পারুলের কথা তুমি না তুললেই আমি স্বস্তি বোধ করব।
সেটা হবে অভিনয়। পারুলের কথা জেনেও তার কথা কখনও তুলব না সে কি হয়?
অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে লাভ কী?
অতীত যে কখনও কখনও বর্তমানকে বিষিয়ে দেয়।
তাহলে কী জানতে চাও বলো!
সব জানতে চাই। বলবে?
কোন একটা উপন্যাসে যেন পড়েছিলাম, একটি মেয়ে তার প্রেমিক সম্পর্কে বলছে, আমরা এক বৃন্তের দুটি ফুল, আমাদের ছিঁড়িলেন কেন?
এতটা?
হয়তো এতটাই। ছেলেবেলা থেকে চেনাজানা, যাতায়াত। সেই থেকে একটা বোঝাপড়া। পারুলের সঙ্গে আমার বিয়ে হবে এটা সকলেই জানত। অন্যরকম যে হতে পারে এটা ভাবাই যেত না।
তাহলে অন্যরকম হল কেন? কী নিয়ে তোমাদের বনল না?
আমি জানি না।
অন্য কোনও পুরুষ?
আমি জানি না। শুধু জানি হঠাৎ একদিন পারুল আমাকে ঘেন্না করতে শুরু করে।
তাই কি পারা যায়?
হল তো! আমার কিছু করার ছিল না।
তুমি কোনও দোষ করনি?
না। কোনও দোষ করিনি। তুমি বড় উকিলের মতো জেরা করছ। জেনে রাখো, এসব ঘটনা আমাকে আর স্পর্শ করে না।
শুনেছি পারুল তার মা বাবার পছন্দ করা পাত্রকে বিয়ে করেছে।
হ্যাঁ।
ওর বাবা-মা জোর করে বিয়ে দেয়নি তো!
না। ওঁরা ওরকম লোক নন।
ব্যাপারটা অদ্ভুত। তোমাকে হঠাৎ ঘেন্না করার কী হল?
অহংকারীদের অনেক প্রবলেম মোনা।
পারুল কি অহংকারী?
ভীষণ। শি ইজ অলসো এ পিউরিটান।
পিউরিটান! তার মানে কী?
আমাকে কখনও ওর হাতটাও ধরতে দিতে চাইত না।
মাই গড! তাহলে কি তুমি কখনও ওর পিউরিটি নষ্ট করার চেষ্টা করেছিলে?
এ কথায় আতঙ্কিত হয়ে অমল প্রায় আর্তনাদ করে উঠেছিল, না, না। আমি কিছু করিনি।
কথার চক্করে ফেলে সেদিনই মোনা তার মুখ থেকে সত্যটা প্রায় বের করে ফেলেছিল। আর সেইদিন থেকেই এই চালাক, গোয়েন্দার মতো তদন্তে ওস্তাদ, প্রোবিং, ন্যাগিং মেয়েটিকে সে ভয় পেতে শুরু করে। ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘেন্নাও।
যেই ঘেন্না শুরু হল অমনি অমলের নজরে পড়তে লাগল অদ্ভুত সব ব্যাপার। মনে হত, ওর গালে কি মেচেতা আছে? মাথার চুল তেমন ঘেঁষ নয় তো, টাক পড়ে যাবে কি? নীচের ঠোঁটটা একটু ঝুলে-পড়া না? ইস, দাঁতের সেটিং কী বিচ্ছিরি! বেশ মোটা কিন্তু। লোকে কি ওর মুখখানা একটু চোয়াড়ে দেখে না? হাতে বেশ লোম আছে তো! আর ও কি একটু গোঁফের রেখা?
অথচ অমল জানে নিরপেক্ষ বিচারে তা নয়। মোনা বেশ সুন্দরী। খুবই সুন্দরী। ওর এত বেশি চোখধাঁধানো রূপটাও যেন একটা অপরাধ বলে মনে হত তার।
জার্মানিতে বা ইংল্যান্ডে বা আমেরিকায় তাদের বিবাহিত জীবন যখন পুরনো হচ্ছে তখন তাদের ঝগড়াও হতে লাগল খুব। মোনা মাঝে মাঝেই বলত, তোমাকে বিয়ে না করে পারুল ঠিক কাজই করেছে। পারুলই ঠিক চিনেছিল তোমাকে।
পারুলের নাম মুখে আনার যোগ্যতাও তোমার নেই।
সে যোগ্যতা তোমারও নেই।
এইভাবেই তাদের সম্পর্ক থেকে মুছে-যাওয়া পারুল আবার স্পষ্ট হয়ে উঠত, জেগে উঠত। নবীকরণ হত পারুলের, পারুল তাই পুরনো হতে পারল না, বিস্মৃত হতে পারল না কখনও।
শেষ অবধি ধরা পড়ে গিয়েছিল অমল। একদিন নেশার ঘোরে সে ঘটনাটা প্রকাশ করে দেয়। বউয়ের সামনে, মেয়ের সামনে।
পরদিন মোনা তাকে বলেছিল, আমার এরকম সন্দেহ ছিলই। ছিঃ ছিঃ!
তোম্বা মুখ করে অমল বসে রইল কিছুক্ষণ। তার পর মুখ তুলে বলেছিল, সো হোয়াট! উইল ইউ ডেজার্ট মি?
আমি তোমাকে ছেড়ে গেলেও তো শূন্য স্থান ভরাতে পারুল ফিরে আসবে না।
আমি তোমাকে ঘেন্না করছি মোনা।
তার চেয়ে ভাল হত তুমি যদি নিজেকে ঘেন্না করতে কাপুরুষ।
আশ্চর্যের বিষয় হল, মেয়েদের সহজ সংস্কারবশে মোনার রাগ হওয়ার কথা পারুলের ওপর। কিন্তু অবাক কাণ্ড, সে কখনও পারুলের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেনি কখনও। বরং পারুলের ছবিখানা আলাদা করে সযত্নে অ্যালবামের একটা আলাদা পৃষ্ঠায় সেঁটেছিল সেই। সে জানত, মাঝে মাঝে অমল ছবিটা খুলে দেখে। ধরা পড়লে সংকোচ বোধ করত অমল। কিন্তু মোনা বলত, দেখ, দেখ, ওই ছবি দেখে তোমার বিবেক জাগ্রত হোক।
ভিড় কমেছে। অমল ক্লান্ত পায়ে স্টেশনচত্বর পার হল। এখন তার কানে এত কোলাহল কিছুই ঢুকছে না। বড় আনমনা সে আজ। দিনটা বিচ্ছিরিভাবে শুরু হল। দিনশেষে কী ঘটবে আরও, বলা যায় না। শরীরের ভার টেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। অফুরান মনে হচ্ছে পথ। পথের শেষে কেউ নেই তার। কেউ নেই।
.
১০.
ওইখানে ওই কদমগাছের তলায় শিব এসে দাঁড়ান। বেশ পেল্লায় চেহারা, একটু ভুঁড়ি আছে, বেশ বড় জটা, গোঁফ আছে, দাড়ি নেই। কাঁধ আর মাথার ওপর তিনটে সাপ ফোঁস ফোঁস করছে ফণা তুলে। বাঁ হাতে কমণ্ডলু, ডান হাতে ত্রিশূল, পরনে শুধু বাঘছাল। পিছনে ষাঁড়। শিবঠাকুর তাকে ডেকে বলেন, বৎস, তুমি তিনটে বর চাও।
মরণের এইখানেই মুশকিলটা হয়। তার এত কিছু চাওয়ার আছে যে তিনটে বরে তার সিকিভাগও হয় না। কিন্তু ঠাকুর-দেবতাদের নিয়মই হল, তিনটের বেশি বর দেন না, তাই মরণ খুব হিসেবনিকেশ করে রোজ। এমন তিনটে বর চাইতে হবে যে, আর কিছু চাওয়ার না থাকে। খুব কায়দা করে, বুদ্ধি খাটিয়ে তিনটে বর তৈরি রাখতে হবে। শিবঠাকুর একটু ভোলেভালা আদমি। কৌশল করে যদি একটা বরের মধ্যেই তিন-চারটে বর ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তাহলেও হয়তো খেয়াল করবে না। এই নিয়ে তার গ্যাঁড়ার সঙ্গে কথাও হয়েছে। গ্যাঁড়ার অবশ্য বর নিয়ে তেমন কোনও সমস্যা নেই। সে শুধু চায় অমিতাভ বচ্চনের মতো লম্বা হবে, কুংফু ক্যারাটের ওস্তাদ হবে আর বড় হয়ে আমেরিকায় যাবে। ব্যস, ওতেই তার তিনটে বর ফুস।
