যখন ইস্কুলে যেতুম তখন রোজ পিছু নিত আমার। ভারী অসভ্য ছেলে।
ধীরেন ছেলের অপরাধে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ওই সবই তো করত। মায়ের আসকারায় শাসনও করা যায়নি কি না।
একলা দোতলায় কথা চালাচালির অসুবিধে। চেঁচিয়ে তো আর দুধের কথাটা বলা যায় না।
বাসন্তী বলল, একটু বসুন খুড়ো, আসছি।
তা বসে ধীরেন। ওদের কাজের মেয়েটা পুকুর থেকে কাচা কাপড়-চোপড় এনে উঠোনের তারে মেলছে। দৃশ্যটা খুব মন দিয়ে দেখে ধীরেন। কমলা সবুজ নীল রঙের নানা শাড়িতে উঠোনটা যেন ভারী রঙিন হয়ে গেল। বাতাসে দুলে দুলে যেন হাসছে শাড়িগুলো। যেন বলছে, দেখেছো, কেমন চান করে ফর্সা হয়ে এলুম!
দুনিয়ায় দেখার জিনিসের কোনও শেষ নেই। এইটুকু এক রত্তি একটু গাঁয়ের চৌহদ্দির মধ্যেই ঘোরাফেরা তার। কিন্তু এইটুকুর মধ্যেই যেন অফুরান সব দৃশ্য, কুলিয়ে ওঠা যায় না।
জ্যাঠামশাই, মা জিজ্ঞেস করল চা খাবেন?
এক গাল হাসল ধীরেন, দিবি? তোদের কষ্ট হবে না তো!
না না।
তবে দে একটু। চিনি আর দুধটা একটু যেন বেশি দেয় দেখিস।
আচ্ছা জ্যাঠা।
হ্যাঁ রে মরণ, বলি দুধে ভিজিয়ে পাঁউরুটি খেয়েছিস কখনও?
মরণ মুখটা বিকৃত করে বলে, এঃ বাবা! দুধে পাঁউরুটি! ওয়াক।
পাষণ্ড আর কাকে বলে। এ ছেলে দুধ-পাঁউরুটির মর্মই বোঝে না। ধীরেন তটস্থ হয়ে বলে, তা বাবা, খাসনি বুঝি কখনও?
নাঃ। ও তো পিটুলিগোলার মতো খেতে!
দুর! তুই জানিস না। একটু দানা চিনি ছড়িয়ে খেতে
বাসি নেমে এল নীচে। বেশ চেহারাটা হয়েছে এখন। সেই রুখু শরীরে এখন একটু তেল চুকচুকে ভাব। ফর্সা একটা মেজেন্টা রঙের শাড়ি পরা, কপালে মস্ত সিঁদুরের টিপ, সিঁথি ভর্তি সিঁদুর থেকে খানিক নাকের ডগায় ঝরে পড়েছে। স্বামী-সোহাগের লক্ষণ। না, বেশ আছে মেয়েটা। সময়মতো বাঙালের চোখে পড়ে গেল, তাই বেঁচে গেছে। চোখে পড়াটাই হল আসল কথা। ওই হল ভাগ্য, ওই হল গ্রহানুকূল্য। ভাল চোখ যদি পড়ে তবে তরে গেলে। আর মন্দ চোখ যদি পড়ে তবে হেঁচড়ে হেঁচড়ে জীবন যাবে।
কিছু বলবেন খুড়ো?
হ্যাঁ মা, তা তোদের গোরুগুলো দুধ-টুধ কেমন দেয়?
আর বলবেন না। কালো গাইটা দুধ বন্ধ করেছে সেই কবে। দুটো দিচ্ছে এখনও, তবে কমে এসেছে। আমার বড় ছেলে এসেছে কলকাতা থেকে, তাকে কোথায় একটু পিঠে পায়েস করে খাওয়াবো, তাই হচ্ছে না ভাল করে। মাসিক বন্দোবস্তের গাহেকও তো আছে।
ঘটিটা জামার তলা থেকে আর বের করল না ধীরেন। না, হবে না।
কাজের মেয়েটা কাপে চা নিয়ে এল, প্লেটে দুটো থিন এরারুট বিস্কুট। চলকানো চায়ে বিস্কুট দুটো নেতিয়ে গেছে। তা যাক। এটুকুই বা মন্দ কী?
খুব যত্ন করে চাটুকু খেল ধীরেন। চায়ে ভেজানো বিস্কুটেরও একটা স্বাদ আছে।
উঠছেন খুড়ো? আবার আসবেন।
আসব বইকী! এই ঘুরে ঘুরেই সময় কাটাই। যোগাযযাগটাও রাখা হয়, সময়ও কাটে।
মরণ পোশাক পরে ইস্কুলে বেরোচ্ছে। তার পিছু পিছুই বেরিয়ে পড়ল ধীরেন। ফাঁকা ঘটিটা জামার নীচে ধরা আছে এখনও। ছোট ঘটি, বাইরে থেকে টের পাওয়া যায় না।
বেগুনক্ষেতটা পার হওয়ার সময় ধীরেন দাঁড়াল। গাছে ফুল এসে গেছে। দু-একটা গাছে কচি বেগুনের শিশুর মতো নিষ্পাপ মুখ উঁকি মারছে। কী সুন্দর দেখতে! শীতের বেগুন, তার স্বাদই আলাদা। বেগুন বড্ড তেল টানে বলে তার মা চাকা-বেগুনে আগে একটু চিনি মাখিয়ে রাখত। তাতে নাকি তেল কম লাগে। তা হবে হয়তো। আজকাল আর বেগুন ভাজা হয় না। মাঝে মধ্যে একটু পোড়া টোড়া হয় বড় জোর।
খুব ধীর পায়েই এগোয় ধীরেন। সকালটা এখনও আছে। শীত শীত ভাবটাও ক্রমে বাড়ছে বাতাসে। নাকি বয়স হচ্ছে বলেই শীতভাব হয় তার?
রায়বাড়ির উঠোনে ইজিচেয়ারে মহিমাই বসে বোধহয়। ঠিক ঠাহর হয় না। সজনের ছায়ায় ঝিরঝিরে বাতাসে এই অলস বসে থাকাটা ভালই লাগে ধীরেন কার।
উঠোনে চাটাই বিছিয়ে নানা জিনিস রোদে দিচ্ছে সন্ধ্যা। আমলকী, আমসি, সারি সারি আচার আর কাসুন্দির বোতল।
একটু কাছে গিয়ে ভুল বুঝতে পারে ধীরেন। মহিমদা নয়, বসে আছে অমল।
ভারী খুশি হয়ে ওঠে ধীরেন।
উরে বাপ রে! অমল নাকি?
অমল মানে হচ্ছে এক চোখ-ধাঁধানো ছেলে, গ্রামের গৌরব। বিলেত আমেরিকা ঘুরে এসেছে। এক এক মাসে যা বেতন পায় তা দিয়ে হাতি কিনে ফেলা যায়। গরিবগুর্বোর সম্বৎসরের খরচ।
অমল একটা বই পড়ছিল। ইংরিজি বই-ই হবে। তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভারী আনমনা চোখে চেয়ে রইল। চিনতে পারল না। তারপর সোজা হয়ে বসল। একটু হেসে বলল, ধীরেনকাকা না?
হ্যাঁ বাবা।
ইস, একদম বুড়ো হয়ে গেছেন যে! চিনতেই পারিনি।
অমল তাকে চিনতে পারায় ভারী আপ্যায়িত হয়ে ধীরেন বলে, তা বয়সও হল। আমাদের তো আর কিছু হয় না, শুধু বয়সটাই হয়।
বসুন কাকা। বাবাকে ডেকে দিচ্ছি। ঘরেই আছে।
তোমার সঙ্গে কতকাল পরে দেখা! দেশের গৌরব তুমি।
অমল কথাটা শুনে খুব খুশির ভাব দেখাল না। মুখটা শুকনো। ধীরেনের চোখ যদি খুব ভুল না হয়, তা হলে মুখে একটু দুঃখের ছাপও যেন আছে। হওয়ার কথা নয় এরকম। লম্বা বেতন, হোমরা-চোমরা চাকরি, পেটে গিজগিজ করছে বিদ্যে, এরকম মানুষের মুখে তো আহ্লাদ ফেটে পড়ার কথা!
আপনি কেমন আছেন ধীরেনকাকা?
এই আছি বাবা। টিকে আছি।
ছেলেরা সব দাঁড়িয়েছে তো?
এই একরকম। টুকটাক করে আর কী। তোমার তো ভালই চলছে বাবা! আমাদের কথা বাদ দাও। পাপীতাপী লোক আমরা।
