.
চারদিকে জল, জল আর জল। ডাঙাজমির দেখাই নেই। তার ভিতর দিয়ে জল ভেঙে ছুটতে ছুটতে হাঁফ ধরে যাচ্ছিল ধীরেনের। কতবার যে খানা ডোবায় পড়ল, কতবার পা হড়কাল তার হিসেব নেই। কতটা সময় লেগেছিল তাও ভেবে পায়নি কখনও ধীরেন। যখন ডাঙাজমিতে উঠল এসে তখন তার সর্বাঙ্গ জলে কাদায় মাখামাখি। চোখ উদভ্রান্ত, মনে বিভীষিকা, পাপবোধ, পাগলের মতো অবস্থা।
যখন বাড়ি ফিরল তখন সে প্রায় উন্মাদ। আপনমনে বিড় বিড় করছে, কখনও চিৎকার করে কেঁদে উঠছে, কখনও নিজের চুল ছিঁড়ছে দু হাতে মুঠো করে। ওর মধ্যেই তার বাবা ঠ্যাঙা নিয়ে মারতে এসেছিল তাকে। মা এসে ঠেকাল, দেখছ না কী অবস্থা! নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। আগে ঠান্ডা হতে দাও।
মা-ই তার গলায় তারের ফাঁসটা আবিষ্কার করেছিল। বলল, এটা তোর গলায় কী রে? কে তোকে তুক করেছে? অ্যাঁ!
কিছু বলতে পারেনি ধীরেন। দিন দুই লেগেছিল সেই বিকারের ঘোর কাটতে। তারপর পুলিশের ভয়ে সে কালনায় তার মাসির বাড়িতে পালিয়ে গেল। মাসখানেক বাদে যখন ফিরল তখনও পুলিশ তাকে খোঁজেনি। খোঁজার কথাও নয়। বৃষ্টি বাদলা কেটে গিয়ে জোড়া লাশ যখন পাওয়া গিয়েছিল তখন দিন পাঁচেক কেটে গেছে। মড়া পচে ঢোল। পুলিশ একটা তদন্ত করেছিল বটে, কিন্তু তখন গ্রামদেশে এসব নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামানোর রেওয়াজ ছিল না। যেটা রটেছিল তা হল, বরুণ মিদ্দার তার বউকে মেরে ডোবায় ফেলতে গিয়ে নিজেও ডুবে মরেছে।
ধীরেন খুনের দায় থেকে বেঁচে গেল। ধীরে ধীরে স্মৃতি আবছা হল, সময়ের পলিমাটি পড়তে লাগল, কিন্তু আচমকা কখনও-সখনও মনে পড়ত দৃশ্যটা। শিউরে উঠত।
ইদানীং ধীরে ধীরে স্মৃতিটা ফের কেন যেন জ্বলজ্বলে হয়ে ওঠে। আর তাকে একা পেলেই কেন যে বরুণ মিদ্দার কাছেপিঠে চলে আসতে চায়! সে আজকাল অন্ধকার ভয় পায়, একা ঘরে ভয় পায়, নিরিবিলি মাঠ পেরোতে ভয় পায়। বাতাসে যেন একটা ফিসফাস শুনতে পায় সে। বরুণ মিদ্দারের গলা বলেই কেন যেন মনে হয় তার।
ইদানীং জ্ঞানগম্যিওলা মানুষদের কাছেপিঠে গিয়ে বসার একটু ঝোঁক হয়েছে ধীরেনের। যারা অনেক জানে-টানে তাদের কাছে গেলে অনেক ধাঁধা কেটে যায়।
এ-অঞ্চলে অবশ্য জ্ঞানী লোক বেশি নেই। গৌরহরিদা ছিলেন, মহিম রায় এখনও আছে।
তা হরিদার কাছে ব্যাপারটা একবার বলে ফেলেছিল সে। বেশি বলতে চায়নি, শুধু একটা পাপ কথা বলে ভণিতা করেছিল মাত্র। কিন্তু গৌরহরি দুঁদে উকিল। জেরা করে করে সবই পেট থেকে বের করে নিল। তারপর বলল, তা কি প্রাশ্চিত্তির করতে চাস নাকি?
এর কী আশ্চিত্তির আছে হরিদা?
কিছু নেই রে, কিছু নেই। বরাতজোরে খুনের দায় থেকে বেঁচে গেছিস, এসব কথা পাঁচকান না করাই ভাল।
কাউকে বলিনি, নিজের বউকে অবধি নয়।
বউকে আরও বলবি না। মেয়েমানুষের পেটে কথা থাকে না।
বলি না। কিন্তু আজকাল বড় মনে পড়ে যায়। ওই আদিগন্ত জল, ওই সাংঘাতিক বর্ষা, বরুণ মিদ্দার, বাতাসী সব যেন মাঝে মাঝে এসে ঘিরে ফেলে। বিশেষ করে মিদ্দার।
কেন যে অমলের মুখোমুখি বসে কথাটা আজ মনে পড়ল কে জানে। মাঝে মাঝে বড় মনস্তাপ হয়। জীবনটা ভণ্ডুল হয়ে গেছে বলে মনে হয় যেন। পাপটা কি সইবে তার?
বসুন কাকা, বাবাকে ডেকে দিচ্ছি।
ঘটিটা মোড়ার পাশে নামিয়ে রাখল ধীরেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হঠাৎ হঠাৎ মিদ্দার আজকাল মনের মধ্যে হানা দেয়। হানা দেয় বাতাসীও।
সন্ধ্যা বলল, ঘটিতে কী নিয়ে যাচ্ছেন ধীরেনকাকা?
কিছু নয় মা। বাঙালের বাড়িতে একটু দুধের খোঁজে গিয়েছিলাম। তা পাওয়া গেল না।
ওঃ দুধের যা টানাটানি চলছে আমাদেরও! মেজদারা সব এসেছে তো! দুটো মোটে গোরু। বাবার বরাদ্দই কমিয়ে দিতে হয়েছে।
ধীরেন চেয়ে চেয়ে দেখছিল।
উরেব্বাস, কত রকমের আচার করেছিস রে সন্ধ্যা! অ্যাঁ!
হ্যাঁ কাকা, মাথা থেকে সব বের করতে হয়।
তাই বুঝি? আমাদের তো ভাতপাতে একটু তেঁতুল হলেই হয়।
সে দিন আর নেই কাকা। এখন লোকে সব কিছুরই আচার চায়। শুনেছি নাকি বিলেত-টিলেতে মাংসেরও আচার হয়।
বাপ রে! বটে!
হ্যাঁ। এই যে দেখুন না, কেউ কখনও গাজরের আচার খায় শুনেছেন? এক খদ্দের চেয়েছে বলে তাও করে দিচ্ছি।
অমল উঠে গেছে। আরামকেদারার ওপর বইটা পড়ে আছে উপুড় হয়ে। ডানামেলা পাখির মতো দু মলাট দুদিকে ছড়ানো। বইটার নাম একটু ঝুঁকে দেখল ধীরেন। ইংরিজি পড়ার অভ্যাস নেই। সেই কবে একটু শিখেছিল। শুধু নামের শেষটুকু পড়তে পারল, গ্লোরি।
সন্ধ্যা বলল, খাবেন একটু আচার? দেব প্লেটে করে?
ধীরেন হাসল। বলল, দে একটু। চেখে দেখি।
একটা প্লেটে দুরকম আচার নিয়ে এল সন্ধ্যা, দেখুন তো খেয়ে কেমন টেস্ট হয়েছে।
ভাল বলার জন্য মুখিয়েই আছে ধীরেন। খেতে খেতে মাথা নাড়া দিতে দিতে বলল, বাঃ বাঃ, এ তো ফার্স্ট ক্লাস জিনিস দেখছি।
সন্ধ্যার মুখে যে হাসিটা ফুটল তা অহংকারের।
ভাল?
খুব ভাল রে মা। তাই তোর জিনিস এত চলে।
চলে তো কাকা। কিন্তু টাকা থাকলে ব্যবসাটা আরও বড় করতে পারতাম। একটা কারখানাই করে ফেলতাম।
দুধটা এখানেও হল না। আচার খেয়ে ধীরেন উঠে পড়ল। মহিমা এল না। দরকারও নেই। খানিক গল্প করা যেত।
উঠলেন কাকা?
উঠি।
বাবা বোধহয় বাগানে ঢুকেছে। ডাকব?
না মা। আবার আসবখন।
টুক টুক করে ধীরেন হাটে। আচারগন্ধী একটা সুবাসিত ঢেঁকুর উঠল। বেশ ভালই লাগল ঢেঁকুরটা তুলে। ঢেঁকুরও যে একটা উপভোগ্য জিনিস সেটাও কি সবাই বোঝে? যদি জিজ্ঞেস করে কাউকে, ওহে, ঢেঁকুর তুলে যদি মাংসের বা পায়েসের গন্ধ পাও তা হলে কেমন লাগে? তা হলে হয়তো চটেই উঠবে লোকটা। ধীরেন কাউকে জিজ্ঞেস করে না বটে, কিন্তু কথাগুলো মনে মনে খুব ভুড়ভুড়ি কাটে।
