কিন্তু ধীরেনের এখন এই বয়সে নানান ইচ্ছে চাগাড় দিয়ে ওঠে। গত তিন রাত্তির সে স্বপ্ন দেখেছে। দুধ-পাঁউরুটি খাচ্ছে। ঘুমের মধ্যেই জিভে আর টাগরায় এমন টকাস টকাস শব্দ করেছিল যে তার বউ বিরক্ত হয়ে তাকে নাড়া দিয়ে তুলে দেয়। শেষ রাতের স্বপ্ন বলে কথা। পাঁউরুটির জোগাড় হয়, কিন্তু দুধটাই কঠিন। জোগাড় হলেই যে মুখে তুলতে পারবে তাও তত সহজ নয়। তিনটে দুধ-উপোসি শিশু মুখের দিকে চেয়ে থাকবে না কি? আর তার বউ কি বলবে না, কোন আক্কেলে বুড়ো মানুষ তুমি এতগুলো চোখের সামনে দুধ নিয়ে বসতে পারলে? গলা দিয়ে নামবে? পাষণ্ড আছ বাপু!
কিন্তু তিন দিন স্বপ্ন দেখার পর ধীরেনকে এখন দুধ-পাঁউরুটি নিশিতে পাওয়ার মত পেয়েছে। যখন নিশিতে পায় তখন আর কাণ্ডজ্ঞান বলে কিছু থাকে না। নাতি-পুতি বউ-বাচ্চা তখন বিস্মরণ হয়ে যায়।
জামার আড়ালে পিতলের ঘটিটি নিয়ে সকালবেলাতেই বেরিয়ে পড়ল ধীরেন। মুখ বারবার রসস্থ হয়ে পড়ছে। সামনের গোটা চারেক দাঁত নেই বলে মাঝে মাঝে সুট করে মুখের ঝোল টেনে নিতে হয়। বয়স হলে নানা অসুবিধে।
বাঙালের বাড়িই ভরসা। তিনটে দুধেল গাই কামধেনুর মতো অনবরত দুধ দিয়ে যাচ্ছে। দুধের সমুদুর একেবারে। তবে মুশকিল হল বাসি নগদ ছাড়া দুধ দেয় না বড় একটা। এমনিতে নরম-সরম মেয়েই ছিল। ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছে। ফ্রক পরে গোবর কুড়িয়ে বেড়াত, কাঠকুটো জোগাড় করত, পুকুরে ডাঁই কাপড় কাঁচত খার দিয়ে, আবার কদমতলায় এক্কাদোক্কাও খেলত। কথা কইলে কাঁচুমাচু হয়ে যেত। কিন্তু সেই দিন তো আর নেই।
বাঙালের বউ হয়ে ইস্তক বাসি ধিঙ্গির মা সিঙ্গি হয়েছে। জমিজমা, মুনিশ, ঝি-চাকর, গোরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে ফলাও সংসার। চারদিকে যেন মা লক্ষ্মী ঢেউ তুলে দিয়েছেন। রোগা, শ্যামলা মেয়েটাকে আর চেনার জো নেই। গায়ে গত্তি লেগেছে, মেজাজও হয়েছে একটু।
বাবা বাছা বলে যদি একটু আদায় হয় সেই ভরসাতেই বেরিয়েছে ধীরেন। তবে সে বুঝতে পারে, আজকাল মায়া-দয়া জিনিসটা বড্ড কম পড়ে যাচ্ছে চারধারে। কোথাও যেন আর জিনিসটা তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। আগে এ-গাঁয়েই দুধের গাহেক খুঁজলে পাওয়া যেত না। বাড়তি দুধ চাইলে ফেরাত না কেউ।
রসিক বাঙালের বাড়িতে ঢুকবার আগে একটু দাঁড়াল ধীরেন। আহা, কী বাড়িই করেছে বাঙাল। ডানধারে বিশাল প্রাসাদের মতো দোতলা দালান। দক্ষিণে উঠোনের দিকে টানা লম্বা বারান্দা। এক এক তলায় পাঁচ ছয়খানা করে ঘর। তাও এখনও দালানের গায়ে পলেস্তারা পড়েনি। পড়লে আরও দেখনসই হবে। পুবে একখানা একতলা দালান, তাতেও তিন চারখানা ঘর আছে। পাকা গোয়ালঘর, গোলাঘর, ঢেঁকিশাল, কী নেই বাঙালের। দু আড়াই বিঘে জুড়ে ফলাও বাগান। মেলা সুপুরি আর নারকোলের গাছ। সবজিও ফলছে দোহাত্তা।
ধীরেন মেটে পথটায় তাকিয়ে লক্ষ্মীর পদচিহ্ন দেখতে পায় যেন। লক্ষ্মী ঢুকেছেন, সহজে বেরোবেন না।
এই সব দেখার মধ্যে আনন্দ আছে। অনেকে বাঙালকে হিংসে করে বটে, কিন্তু ধীরেনের হিংসে হয় না। কারও বোলবোলাও হয়েছে জানলে ধীরেন তাকে দেখতে যায়। বাড়ি দেখে, ঘর দেখে, মানুষটার মুখে আহ্লাদ আর খুশির আভা দেখে। তখন তার মনটা খুব হে-হে করতে থাকে। ভারী একটা সুড়সুড়ে সুখ হতে থাকে তারও। কেন হয় কে জানে।
ধীরেন দেখতে বড় ভালবাসে। চোখে ছানি পড়ায় দৃষ্টি একটু ঝাপসা বটে, কিন্তু তাই দিয়েই সে অনেক কিছু দেখে। ছানি কাটাবে বলে বর্ধমানের লায়নস ক্লাবে একটা দরখাস্তও দিয়ে এসেছে সে। পঞ্চায়েতের সার্টিফিকেটও জুড়ে দিয়েছে তাতে। এখনও জবাব আসেনি। নির্যস গরিব বলে প্রমাণ হলে বিনা পয়সায় ছানি কাটিয়ে দেবে। দেখার নেশা আছে বলেই ছানিটা কাটানো বড় দরকার।
ফটকের বাইরে মুগ্ধ চোখে ৰাড়িটার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়েছিল ধীরেন।
জ্যাঠামশাই, কাকে খুঁজছেন?
ধীরেন তাকিয়ে মরণকে দেখে এক গাল হাসল, এই দেখছি তোদর বাড়িটা। তা তোদের কী খবর টবর রে? বাঙাল আসে-টাসে?
হ্যাঁ। পরশু এসেছিল, আজ সকালে চলে গেছে।
ধীরেন আগল ঠেলে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে, বাসি নেই?
আছে। ডেকে দেব?
তাড়া নেই। কাজ-টাজ করছে হয়তো। বসি একটু দাওয়ায়।
বসুন না। বারান্দায় উঠে চেয়ারে বসুন।
ধুতির খুঁটে দাওয়ার মেঝেটা একটু ঝেড়ে বসে পড়ল ধীরেন। বলল, এই ভাল।
সকালের মিঠে রোদ নিকোনো উঠোনে রুপোর থালা হয়ে পড়ে আছে। বাঃ বাঃ। যার ভাল তার সবই ভাল। এ বাড়ির রোদটাও যেন ধীরেনের বাড়ির রোদের চেয়ে অনেক বেশি সরেস, অনেক বেশি জমকালো। এরকমই সব হয়, লোকে বিশ্বাস করে না বটে, কিন্তু হয়।
দোতলা থেকে বাসি রেলিং-এ ঝুঁকে বলল, ও ধীরেনখুড়ো, কিছু বলবেন?
এই মা, তেমন কিছু নয়। তত্ত্বতালাশ করতেই আসা। তা খবর-টবর সব ভাল তো!
আছি খুড়ো একরকম। ঝামেলা ঝঞ্জাট তো কম নয়।
তা তো হবেই রে বাসি। কত বড় বিষয় সম্পত্তি, কত লোকলস্কর খাটছে, কত দিক সামাল দেওয়া। হওয়ারই কথা কি না।
বেরিয়েছেন কোথা?
এই ঘুরে-টুরে দেখছি। ঘরে আর কাজটা কী বল!
তা তো বটেই। বড় ছেলে কী করছে এখন?
কে জানে মা। সাট্টার পেনসিলার না কী যেন শুনি। বর্ধমানে যায় রোজ।
সে কি ভাল কাজ খুড়ো?
কে জানে মা? ভাল কাজ করার মতো বিদ্যে কি আছে?
