বাড়িতে এসে সে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, দুটো বউ থাকা কি খারাপ মা?
মা বলেছিল, খারাপ কেন বাবা? যার সাধ্য আছে সে দুটো-তিনটে বিয়ে করতেই পারে। আগে তো আরও কত বিয়ে করত লোকে।
তবে যে ওরা বলে!
বলে বলুক। ওদিকে কান দিও না, বাবার ওপর যেন অশ্রদ্ধা না আসে। তোমার বাবা ভাল লোক।
সে তো জানি। কিন্তু লোকে বলে যে, আইন নেই নাকি!
আইন কি মানুষের জীবনের সঙ্গে সবসময়ে মেলে? দরকার পড়লে মানুষকে কত বে-আইনি কাজ করতে হয়। আমি না থাকলে তোমার বাবার এত বিষয়সম্পত্তি কে যক্ষীর মতো আগলাত বলো তো! লোকের কথায় কান দিও না, বড় হলে নিজেই বুঝতে পারবে সব কিছু।
বাবার দুই বিয়ের কথা আজকাল খুব ভাবে মরণ। মনে হয় তার বাবার দুটো ভাগ। একটা শহরে লোক আর একটা গেঁয়ো লোক। ওই বড়মা, দাদা, দিদি ওরা একটু ওপরতলার লোক। সে তার মা, বোন এরা সব একটু নিচুতলার লোক। তাই তার বুক কাঁপছে, তেষ্টা পাচ্ছে।
উঁচু মাথার লোকটাকে শেফালি ঝোপের ওপর দিয়ে এক ঝলক দেখা গেল।
মরণ চাপা গলায় বলল, ওই আসছে!
সঙ্গে ছেলে আছে ঠিক দেখেছিলি তো!
সেরকমই তো মনে হল।
আগে জানলে একটু আয়োজন করে রাখতাম। কী খেতে ভালবাসে তাই তো ভাল করে জানি না।
মায়ের যে কত উদ্বেগ! ভয়ে ভাবনায় কাঁটা হয়ে আছে। মরণের একটু কষ্ট হয় মায়ের জন্য।
কই গো! আরে দ্যাখো কারে আনছি! বলতে বলতে রসিক বাঙাল আগর ঠেলে উঠোনে ঢুকল। হাতে একটা মস্ত ইলিশ মাছ। সামনেই তাদের এমন নাটুকে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থমকেও গেল। পিছনে লম্বাপানা, ফর্সা, ছিপছিপে সুন্দর ছেলেটা, মরণ জানে তার দাদা সুমন উচ্চ মাধ্যমিকে স্টার পেয়ে পাস করেছে। ডাক্তারি পড়বে বলে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষাও দিয়েছিল। পাসও করেছে হয়তো। সে মুগ্ধ স্বপ্নাচ্ছন্ন চোখে চেয়ে রইল।
মা হাসি কান্না মেশানো মুখে বলল, এই বুঝি–?
আরে হ, এই হইল সুমন। হারু বইল্যাই ডাইক্যো, আয় রে হারু, এই হইল গিয়া তর ছোটমা। আরে, বান্দরটা দেখি আইজ সাইজ্যা গুইজ্যা খাড়াইয়া আছে!
মরণ গিয়ে টপাটপ প্রণাম সেরে ফেলল।
দাদা মাকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে যাচ্ছিল, মা প্রায় সাপ দেখার মতো চমকে গিয়ে পিছিয়ে তার হাত ধরে ফেলে বলল, না না, ছিঃ ছিঃ আমাকে প্রণাম করতে হবে না বাবা, এসো, কতকাল পথ চেয়ে আছি তোমাদের জন্য। আমি এক অভাগী মা।
এসব কথা মা বোধহয় আগে থেকে তৈরি করে রেখেছিল মনে মনে। অভাগী মা কথাটা ঠিক খাটল না যেন, ঘাবড়ে গিয়ে মা নাটকের ডায়লগ দিচ্ছে।
তবে হ্যাঁ, দাদাটাকে খুব পছন্দ হল মরণের। হালকা নীল জিনসের প্যান্ট আর খুব কারুকাজ করা লম্বা ঝুলের পাঞ্জাবিতে খুব টং দেখাচ্ছে। নরম পাতলা গোঁফ আছে, অল্পস্বল্প দাড়িও। মাথায় বেশ ঢেউ খেলানো লম্বা চুল, ডান ধারে সিঁথি, কাঁধে একটা ব্যাগ।
ও মরণ দাদাকে দাদার ঘরে নিয়ে যা বাবা।
সুমন ওরফে হারু চারদিকটা চেয়ে দেখছিল। তার দিকে ফিরে বলল, তুমি মরণ?
মরণ কৃতার্থ হয়ে গেল। ঘাড় হেলিয়ে বলল, হ্যাঁ।
আর বোনটা?
মা বলল, ওই তো মুক্তার কোলে। ঘুমিয়ে পড়ল বোধহয়। যাও বাবা, তুমি ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম করো। জামাকাপড় পালটাও, চা খাবে তো!
না, আমি চা খাই না।
কী খাবে এখন বলল তো! ময়দা মাখা রয়েছে, একটু লুচি-টুচি ভেজে দেব?
না। খেয়ে এসেছি। একেবারে দুপুরে খাব।
গলার স্বরটা বড় ভাল দাদার। বেশ গমগমে। একটু লাজুক আছে। চোখ তুলে চাইছে না বেশি।
জড়তা, আড়ষ্টতা, লজ্জা অনেক কিছু মিশে আছে দু পক্ষের সম্বন্ধের মধ্যে।
হাত বাড়িয়ে মাছটা মার হাতে দিয়ে বাবা বলল, ভাপা কইরো তো, প্যাটে ডিম থাকলে ভাইজ্যা দিও।
এখন খাওয়া-দাওয়া নিয়ে মাতে আর বাবাতে কিছুক্ষণ কথা হবে। বাঙালরা খুব খাওয়া নিয়ে কথা কইতে ভালবাসে।
তার পিছু পিছু দাদা উঠে এল ওপরে। দক্ষিণ পশ্চিমের বড় ঘরখানায় ভুরভুর করছে চন্দন ধুপকাঠির গন্ধ। খোলা জানালা দিয়ে আলো-হাওয়া আসছে। এক ধারে বড় খাটের ওপর বিছানা। নতুন একটা ফুলকারি বেডকভার দিয়ে ঢাকা, খাটের পাশে টুল, তার ওপর ঢাকা দেওয়া কাচের গ্লাসে জল, পাশে সাদা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের জগে আরও জল। দুটো স্টিলের ফোল্ডিং চেয়ারের ওপর আসন পাতা। ঘরের কোণে একটা টেবিলে কিছু বই। তাদের বাড়িতে বেশি বই নেই। যে কখানা আছে তাই মা টেবিলে সাজিয়ে রেখেছে। টেবিলের ওপর ফুলদানিতে টাটকা কিছু গোলাপ আর গোলাপের ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে রাখা শিউলি ফুল। এ-ঘর অনেকদিন ধরেই দাদার জন্য সাজিয়ে রেখেছে মা। যদি কখনও আসে!
দরজায় দাঁড়িয়েই ঘরটা একটু দেখল সুমন। তারপর তার দিকে চেয়ে একটু লজ্জার হাসি হেসে বলল, আমার একটা জিনিস ভুল হয়ে গেছে। বাড়িতে পরার চটি আনিনি। এখানে হাওয়াই চটি পাওয়া যায় না?
হ্যাঁ, বাজারে মাখন দাসের দোকানে ভাল জিনিস পাওয়া যায়। এনে দেব!
পরে হলেও চলবে।
চটি বাইরে ছেড়ে ঘরে ঢুকল সুমন। ব্যাগটা বিছানায় রেখে তার দিকে চেয়ে বলল, এ ঘরে কে থাকে?
আপনি না তুমি কী বলবে ঠিক করতে পারছিল না মরণ, শেষমেশ আপনি করে বলাটাই সাব্যস্ত করে বলল, কেউ থাকে না। এ-ঘরটা আপনার জন্যই রেখে দিয়েছে মা।
তাই বুঝি! বলে অবাক চোখে চারদিকটা ফের দেখল সুমন।
ওইটে বাথরুম। আপনি হাতমুখ ধোবেন না?
