ওলো দিদি, মাগী কী বলছে শুনলি?
ভদ্দরলোকেরা ওরকম কত আজগুবি কথা কয়। আয়, বরং একটু ঘুমিয়ে নিই দুজনেই।
তাই ভাল। জেগে থাকলেই খিদে চাগাড় দেয়।
তৃতীয় দৃশ্য। বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক চারধারে পাগলের মতো পুঁথির নিরুদ্দেশ পাতাগুলি খুঁজছেন। এক আধটা পেয়ে যাচ্ছেন। হতাশায় মাথা নেড়ে বলছেন, না, না, সব মুছে গেছে। সব মুছে গেছে।
বুড়োটা কী খুঁজছে রে দিদি?
পাগল-টাগল হবে। ছেঁড়া ভেজা কাগজ কুড়োচ্ছে।
বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক এগিয়ে এলেন তাদের দিকে, ওহে, তোমরা একটা পুঁথির কিছু ছেঁড়া পাতা পেয়েছ কুড়িয়ে?
বড় জন হাই তুলে বলল, ঝড়বৃষ্টির সময় কতক উড়ে যাচ্ছিল দেখেছি। কাগজ কুড়িয়ে কী হবে? আমরা কি পড়তে জানি!
মূর্খ বালিকা। কী অমূল্য সম্পদ যে ওই কাগজের মধ্যে ছিল তা তোমরা জান না।
লটারির টিকিট নাকি রে পাগলা-বুড়ো?
তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। ওতে লেখা ছিল মানুষের মৃত্যুর প্রতিষেধক। মৃত্যুহীনতার মোহনায় মানুষকে পৌঁছে দিচ্ছিলাম আমি। বিধি বাম। মৃত্যুকে রোধ করা গেল না।
কী বলছে রে দিদি?
বলছে এমন ওষুধ বের করবে যাতে মানুষ আর মরবে না।
মরণ! একটু আগে ঝড়বৃষ্টির সময় ওই তালগাছে যে বাজটা পড়ল সেটা আমাদের মাথায় পড়লেও কি মরব না?
ওগো ও বিটলে বুড়ো, মানুষ মরবে না তো খাবে কী?
বৈজ্ঞানিক হতবাক হয়ে বললেন, তার মানে?
বলি মানুষকে যে বাঁচিয়ে রাখতে চাও তার খোরাকির জোগাড়টা আগে করে রাখ বাপু।
মূর্খ বালিকা, মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তি চাও না তোমরা?
দুই বোন হেসে গড়িয়ে পড়ল। বড় জন বলল, বেঁচে আছি কিনা সেটাই যে টের পেলুম না এখনও। আয় তো বিটলে বুড়ো, গায়ে একটা চিমটি কেটে দেখ তো বেঁচে আছি কিনা।
নাটকের নাম মুক্তিপণ। কিংবা ঠিক নাটকও নয়। ঈষৎ নাটকীয় গদ্য। কী এটা, কী সে বলতে চাইছে তা অমল নিজেও জানে না। কিন্তু কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে তার আজকাল এরকম কিছু কিছু লেখার ঝোঁক চেপেছে। শুরু হয়, কিন্তু প্রায়ই শেষ হয় না। তবে নানা ছদ্মবেশে এসব লেখার মধ্যে সে নিজে ঢুকে যায়, আর চলে আসে পারুল। পারুলের সঙ্গে কখনও আর কেউ মিশে যায়, যেমন তার নিজের আদলেও আসে অন্যের আদল।
অম্বালিকা কি পারুল? না, ওর মধ্যে সোহাগও রয়েছে কিছুটা। কীভাবে যে মিশে গেল দুজন কে জানে। ছয় সাত বছর আগে তাদের কলম্বাস শহরের বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল সোহাগ। তখনও সে নিতান্তই বালিকা। দশ এগারো বছর বয়স। এইলিন নামে একজন ব্রাজিলীয় মেয়ে আসত তাদের বাড়িতে। সে এক এজেন্সির মাধ্যমে বুডঢার বেবি সিটিং-এর কাজ পায়। সেই থেকে যাতায়াত। এইলিন প্রায়ই ব্ল্যাক ম্যাজিক হিপনোটিজম এবং অদ্ভুত সব বিষয়ে কথা বলতে ভালবাসত। ভুডুর প্রতি ছিল অমোঘ আকর্ষণ। সোহাগকে নিয়ে গিয়েছিল সে-ই।
সোহাগকে অপহরণের পরই বাড়িতে ফোন আসত যাতে তার খোঁজখবর করা বা পুলিশে জানানো না হয়। আশ্বাস দেওয়া হত, সোহাগকে নিরাপদে ফেরত দেওয়া হবে। উদ্বিগ্ন অমল আর মোনা পুলিশকে জানায়, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। এইলিনের চিহ্নও খুঁজে পায়নি তারা। দিন সাতেক বাদে এক ভোরবেলায় একটা গাড়ি সোহাগকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে যায়। যে সোহাগ ফেরত এল সে যেন ঠিক আগের সোহাগ নয়। একটু গম্ভীর, একটু ভাবুক, একটু বিষণ্ণ আর উদাসীন। অমল আর মোনা এবং পুলিশের লোকেরা তাকে প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার করেছে। সে নানা উলটোপালটা জবাব দিত। রেপ করা হয়েছে কিনা। তার ডাক্তারি পরীক্ষাও হয়। রেপ না হলেও তার গায়ে বিশেষ জায়গায় কয়েকটি উল্কি পাওয়া যায়। পুলিশ বলেছিল, কোনও ধর্মোন্মাদ গোষ্ঠীর কাজ। কথাটা হয়তো মিথ্যে নয়। সোহাগ গোপনে নানা প্রক্রিয়া করত, অদ্ভুত ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণ করত এবং কখনও কখনও তার অর্ধচেতন অবস্থা হত। অনেক সময় মধ্যরাত্রে সে নিশি-পাওয়ার মতো সারা ঘর ঘুরে ঘুরে নাচত। মোনা মাঝে মাঝে মারধরও করেছে ওকে। সোহাগের ই-মেল-এ কিছু অদ্ভুত ও দুর্বোধ্য বার্তা আসতে শুরু করেছিল। অমলের কলকাতায় ফিরে আসার কতকগুলো কারণের মধ্যে সোহাগও একটা কারণ।
সোহাগ ফিরল, কিন্তু তার সত্তার খানিকটা অংশ রয়ে গেল অন্য কোথাও, কোনও এক রহস্যময় গোষ্ঠীর কাছে। এখনও সোহাগের ই-মেল মার্কিং করলে সেই সব অদ্ভুত বার্তা পাওয়া যায়। কী যে হল মেয়েটার! কোন বিটকেল মানুষদের পাল্লায় পড়ল তার সমাধান আজও করতে পারেনি অমল রায়।
শ্ৰেষ্ঠীকন্যা অম্বালিকার মধ্যে পারুলই রয়েছে বটে, একটু সোহাগও আছে যেন। আর ওই বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক কি তারই প্রতিচ্ছবি নয়? স্বপ্ন আর সম্ভাব্যতার মধ্যে কী বিপুল ফাঁক? এখন সে মাসে এক কাঁড়ি টাকা মাইনে পায়। দেড় লাখেরও কিছু বেশি। দিল্লি বা বম্বে বা বিদেশে গেলে আরও অনেক বেশি পেত। কিন্তু শুধু টাকা রোজগারের যন্ত্র হওয়ার ইচ্ছে তো ছিল না তার। সে হতে পারত একজন আবিষ্কারক, একজন দার্শনিক বা না হয় একজন কবিই। এখন তার মনে হয় এত টাকাই তার সব সম্ভাব্যতা নষ্ট করে দিল। বানিয়ারা মগজ কিনে আনে, নষ্ট করে দেয়। এর চেয়ে কত ভাল ছিল গবেষণাগার, ভাল ছিল একাগ্র চিন্তার গৃহকোণ।
শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসের এ.সি. চেয়ারকারে বসে অমল রায় কিছুতেই ভারতের শিল্পমন্ত্রীর নামটা মনে করতে পারছিল না। গত কয়েক দিনে অফিসের বিভিন্ন মিটিংয়ে কয়েকবারই নামটা শুনেছিল সে। এখন কিছুতেই নামটা যে কেন মনে আসছে না। মনে করার কোনও জরুরি কারণও নেই। শরতের এই সুন্দর সকালে শিল্পমন্ত্রীর নাম নিয়ে কে-ই বা মাথা ঘামায়? কিন্তু সে ভিতরে ভিতরে অস্পষ্ট একটা তাগিদ টের পাচ্ছে, নামটা তার মনে পড়া উচিত। ইদানীং তার স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছে। সন্দেহ হয়, এখন ফের মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসলে, স্ট্যান্ড করা তো দূরের কথা, সে আদৌ সেকেন্ড ডিভিশনেও পাস করবে কিনা। আজকাল হঠাৎ যেন বিস্মৃতি এসে বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ায়, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, লোপাট করে দেয় মাথার যত প্রোগ্রামিং, যত ডাটা, যত ফাইল। কী যে হয় মাঝে মাঝে। যত দিন পরেই দেখা হোক, চেনা মানুষের মুখ দেখলেই তার নাম ঠিক মনে পড়ে যেত অমলের। মাসখানেক আগে একসঙ্গে ওয়ান থেকে টেন অবধি পড়া সহপাঠী এবং গলাগলি বন্ধু গৌরাঙ্গ যখন তার অফিসে দেখা করতে এসেছিল, কিছুতেই নামটা মনে পড়ল না তার। ঠিক বটে, গৌরাঙ্গর সঙ্গে মাধ্যমিকের পর আর দেখাই হয়নি। তবু তার স্মৃতিশক্তি কখনও এরকম ডিলিট হয়ে যায়নি কখনও। তিনটে ক্ষিপ্র জিনিস ছিল তার। ক্ষিপ্র চিন্তা, ক্ষিপ্র স্মৃতি, ক্ষিপ্র কাজ।
