জিজিবুড়ি গেল, পড়া ফেলে দিব্যি জানালা দিয়ে দৃশ্যটা দেখে খুব হাসছিল মরণ। আজ মায়ের হাতের রান্না খুলবে। রেগে গেলে মা দারুণ রাঁধে।
জিজিবুড়ি আর দুবার এল, শেষবার দশটা নাগাদ। এসে বলল, ও বাসি, কাল রাত থেকে দানাপানি জোটেনি মা, ছোটবউ খানকির মেয়ে ওই নয়নটা এমন ধাক্কা দিয়েছে যে কাঁকাঁলে বড্ড ব্যথা, আজ তোর এখানে দুটো ভাতে ভাত করে দিবি? এক ফোঁটা ঘি দিয়ে
আজ সুবিধে হবে না মা, আজ তোমার জামাই আসছে।
মোলো যা, আজ আবার বাঙাল আসছে কেন?
তাতে কি তোমার গতরে শুঁয়োপোকা ধরল? তার বাড়িতে সে আসবে, তাতে কথা কীসের?
তাই কি বললুম, বলছি, আজ তো আর শনিবার নয়, কাজকারবার ফেলে আসছে তো!
তার বিশ্বাসী কর্মচারী আছে, তোমার অত মাথাব্যথা কীসের?
ঘরে যে যেতে পারছি না মা, ধুন্ধুমার কাণ্ড দেখে এসেছি একটু আগে। শোনা যাচ্ছে থানা-পুলিশেও খবর গেছে। তারা এল বলে! কী যে হবে কে জানে বাবা।
কী আবার হবে, নতুন বৃত্তান্ত তো নয়। থানা-পুলিশ তো আগেও হয়েছে। চাটুজ্যেদের গোরু নিয়ে হাটে বেচে দিয়ে তোমার বড় ছেলে হাজতে গিয়েছিল মনে আছে?
মনে আছে বাবা, সব মনে আছে। কপালের দোষ মা, ও কি খণ্ডায়?
দুধ চিঁড়ে দিয়ে ফলার করতে পার। ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
মুখটা বিকৃত করে জিজিবুড়ি বলে, ম্যাগো, পেটে এখন ভাতের খিদে, দুধ চিঁড়ে কি গলা দিয়ে নামে বাছা!
ঠিক আছে। মরণের ঘরে গিয়ে বসে থাক, ভাতের কথা বলেছ, গেরস্থের ঘর বলে কথা, খেও খন দুপুর বেলায়।
তবে দুটো পোস্তর বড়া করিস আর একটু টক, টক ছাড়া মুখে রোচে না।
মরণের আজ দুঃখের কপাল, বাবা আসছে, বাবা আসা মানেই যমদূতের আগমন, আজ সকাল থেকেই মা পড়তে বসিয়ে দিয়েছে। পড়ছে তো লবডঙ্কা, কিন্তু পড়ার টেবিলে বই-খাতা মুখে করে এই বসে থাকাও এক যম-যন্ত্রণা। বাইরে খোলা মাঠঘাট আয়-আয় করে ডাকছে। স্কুলটা খোলা থাকলেও না হয় হত। কিন্তু কপাল খারাপ, স্কুলের এক প্রাক্তন হেডমাস্টার মারা যাওয়ায় স্কুলও আজ ছুটি।
হ্যাঁ লা বাসি, তোর ঘরে কি পান আছে?
মা দোতলা থেকেই বলল, না মা, আমরা কেউ পান খাই নাকি যে থাকবে?
তবে যে মুশকিল হল। আমার পান ফুরিয়েছে, পান ছাড়া আমার এক দণ্ড চলে না। ও ভাই মরণ, দিবি এনে একটু পান?
মরণ আনন্দে লাফিয়ে উঠল, এক লাফে উঠোনে নেমে বলল, পয়সা দাও এনে দিচ্ছি।
ওপর থেকে মা ধমক দিয়ে বলে, ওকে বলছ কেন মা? ওর বাবা টের পেলে রাগ করবে। ওই মুনিশ-টুনিশ কেউ এলে এনে দেবে খন।
মরণ ঊর্ধ্বমুখ হয়ে করুণ গলায় বলে, আমার পড়া হয়ে গেছে মা, এক ছুটে যাব আর আসব।
তোর বাবা এসে যদি দেখে–
বাঃ, তা বলে সারা দিন পড়ব নাকি? সকাল থেকে তো পড়ছি৷
ওঃ, কী রকম পড়া তা খুব জানা আছে। বই খুলে বসে থাকলেই বুঝি পড়া হয়?
যাই না মা।
বাসন্তী আর আপত্তি করল না, বলল, যাবে যাও, দয়া করে তাড়াতাড়ি ফিরো।
পয়সা নিয়ে মরণ দুই লাফে বেরিয়ে পড়ল। ছুটি! ছুটি!
অবারিত মাঠ-ঘাট, আলো-হাওয়ায় এসে বুকটা হাঃ হাঃ করে হেসে ওঠে তার। ছুট! ছুট! হালকা পায়ে খানিকক্ষণ দৌড়ে নেয়, কদমতলায় দুর্গাপূজার প্যান্ডেল হচ্ছে। দাঁড়িয়ে একটু দেখে নেয় সে। দক্ষিণপাড়ায় ফুটবল ম্যাচ। তাও একটু দেখে, তারপর হাঁটতে থাকে। পান্নাদির বাড়ি থেকে ঘুঙুরের আওয়াজ আসছে। ঘোষ জ্যাঠাইমার বাড়ি থেকে গুড় আর নারকেল পাক দেওয়ার মিঠে গন্ধ। আর রায়বাড়ির বারান্দায় আজও সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে, যাকে দেখলে ঠিক মনে হয় এক রাজপুত্তুর এসে ওকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে বলে অপেক্ষা করে আছে। চাটুজ্যে বাড়ি থেকে খুব হাসিখুশির একটা শব্দ আসছে। খোলা উঠোনে কানামাছি খেলছে একদঙ্গল হুমদো হুমদো মেয়ে-পুরুষ, মাঝখানে ওটা পারুলমাসি না? হ্যাঁ, পারুলমাসিই। রুমালে চোখ বাঁধা পারুলমাসি হাসতে হাসতে টলোমলো পায়ে দু হাত সামনে বাড়িয়ে কাউকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝে এরকম জমায়েত হয়, আবার সব সুনসান হয়ে যায়। দাদু আর দিদা একা পড়ে থাকত, দাদু ওই একতলার বড় দালানের বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে থাকত সকালের দিকটায়, তাকে দেখলেই ডাক দিত, এই বাঙাল আয় তো দেখি তোর লেজ আছে কিনা। গৌরহরি দাদু বাবাকে বড় ভালবাসত। বলত, বাঙালটার রসকষ কম বটে, কিন্তু লোকটা জব্বর খাঁটি, আর এখন দিদা একদম একা, মরণ মাঝে মাঝে হাজির হয়ে যায় এসে। দিদার নারকেল বা সুপুরি পেড়ে দেয়, গোয়ালঘরের চাল থেকে চালকুমড়ো। দিদা প্রায়ই রাগ করে বলে, তুই তো বড়লোকের ছেলে, তবে কেন চেহারাটা অমন চাষাভুসোর মতো করে রেখেছিস? ভাল জামাকাপড় নেই তোর? দাঁড়া তোর বাবা আসুক, বলব।
কানামাছি খেলায় কাউকে ছুঁতে পারল না পারুলমাসি। একটা টু দিয়ে পালাচ্ছিল বিজুদা, ছুঁতে গিয়ে দক্ষিণের দালানের বারান্দায় উপুড় হয়ে পড়ে গিয়ে হেসে উঠল। কাকে কী ডাকবে তার বেলায় সম্পর্কে ঠিক রাখতে পারে না মরণ। গৌরহরিদাদুর ছোট ভাই রামহরিকে সে ডাকে জ্যাঠামশাই। আবার পারুলমাসির খুড়তুতো বোন পান্নাদিকে তো দিদিই ডাকে সে। মা অবশ্য বলেছে, ওদের সঙ্গে তো আর আত্মীয়তা নেই, যা খুশি ডাকতে পারিস।
বাসরাস্তার কাছে এসে খানিক দাঁড়িয়ে লোকজন দেখল মরণ, বেশ লাগে তার। বেঁটে, লম্বা, সরু, মোটা, কালো, ফর্সা কত রকমের যে লোক আছে দুনিয়ায়। কোথা থেকে যে আসে আর কোথায় যায়।
