হঠাৎ অমল টের পেল, আজ যেন এ.সি. চেয়ারকারে প্রার্থিত নিস্তব্ধতাটা নেই। বড্ড বেশি কথাবার্তা হচ্ছে চারদিকে। সামনে পিছনে। সুবেশ ও সুভদ্র কয়েকজন এক রকমের স্যুট-পরা তোক আইল দিয়ে ঘন ঘন যাতায়াত করছে। অমল বিরক্ত হয়ে সদ্য কেনা ইংরিজি খবরের কাগজটা খুলে খুঁজতে লাগল, যদি কোথাও ভারতের শিল্পমন্ত্রীর নামটা পাওয়া যায়। খুবই হাস্যকর এই চেষ্টা। কারণ নামটা জানার কোনও প্রয়োজনই নেই তার। কিংবা সূক্ষ্মভাবে আছেও। শিল্পমন্ত্রী নয়, সে খুঁজছে তার স্মৃতির হারানো তথ্যগুলিকে। কেন হারিয়ে যাচ্ছে তারা, কেন উবে যাচ্ছে অকারণে?
আজকাল কি এ.সি. চেয়ারকারে ব্রেকফাস্ট দেওয়া হয়? তাই তো মনে হচ্ছে। সুবেশ ও সুভদ্র স্যুট পরা লোকগুলো ট্রে-ভর্তি বাক্স সাজিয়ে এনে বিলি করছে, সঙ্গে সিল করা বোতলে জল। ভাল, বেশ ভাল। এরা এ.সি-র যা ভাড়া নেয় তাতে ব্রেকফাস্ট তো দেওয়াই উচিত। খাবারের আমিষ-গন্ধে অমলের পেটের ভিতরটা কেমন করে ওঠে। সে আজ সকালে এক কাপ কফি ছাড়া কিছুই খেয়ে আসেনি। বাসুদেব ব্রেকফাস্ট করে দিতে চেয়েছিল, তার তখন খাওয়ার ইচ্ছে হয়নি। আজ সকালে কিন্তু ক্লান্ত ও অবসন্ন ছিল অমল। কাল রাতে একটা দুঃস্বপ্ন দেখার পর শেষ রাতে ঘুম আসেনি আর।
দুঃস্বপ্ন! ঠিক দুঃস্বপ্নও বলা চলে না সেটাকে। একটা অন্ধকার গলি। এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে অমল। গলির অন্য প্রান্তে একটা মরা আলোর মলিন চৌখুপি। গোধূলির মতো পাঁশুটে আলো। কেউ কোথাও নেই। ওপরে নিরেট কালো অন্ধকার আকাশ। কিংবা হয়তো আকাশ বলেও কিছু ছিল না। শুধু ওই জনহীন গলিটাই দেখতে পেয়েছিল অমল। ঘেয়ো কুকুর বা রাস্তার বেড়ালও ছিল না, ছিল না দৌড়ে-যাওয়া ইঁদুর কি আরশোলা। এত প্রাণহীন গলি আর কখনও দেখেনি অমল। গলির ও-প্রান্তে ওই পাঁশুটে আলোর চৌখুপিও যেন এক নিষ্প্রাণতা। কোনও যাতায়াত নেই কারও, ছায়া নেই, গাছ নেই, প্রাণ নেই, শব্দ নেই। অমল দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই, এক পা-ও এমোনোর সাধ্য নেই তার। আর তার চোখ বেয়ে অঝোরে জল পড়ে যাচ্ছিল।
অন্ধকারের চেয়েও ভয়ংকর ওই পাঁশুটে আলো। সম্মোহিতের মতো চেয়ে থেকে অমল টের পাচ্ছিল, এখানেই সব শেষ। এখানেই মানুষের সব আয়াস ও প্রয়াসের শেষ, সভ্যতার শেষ, মানুষের স্বপ্ন ও সাধ্যের শেষ। আর কোথাও যাওয়ার নেই তার। বৃথা তার বেঁচে থাকা, বৃথা তার দর্শন বিজ্ঞান। এই গলিমুখ আর ওই পাঁশুটে আলোর চৌখুপি এক ভয়ংকর সংকেতের মতো নিশ্রুপে বলে দিচ্ছে, কিছু নেই, আর কিছু নেই।
একটুও বাতাস ছিল না, শ্বাসের শব্দও নয়, জ্যোৎস্না নয়। এত কান্না আসছিল তার। এইভাবে শেষ হয়ে যায় বুঝি সব কিছু?
যখন জেগে উঠল অমল তখন তার আকাশপাতাল জুড়ে ভয়। এত ভয় সে কখনও পায়নি। কিন্তু ভয়ের স্বপ্ন তো নয়! আশ্চর্য! তবে সে এত ভয় পেল কেন? পিপাসায় ব্লটিং পেপার হয়ে গিয়েছিল জিব। ভয় আর অজানা এক হাহাকার ঘুরে বেড়াচ্ছিল তার শূন্য বুকের খাঁচায়। চোখে জল ছিল তখনও। হাত-পা কাঠ হয়ে ছিল।
বারবার স্বপ্নটার কথা ভাবছে। ভাবছে স্বপ্নটার মধ্যে ভয়ের বীজ কীভাবে ছড়ানো ছিল? কোন সর্বনাশের সংকেত ছিল তার মধ্যে? কোন কূট আভাস?
এখনও ভাবছে সে। যদিও একটা স্বপ্নের জন্য এত বিচলিত হওয়ার কোনও মানেই হয় না। স্বপ্নের মধ্যে সত্য থাকে না কখনও। আবার কোনও জটিল প্রক্রিয়ায় হয়তো থাকেও। স্বপ্নটা নিয়ে অনিচ্ছের সঙ্গেও সে হয়তো আরও কয়েকদিন ভাববে।
যে লোকটা খাবারের বাক্স দিচ্ছিল সে অমলের ডান ও বাঁপাশের দুজনকে দুটো বাক্স দিয়ে অমলকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চলে যাচ্ছিল। অমলের রাগ হল। তাকে কি দেখতে পায়নি নাকি লোকটা! আশ্চর্য তো!
সাধারণত সে যা করে না আজ তাই করে ফেলল অমল। হয়তো হঠাৎ নিজের খিদেটাকে আবিষ্কার করেই সে ধৈর্য হারিয়ে হঠাৎ এগিয়ে যাওয়া লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, এই যে, এখানে দেননি কিন্তু।
লোকটা একটু বিস্মিত চোখে ফিরে তাকাল তার দিকে। লোকটার মাথায় টাক এবং বেশ ভারী গোঁফ। হঠাৎ একটু হেসে লজ্জিতভাবে বলল, সরি, আপনাকে দেওয়া হয়নি। বলে একটা বাক্স এগিয়ে দিল তার হাতে।
লোকটাকে ক্ষমা করে দিয়ে অমল ফোল্ডিং টেবিলটা নামিয়ে তার ওপর রেখে বাক্সটা খুলল। চমৎকার ব্যবস্থা। বড় একটা পরোটা রোল, দুটো চিকেন স্যান্ডউইচ, ডিমসেদ্ধ, এক টুকরো চিজ, দুটো সন্দেশ, একটা কলা। অমল খেতে খেতে হঠাৎ একটু অস্বস্তিবোধ করছিল কেন যেন। তার মনে হল দুপাশের দুজন যাত্রী তাকে মাঝে মাঝে কৌতূহলের সঙ্গে দেখছে। আইলের ওপাশের সিট থেকেও যেন দুজন একটু ঝুঁকে চকিতে দেখে নিল তাকে। হঠাৎ তাকে ঘিরে একটু নিস্তব্ধতাও ঘনিয়ে উঠল যেন।
হঠাৎ ডানপাশের লোকটা খুব বন্ধুর মতো তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার এজেন্সিটার নাম কী?
অমল বিরক্ত হল। গায়ে-পড়া লোক তার পছন্দ নয়। বলল, আমার এজেন্সি নেই।
ও! লোকটা আর কিছু বলল না।
হঠাৎ যেন বোধবুদ্ধির একটা ঝিলিক জেগে উঠল মাথার মধ্যে। কাণ্ডজ্ঞান ফিরে এল, যখন সে লক্ষ করল, কামরার সবাই ব্রেকফাস্টের বাক্স পায়নি। তার সামনের সিটের অন্তত দুজন, আড়াআড়ি সামনের ডানদিকের সারির তিনজন এবং লক্ষ করলেই, আরও অনেকেই খাচ্ছে না। জলের বোতলটা খুলে দু ঢোঁক জল খেয়ে অমল তার ডানদিকের লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, সামথিং ইজ রং, ইজনট ইট! আপনারা কারা?
