গাঁ গাঁ করে বর্ধমানের একটা বাস এসে ধুলো উড়িয়ে থামল। লোক নামছে। বাবা নামে কিনা তা সতর্ক চোখে দেখছিল মরণ। না, বাবা নামল না। তবে সবার শেষে যে নামল তাকে সে খুব চেনে। তার স্কুল থেকেই অমলদা মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করেছিল। সারা গ্রামে নাকি হুলস্থুল পড়ে গিয়েছিল সেই ঘটনায়। স্ট্যান্ড করা ছেলে দেখলে কি বোঝা যায়? মরণ তো কিছু বুঝতে পারে না। লোকটা কেমন টালুমালু চোখে চারদিকে চাইল, যেন জায়গাটা চিনতে পারছে না। ডান হাতের ভারী অ্যাটাচি কেসটা টানতে লোকটার যেন কষ্ট হচ্ছে। মাথায় বড় বড় চুল, এলোমেলো হয়ে কপালে ঝুলে আছে। মুখটায় রাজ্যের দুশ্চিন্তা যেন। মরণের একবার ইচ্ছে হল, গিয়ে বলে, দিন আপনার অ্যাটাচি কেসটা পৌঁছে দিয়ে আসি। কিন্তু কেমন যেন সাহস হল না।
দীনু সিংহের এস টি ডি বুথের পাশে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ লোকের টেলিফোন করা দেখল সে, মাঝে মাঝে তার খুব ইচ্ছে হয় এখান থেকে বড়মার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে। কিন্তু সাহসে কুলোয় না। বড়মা তাকে চিনতেই পারবে না।
আর একটা বাস এসে ওই দাঁড়াল। লোক নামছে। আর হঠাৎ সে ভিড়ের মধ্যে এক মাথা উঁচু তার বাবা বাঙালকে দেখতে পেল।
পাঁই পাঁই করে ছুঁটতে লাগল মরণ, হঠাৎ খেয়াল হল, এই যা, পান কেনা হয়নি যে!
পান কিনতে বাজারের নাবালে নেমে গিয়ে সে একটু আড়াল হয়ে দেখতে গিয়ে দেখল, বাবা একা নয়, সঙ্গে একটা সুন্দরমতো ছেলে, আঠারো-উনিশ বছর বয়স হবে। হাতে স্যুটকেস। ছেলেটার মুখ খুব গম্ভীর।
পানটা কিনেই ফের ছুট লাগাল মরণ। বাড়িতে ঢুকেই অভ্যাসবশে চেঁচাল, ও মা, বাঙাল এসেছে, সঙ্গে বোধহয় দাদা!
দোতলার রেলিং-এর ওপর ঝুঁকে বাসন্তী বলল, সঙ্গে কে বললি?
মনে হচ্ছে দাদা, বেশ লম্বাপানা, সুন্দর দেখতে।
ও মা গো! এখন কী হবে!
কী হবে মা?
কী জানি কী হবে বাবা! বড্ড ভয় করছে। শহুরে ছেলে। ঘরদোর তো গোছগাছও করা নেই, ও মরণ, তোর দিদিমাকে বল যেন এ সময়ে ঘর থেকে না বেরোয়।
আমি কি ফের পড়তে বসব মা?
আর পড়ার দরকার নেই বাবা, বরং ওপরে এসে ফর্সা জামা-প্যান্ট পরে যা, ফিটফাট না দেখলে কী মনে করবে।
একটু বাদে উঠোনের ওপর যে দৃশ্যটা দেখা গেল সেটা যেন যাত্রা- থিয়েটারের একটা সিন। মাকে কোনওদিন সাজতেগুজতে দেখে না মরণ। এমনকী যেদিন বাবা আসে সেদিনও না। কিন্তু মা আজ পাটভাঙা একটা ঢাকাই শাড়ি পরেছে, চুল আঁচড়ানো, মাথায় ঘোমটা, কপালে টিপ, তাড়াহুড়োয় যতটা করা যায়। মায়ের পাশে ইস্তিরি করা নীল জামা আর খাকি হাফ প্যান্ট পরা মরণ। তারও চুল আঁচড়ানো, পায়ে আবার হাওয়াই চটি–যা সে কস্মিনকালেও পরে না। তিন পা পিছনে বোনটাকে কোলে নিয়ে মুক্তাদি দাঁড়িয়ে। সব কেমন অ্যাটেনশন হয়ে আছে। মায়ের মুখটা দেখে মায়া হচ্ছে মরণের, কেমন কান্না কান্না ভাব, অথচ ঠোঁটে আবার একটু হাসিও। মা ভীষণ ঘাবড়ে গেছে, বারবার ঢোঁক গিলছে।
ও মুক্তা, সব ঠিক আছে তো, উঠোনটা ভাল করে দেখেছিস? কোথাও গোবর-টোবর বা কুকুরের গু পড়ে নেই তো?
না বউদি, সব দেখেছি।
একটু আগে জিজিবুড়ি মরণের ঘর থেকে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে বলেছিল, আদিখ্যেতা দেখে মরে যাই, যেন বড়লাট আসছেন।
মা যেন উঁকিঝুঁকি না দেয়, বলেছিস?
হ্যাঁ, কিন্তু এঃ মা, তুমি যে দু পায়ে দু রঙের চটি পরে আছ।
বাসন্তী নিজের পায়ের দিকে চেয়ে জিব কেটে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, এমা কী হবে?
মুক্তা বলল, দাও তো, কচুগাছের আড়ালে রেখে দিয়ে আসি।
খালি পায়ে থাকব, কেমন দেখাবে?
এর চেয়ে তো ভাল।
মরণ ফিক করে হেসে ফেলেছিল। বাসন্তী তার দিকে চেয়ে ধমকে বলল, ওরকম হাসতে নেই, দাদা উঠোনে এসে দাঁড়ালে গিয়ে পেন্নাম করিস, বাবাকেও, মনে থাকে যেন!
মরণ জানে, এসব তাকে একটু আগেই শিখিয়েছে মা।
হ্যাঁ রে ভুল দেখিসনি তো! আসতে দেরি হচ্ছে কেন?
বাবা তো মাঝে মাঝে কেনাকাটা করতে বাজারে ঢোকে।
যত দেরি হচ্ছে তত আমার বুক কাঁপছে বাবা। ও মুক্তা, মেয়েটা কাজলের টিপটা জেবড়ে ফেলেনি তো!
না বউদি, কাঁধে মাথা রেখেছে, ঘুমোবে মনে হয়।
একটু জাগিয়ে রাখ, ওর বাবা আবার এসে মেয়েকে জাগা না দেখলে খুশি হয় না। আর হাঁক দিয়ে মুনিশটাকে বল তো, এ সময়ে যেন হুট করে গোরু-ছাগল না ঢুকে পড়ে উঠোনে।
জানালা দিয়ে জিজিবুড়ির গলা পাওয়া গেল, গাঁয়ে তো গোরু-ছাগলই থাকে রে বাপু, আর সেসব দেখতেই তো বাবু ভায়েরা আসে।
ফের ফিক করে হেসে ফেলল মরণ, ইস্তিরি করা জামায় তার গরম লাগছে। এমন কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকারও অভ্যাস নেই তার। কেবল মনে হচ্ছে তারা একটা থিয়েটারের পার্ট করতে নেমেছে।
একটু চুপ করবে মা? মুখে আঁচল ঢুকিয়ে বসে থাকো তো, যখন তখন ফুট কেটো না, আমার বলে বুক কাঁপছে আর উনি কুট কুট করে কথা ফোঁটাচ্ছেন, ও নবীনা তোর হল?
দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে এসে নবীনা বলল, হ্যাঁ গো বউদি, ফুলদানিতে ফুল সাজিয়েছি, ছোট কার্পেটটাও পেতে দিয়েছি।
বেডকভারটা টানটান করে পেতেছিস তো!
হ্যাঁ গো, ধূপকাঠিও জ্বালিয়ে দিয়েছি।
বারান্দার কাপড় মেলার দড়িগুলো খুলে ফেল, বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে।
মরণেরও একটু বুক কাঁপছে, তেষ্টা পাচ্ছে। সে জানে তাদের পরিবারটা আর পাঁচ জনের মতো নয়। কলকাতা আর পল্লীগ্রাম ভাগ হয়ে যাওয়া একটা ব্যাপার আছে তাদের। একবার ক্লাসে একটা ছেলের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়েছিল। ছেলেটা ঝগড়ার সময়ে বলে ফেলেছিল, যা যা, বেশি কথা বলিস না, তোর বাবার তো দুটো বউ।
