লোকটা খেতে খেতে মুখ তুলে একটু হেসে বলে, আমরা একটা ইলেকট্রনিক গুডস কোম্পানির সাব এজেন্ট। ইয়ারলি কনফারেন্সে শান্তিনিকেতনে যাচ্ছি।
ইস ছিঃ ছিঃ, আমার বড় ভুল হয়ে গেছে
লোকটা হাসিমুখেই বলল, তাতে কী? ইউ আর ওয়েলকাম–
বিস্তারিত ক্ষমাপ্রার্থনা বা ক্ষতিপূরণের সময় ছিল না। বর্ধমান এসে গেছে। অমল অ্যাটাচি কেসটা তুলে নিয়ে দ্রুত পায়ে আইল পেরিয়ে প্রিং-এর দরজাটা ঠেলে বেরিয়ে আসার সময়ে পিছনে, কামরার ভিতর থেকে একটা বড়সড় হাসির রোল শুনতে পেল।
তার কান গরম, লজ্জায় ঝাঁঝাঁ করছে মাথা। একদল ডেলিগেট কনফারেন্সে যাচ্ছে, তাদের জন্য কোম্পানি রাজকীয় ব্রেকফাস্ট আয়োজন করেছে এই সহজ ব্যাপারটা অমল রায়ের মতো বুদ্ধিমান, দুনিয়া-চষা একজন লোক বুঝতে পারল না!
ঘটনাটা হয়তো সামান্যই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গিন্নী গল্পের সেই ছোট ছেলেটির মতো তার আজ মনে হচ্ছিল, এ ঘটনাটা ওরা কেউ হয়তো কোনওদিনই ভুলতে পারবে না।
লজ্জা, নিজের ওপর বিরক্তি আর রাগ নিয়ে অমল স্টেশনের ফটক পেরিয়ে এল, নিজেকে চোর, লোভী, বেকুব ও অপদার্থ ভাবতে ভাবতে আনমনা অমল তার অ্যাটার্চি কেসটার একটা গুঁতো লাগাল একজনকে হাঁটুতে। লোকটা বাপ-রে বলে চেঁচিয়ে উঠতেই অমলের ইচ্ছে হল দৌড়ে পালায়। আজ তার এসব কী হচ্ছে?
সামনে একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট মডার্ন আর্ট। অবিশ্বাস্য রিকশার জড়াজড়ি, সাইকেল, গাড়ি, মানুষ, হর্ন, চিৎকার, ধুলো। এই জটিলতার দিকে হতাশভাবে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল অমল। সুশৃঙ্খল লন্ডন শহর থেকে সদ্য ফিরে এসে এই ভিড়ে ভিড়াক্কার, রিকশা-গাড়ি-মানুষের বিশৃঙ্খলা বড় ক্লান্তিকর মনে হয়। এই জটাজাল পার হয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে ভিড়ের বাসে ঠেলে ওঠা গন্ধমাদন বহন করার মতোই কঠিন ব্যাপার। অমলের হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে। মনে হয় সে কখনওই কোথাও গিয়ে পৌঁছতে পারবে না।
পৌঁছনোর কোনও তাড়াও নেই তার। ভিড় একটু হালকা হওয়ার জন্য থাম ঘেঁষে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের গন্তব্য বিষয়ে সে যেন নিশ্চিত নয়। বউ, ছেলে, মেয়ের প্রতি সাধারণ গৃহস্থের যেমন টান থাকে কেন তার সেরকম নেই তা সে ভেবেও পায় না।
এর মূলে কি পারুল? ওই নামটা তার মনের মধ্যে উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাড্রেনালিন প্রবাহ বেড়ে যায়। এখনও। বাড়ে অস্থিরতা। আর আচমকা অন্ধ রাগ তাকে ছোবল মারতে থাকে। পারুলকে তার খুন করতে ইচ্ছে করে, আর কাঁদতে ইচ্ছে করে পারুলের জন্যই।
মোনালিসা বিয়ের সাত দিনের মধ্যেই জেনে গিয়েছিল সব কিছু।
নতুন বউয়ের প্রতি আদিখ্যেতার অভাবই মোনালিসাকে হয়তো একটু সন্দিহান করে থাকবে। তারপর উড়ো কথা, ফিসফাস, রটনা এসব থেকেও কিছু আঁচ করে নিয়েছিল। গোয়ায় মধুচন্দ্রিমা যখন নিতান্ত ম্যাড়ম্যাড়ে, রসকষহীন একটা সাইট সিয়িং-এ পর্যবসিত হয়ে যাচ্ছিল তখনই কথাটা তুলেছিল মোনালিসা।
পারুল কে?
পারুল! পারুল একটা বন্ধ দরজা।
দরজা বন্ধ হলেও ওপাশে কেউ তো থাকতেও পারে।
সে আছে। পারুলের কথা নিয়ে আমাদের ভাববার দরকার নেই।
তুমি রবীন্দ্রনাথের মধ্যবর্তিনী গল্পটা পড়েছ?
না। কিন্তু প্লিজ, গল্পটা আমাকে আবার শোনাতে বসো না।
যে মানুষটা অ্যাবসেন্ট তার প্রেজেন্স অনেক সময়ে খুব স্ট্রং হয়ে ওঠে।
এসব তো ফিলজফি।
তাই কি? ফিলজফিও কিন্তু ফ্যালনা নয়।
লিভ পারুল অ্যালোন, প্লিজ মোনা।
তোমার আর আমার মধ্যে পারুল যে বড্ড বেশি ঢুকে বসে আছে।
উত্তেজিত অমল বলেছিল, না, নেই! নেই!
অত জোর দিয়ে বলছ বলেই সন্দেহ হচ্ছে।
পারুলের কথা মনে হলেই আমার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। ও আমাকে ভীষণ অপমান করেছিল।
আমি পারুলের বিষয়ে আরও একটু জানতে চাই। বলবে?
পারুল একটা নষ্ট মেয়ে।
নষ্ট? কীরকম নষ্ট?
শি ওয়াজ নট ফেইথফুল।
তোমার বোন ছায়া বলছিল, পারুল দেখতে খুব সুন্দর আর খুব ভাল মেয়ে। আমাকে ঠেস দেওয়ার জন্যই বলছিল। কথাটা কি মিথ্যে?
অ্যাপারেন্টলি লোকে ওকে ভালই বলবে।
তুমি বলছ না?
না। পারুল ভাল নয়।
তোমাকে রিফিউজ করেছে বলে?
কেন যে এসব কথা খুঁচিয়ে তুলছ মোনা! অকারণ অশান্তি করে লাভ কী তোমার?
স্বামী আর স্ত্রীর মধ্যে এসব গোপন থাকলে পরে আমাদের অসুবিধে হবে। বরং ফ্র্যাঙ্ক হওয়া ভাল। তাতে আমরা আমাদের প্রবলেমগুলো সর্ট আউট করতে পারব।
তোমাকে নিয়ে আমার কোনও প্রবলেম নেই। আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি এখন একজন সুখী মানুষ।
সে তো খুব ভাল কথা। ভালবাসাটা কীরকম জানো? মুখের কথা নয় কিন্তু। কেউ ভালবাসলে সেটা ফিল করা যায়। আমি সেটা ফিল করছি না।
ফিল করছ না, তার কারণ পারুলকে নিয়ে তোমার সন্দেহ দেখা দিয়েছে। সন্দেহ এক মারাত্মক ব্যাধি।
আমি তা জানি। আমার এক কাকিমা স্বামীকে সন্দেহ করত। শেষ অবধি স্বামীর এমন সব অসম্ভব যৌন সম্পর্কের কথা বলত যে আমরা কানে আঙুল দিয়ে পালাতাম। মিথ্যে সন্দেহটাই হল ব্যাধি। আমি তো তোমাকে সন্দেহ করছি না। কাউকে ভালবাসা তো অপরাধ নয়। সন্দেহের কী আছে বল!
এতই ফর্সা ছিল মোনা যে ওর গায়ের তিলগুলো পর্যন্ত তেমন কালো হয়ে উঠতে পারেনি ফর্সা রঙের ঠেলায়। সেগুলো ছিল লালচে বা বাদামি। মুখের একটা খর সৌন্দর্য ছিল। নাকটা পুরুষালি রকমের তীক্ষ্ণ। কিন্তু ওর রূপ চেয়ে দেখার মতো মুগ্ধতা কখনওই অমলকে পেয়ে বসেনি। অসহায় এক দেহভোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল মোনার প্রতি তার মনোভাব।
