কিন্তু মরণের সমস্যা অত সরল নয়, প্রথমে সে ভেবেছিল, শিবঠাকুরের কাছে রসিক বাঙালের বদলে একজন ভাল বাবা চেয়ে নেবে। কিন্তু পরে ভেবে দেখেছে, তার মা রসিক বাঙাল বাবাকে এতই ভালবাসে যে, বাবা বদলালে মা কেঁদেই মরে যাবে। তার চেয়ে বরং রসিক বাঙালই তার বাবা থাক, শুধু মেজাজটা অমন তিরিক্ষি না হয়ে যেন একটু নরম-সরম হয়, আর তাকে যেন ন্যাংটো করে চান না করায়, আর যেন ন্যাড়া করে না দেয়। দুনম্বর হল, কলকাতার বড়মা আর দাদা-দিদিরা যেন বেশ ভাল লোক হয় আর তারা যেন তাকে খুব ভালবাসে। মরণের মাঝে মাঝে মনে হয়, বোনটা হওয়ার পর থেকে তার মা যেন তাকে আর ততটা ডাক-খোঁজ করে না। তার ধারণা, এক মায়ের জায়গায় দুটো মা হলে আদর-টাদর ডবল হয়ে যাবে। সুতরাং তার দুনম্বর বর হল, বড়মা আর দাদা-দিদিরা যেন এখানে এসেই থাকে। তিন নম্বর বরটা নিয়ে সে খুব ভাবছে। ভেবে কোনও কূলকিনারা করে উঠতে পারছে না।
সকাল থেকে জিজিবুড়ি বারবার টানা মারছে। মুখ শুকনো। চোখ কপালে উঠেছে, সাতসকালে এসে ধপাস করে বারান্দায় বসে পড়ে খানিক হাঁফ ছেড়ে বলল, ওরে ও বাসি, কাল রাত থেকে বাড়িতে যে সুন্দ-উপসুন্দের লড়াই হচ্ছে। তিষ্ঠোতে দিচ্ছে না যে।
মরণের মা দোতলার বারান্দা থেকে ঝুঁকে বলল, আহা, ভারী নতুন বৃত্তান্ত কিনা। ও তো নিত্যি হচ্ছে।
জিজিবুড়ি কাহিল গলায় বলে, এ তা নয় মা, এবার একটা খুনোখুনি না হয়ে যায়। সারা রাত কুরুক্ষেত্তর হল, সকালেও হচ্ছে। পাড়াসুদ্ধ সবাই ঝেটিয়ে এসে মজা দেখছে। এই রঙ্গে লোক।
ছেলেদের যেমন শিক্ষা দিয়েছ তেমনই তো হবে। আমার ধান চাল কম হরির লুট করেছে? ধার বলে টাকা নিয়ে যায়, একটা পয়সা আজ অবধি শোধ করেনি, মায়ের পেটের ভাই বলতে লজ্জা করে।
ওঃ, খুব যে ফোঁটা কেটে বষ্টুমি হয়েছিস আজ। তুইও তো একই ঝাড়ের বাঁশ। বাঙালের টাকায় দুদিন ধরে না হয় ফুটুনি করছিস, তা বলে নিজের জনদের দিকে চাইবি না? এই কি ধর্মের বিচার?
আমাকে আর ধর্ম দেখিও না মা, তোমার গুণধর ছেলেরা আমার সর্বনাশ করে পথে বসাতে চেয়েছিল, তখন তোমার ধর্ম কি পাশ ফিরে ঘুমাচ্ছিল নাকি? এখন যেই অশান্তি লেগেছে অমনি নাকি কান্না কাঁদতে এসেছ! ধর্ম এখনও আছে বলেই দু ভাইয়ে খুনোখুনি হচ্ছে। আরও হোক, সত্যনারায়ণের সিন্নি দেব।
বলতে পারলি ও কথা? অভাবের সংসার বলে ঝগড়া হয়, তা কোথায় না হচ্ছে শুনি? তা বলে নিজের ভাইদের শাপশাপান্ত করবি? এতে কি তোরই ভাল হবে ভেবেছিস?
খবরদার মা, শাপশাপান্ত করবে না বলে দিচ্ছি। সেবারও খুঁড়েছিলে বলে ছেলেটার একশো চার-পাঁচ জ্বর উঠেছিল, তোমার মুখে বিষ আছে, শাপশাপান্ত করলে এ বাড়িতে ঢোকার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।
জিজিবুড়ির গুণ হল টক করে ভোল পালটাতে পারে। হঠাৎ ভারী নরম হয়ে বলল, ওমা! খুঁড়লুম কোথায়? বলছিলুম যে, মেয়েদের বাপের বাড়ির ওপর কত টান থাকে, তুই যে কেন ওদের ওরকম বিষনজরে দেখিস।
জিজিবুড়ি কিছুক্ষণ বারান্দার থামে মাথা হেলিয়ে বসে রইল। তারপর বলল, তোকে তো ওবাড়িতে যেতে বলিনি। বলছিলুম, দু ভাইয়ের একটা ব্যবস্থা করে দে। বাঙালকে বল না তার দোকানে কর্মচারী করে নিক।
আর বাঁধানো কথা বোলো না তো মা। তোমার ছেলেরা সেই চরিত্রের মানুষ কিনা! দোকানের টাকা ভেঙে জুয়ো খেলবে, মদ-গাঁজা খাবে, গুণের তো শেষ নেই।
জিজিবুড়ির সঙ্গে সবসময়ে পানের বাটা থাকবেই। এসব কথার পর পান সাজতে সাজতে বলল, বাঙালের ঘর করে করে তোরও মায়া-দয়া সব উবে গেছে। বাঙাল এলে এবার না হয় আমিই তাকে বলব, দুদুটো হুমদো হুমদো সম্বন্ধী বেকার বসে আছে বাপু, দোষঘাট থাকতে পারে, কুটুম তো, তাদের কথাও একটু ভেব বাপু। না হয় বাসরাস্তায় দুখানা মুদির দোকান করে বসিয়ে দাও।
আহা, একেবারে গিল্টি করা কথা। দোকান করে বসিয়ে দাও। তোমার ভীমরতি হলেও তার তো হয়নি। সম্বন্ধীদের সে খুব চেনে। তুমিই চিনলে না কী ছেলে পেটে ধরেছ!
ভীমরতি কি তোকেও ধরতে বাকি রেখেছে? ক বিঘে জমি আর একটা পাকা বাড়ি পেয়ে আহ্লাদে ডগমগ হয়ে আছিস। বাঙালের যে লাখো লাখো টাকা কারবারে খাটছে তার কাছে এ তো চুষিকাঠি। দেবে ভেবেছিস তোকে সে টাকার ন্যায্য ভাগ? সব ওই বড়বউয়ের গর্ভে যাচ্ছে। বাঙাল চোখ বুজলে উকিল লাগিয়ে আইনের প্যাঁচে তোর সম্পত্তিও এক ঝটকায় নিয়ে নেবে। তাই বলছি, এখনও সময় আছে, সব বুঝেসুঝে নে। দুটো দোকান না হয় তোর নামেই করে দেবে, ভাইরা খেটেখুটে, দোকান চালিয়ে তোর ন্যায্য পাওনা-গণ্ডা মাসকাবারে মিটিয়ে দেবে।
সাধে কি বলে যে, তোমার মুখে বিষ! এর মধ্যে আমার স্বামীর মরণের ভাবনাও ভেবে ফেলেছ! তোমার আর কবে আক্কেল হবে মা? জামাইয়ের বাড়বাড়ন্ত দেখে তোমার চোখ টাটায় কেন? মেয়ে সুখে আছে সেও তোমার সহ্য হয় না। তুমি কেমনধারা মানুষ?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজিবুড়ি উঠে পড়ল। বলল, জামাইয়ের বাড়বাড়ন্ত দেখেই তো বলছি, বেশি বাড়ও তো ভাল নয়। তোর ভাল ভেবেই বলছি, টাকাপয়সা নগদ যা পারিস ঝেঁকে নে। বাসরাস্তায় দুখানা দোকানঘর বন্দোবস্তে আছে শুনেছি। দশ বিশ হাজারে হয়ে যাবে।
তুমি এখন যাও তো, আমার মাথাটা আর খারাপ করে দিও না।
