সুমন একটু হেসে বলল, তার চেয়ে চলো জায়গাটা একটু ঘুরে দেখে আসি।
কোথায় যাবেন?
বিশেষ কোথাও নয়। এমনিই একটু ঘুরে দেখব।
সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে মরণ বলে, চলুন।
যখন নীচে নামল তারা তখনও মায়ের সঙ্গে বাবার খাওয়া নিয়ে কথা হচ্ছে। বাবা মাকে কইমাছ রান্নার একটা পদ্ধতি শেখাচ্ছিল।
মা বলল, ও মা, দাদাকে নিয়ে এই দুপুরে কোথায় চললি? ওর স্নান-খাওয়া নেই?
মরণ জবাব দেওয়ার আগে সুমনই বলল, একটু ঘুরে আসি।
বাবা বলল, যাউকগা, ঘুইরা-টুইরা আসুক। গ্রামের হাওয়া বাতাস লাগাইয়া আসুক একটু শরীরে। কইলকাতায় তো অন্ধকূপে থাকে।
বাইরে বেরিয়ে দাদার পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে মরণের ইচ্ছে হচ্ছিল সবাইকে ডেকে ডেকে বলে, দেখ, দেখ, এই আমার দাদা, স্টার পাওয়া দাদা, কেমন সুন্দর চেহারা দেখেছ? আছে তোমাদের এমন দাদা?
সুমন বেশি কথা বলছিল না। চারদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল শুধু।
ঘোষবাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উঠোনে টিনের পাতের ওপর বড়ি দিতে দিতে জ্যাঠাইমা চেঁচিয়ে উঠল, ও মরণ, আমার সুপুরিগুলো পেড়ে দিয়ে গেলি না বাবা! কবে থেকে খোশামোদ করছি।
আজ নয় জ্যাঠাইমা। পরে পেড়ে দিয়ে যাব। আজ কলকাতা থেকে আমার দাদা এসেছে।
কথাটা বেশ অহংকারের সঙ্গেই বলেছিল মরণ, কিন্তু তার জবাবটা এল বিছুটির মতো।
ঘোষ জ্যাঠাইমা কপালে হাত দিয়ে নিরীক্ষণ করে বলল, অ বাঙালের আগের পক্ষ বুঝি?
লজ্জায় কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল মরণের। ওভাবে বলতে আছে? গাঁয়ের লোকগুলোর মুখের কোনও আগল নেই। দাদা শুনে কী ভাবল? ছিঃ ছিঃ। আর কখনও জ্যাঠাইমার সুপুরি যদি পেড়ে দেয় তো তার নাম মরণই নয়।
সুমনের মুখে অবশ্য খুব একটা ভাবান্তর দেখতে পেল না মরণ। মাথা নিচু করে হাঁটতে হাঁটতে বলল, তুমি গাছে উঠতে পার বুঝি?
হ্যাঁ।
নারকেল গাছে উঠতে পার?
হ্যাঁ। খুব সোজা।
তোমার তো খুব সাহস দেখছি। যদি পড়ে যাও?
প্রথম প্রথম ভয় করত। এখন বেশ ভাল পারি।
আর কী পার?
আর? বলে একটু ভাবল মরণ। তারপর মাথা নেড়ে বলল, আর কিছু পারি না।
খেলতে পার? ফুটবল ক্রিকেট?
তা পারি। আর হ্যাঁ, আমি খুব জোরে দৌড়োতে পারি।
কত জোরে?
তা তো কখনও মাপিনি, এখানে তো স্টপ ওয়াচ নেই। তবে প্রতি বছর স্পোর্টসে আমি তিনটে দৌড়ে ফাস্ট হই।
লেখাপড়াতে?
না। টেনে-মেনে পাস করে যাই।
লেখাপড়া ভাল লাগে না তোমার?
না।
সুমন একটু হাসল, আর কিছু বলল না।
হাওয়াই চটি কিনে যখন তারা ফিরল তখন অনেক বেলা হয়েছে।
মা বলল, ও মরণ, তুই আলাদা বসে রান্নাঘরে খেয়ে নেগে যা। ওদের বাপ ব্যাটাকে দোতলার ডাইনিং হল-এ দিচ্ছি।
আচ্ছা মা।
কিন্তু খাওয়ার সময় সুমন বাসন্তীকে বলল, মরণ কোথায়?
ও রান্নাঘরে বসে খাবেখন বাবা। তোমাদের জন্য এই ব্যবস্থা।
না, ওকে ডাকুন, ও আমার পাশে বসে খাবে।
বাসন্তী হেসে বলল, আচ্ছা ডাকছি।
মরণ লজ্জায় মরে গিয়ে ওপরে এল। আসলে বাবার সঙ্গে বসে সে কখনও খায় না। তাই আজ ভারী লজ্জা করছে, এক সঙ্গে দাদা আর বাবার সঙ্গে বসে খাওয়া! আজ তার পেটই ভরবে না।
সুমন বাপকে তেমন ভয় পায় না। অন্তত মরণের মতো তো নয়ই। খেতে বসে কত কথা কইতে লাগল তার সঙ্গে।
দুপুরে মা যখন রান্নাঘরে খেতে বসেছে তখন মরণ গিয়েছিল লেবুপাতা দিতে। মা ছলো ছলো চোখে বলল, দেখলি, এখনও পর্যন্ত একবারও মা বলে ডাকল না আমাকে ছেলেটা!
মরণ বলে, তাতে কী মা! আমি তো মা বলে ডাকি।
মা আঁচলে চোখ মুছে বলল, আমি শত্রুর বই তো নয়। ডাকবে কেন?
বড় কষ্ট হল মরণের।
দুপুর যখন ঘন হল, বেলা গড়িয়ে গেল তখন মরণ চুপি চুপি কদমগাছটার তলায় এসে দাঁড়াল। এইখানে শিবঠাকুর আসেন। চোখ বুজে মরণ তার তিন নম্বর বরটা চেয়ে ফেলল, ঠাকুর, দাদা যেন মাকে একবার মা বলে ডাকে।
১১-১৫. পাউরুটি জিনিসটা
১১.
পাউরুটি জিনিসটা হল অনেকটা ব্লটিং পেপারের মতো। যাতেই ভোবাও সুট করে রসটা টেনে নিয়ে একেবারে ভোঁট হয়ে যায়। চায়ে ডোবালে পাঁউরুটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে অন্ধিসন্ধিতে ঢুকে যায় চায়ের রস। কী ভালই যে লাগে তখন খেতে। চায়ে টুসটুসে পাঁউরুটি যে না খেয়েছে তার জন্মই বৃথা। রসগোল্লার রসে ডুবিয়ে খাও, যেন অমৃত। পাঁউরুটি নিজেই যেন তখন ছ্যাদোনো রসগোল্লা। রসে-পাঁউরুটিতে সে যেন দাঙ্গা-হাঙ্গামা। এ বলে আমাকে দ্যাখ, ও বলে আমাকে। আর দুধে যদি ডোবাও, তা হলে তো কথাই নেই। গরম দুধে পাঁউরুটি ছেড়ে একটুক্ষণ বসে থাকো। দুধে-পাঁউরুটিতে ভাব-ভালবাসা হওয়ার জন্য একটু সময় দিতে হয়। তারপর দেখবে দুটিতে মিলেজুলে থকথকে মতো হয়ে গেছে। তখন চামচে করে মুখে দাও। পায়েস কে পায়েস, রসমালাই কে রসমালাই, কিংবা রাবড়ি কে রাবড়ি। চোখটি বুজে যা ভেবে মুখে দাও না কেন তেমনটিই মনে হবে। জিভ থেকে পেট অবধি সোয়াদ ছড়াতে ছড়াতে যাবে।
এ-বাড়িতে দুধের রোজ নেই। গত বছর গাইটা বিক্রি করে দিতে হল বড় বউমার প্রসবের সময়। বড় ছেলে নয়ন সাট্টায় অনেক নাকি টাকা লাগিয়েছিল, পথে বসেছে। খুব দুর্ভোগ গেছে তখন। গাই গোরু, এক বিঘে জমি, খোরাকির ধানও গেল কিছু। সেই থেকে দুধের জোগাড় নেই। তিনটে দুধের শিশু আছে বটে, শটিফুডের সঙ্গে একটু গুঁড়ো দুধ মিশিয়ে তাদের খাওয়ানো হয়। শটিফুডই বাঁচিয়ে রেখেছে। বেঁচে থাক শটিফুড। আর বাচ্চারা দুনিয়ার অনিয়ম অবিচার তেমন বোঝেও না বলে রক্ষে।
