আটকাতে? এবারে চলে যাওয়ারই সময় হল বুঝি! তবে বানের জলে মিদ্দারকে ডুবিয়ে মেরেছিল তার পাপই কি অর্শাচ্ছে?
একটা শিউলি গাছের কাছে পারুল। ডিং মেরে পাতায় পাতায় আটকে থাকা ঝরা শিউলি তুলছে।
