একটা মাছি বিরক্ত করছে বারবার। নাকের ওপর, চোখের সামনে ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে, টাকের ওপর বসে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। বৈজ্ঞানিক বিরক্ত হয়ে পতঙ্গ নিধনের জন্য চামড়ার ফলক লাগানো শলাকাটি তুলে ফটাস করে মাছিটাকে টেবিলের ওপরে মেরে ফেললেন। অতি ব্যগ্রতায় ঝুঁকে পড়লেন পুঁথির ওপর।
একটা বাতাস এল জানালা দিয়ে। দমকা বাতাসের ঝটকায় পুঁথির জীর্ণ পাতা পট করে উলটে গেল। বৈজ্ঞানিক বিরক্ত হয়ে ধমক দিলেন, থামো! এ সময়ে বিরক্ত কোরো না।
দ্বিতীয় দমকা হাওয়াটি আরও একটু জোরালো। ফড়ফড় করে পুঁথির পাতা উলটে গেল কয়েকটা, বৈজ্ঞানিকের নোটবই পড়ে গেল মেঝের ওপর। কলম গড়িয়ে যেতে লাগল।
বৈজ্ঞানিক ধমক দিলেন, এসব কী হচ্ছে এ সময়ে?
তৃতীয় দমকা বাতাসটা এল হা-হা রবে প্রবল ঝঞ্ঝার বেগে, জানালা দরজার কপাট প্রবল ঝাপটায় আর্তনাদ করে উঠল। বৈজ্ঞানিক পাগলের মতো উঠে জানালা বন্ধ করতে গেলেন আর তখনই লুঠেরা বাতাস জীর্ণ পুঁথির পাতার বাঁধন ছিন্ন করে উড়িয়ে নিয়ে যেতে লাগল। বিপরীত জানালা দিয়ে কাটা ঘুড়ির মতো উড়ে যাচ্ছে পাতাগুলি, অমূল্য পাতাগুলি। বৈজ্ঞানিক আর্তনাদ করে উঠলেন, থামো ছিন্নপত্র, স্থির হও! আমার কাজটুকু শেষ করতে দাও দয়া করে।
কেউ শুনল না তাঁর কথা। বাইরের অন্ধকার মুক্তাঞ্চলে পাতাগুলি উড়ে যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক পাগলের মতো দরজা খুলে ছুটে গেলেন বাইরে। অসহায় চোখে চেয়ে দেখলেন, মহার্ঘ পাতাগুলি অন্ধকারে কোন অদৃশ্য ঠিকানায় ভেসে চলে যাচ্ছে, গাছের মগডালে, পুকুরের জলে, বিছুটি বনে, আকাশে। বজ্রপাত হল, মেঘ ডেকে উঠল গম্ভীর কণ্ঠস্বরে, প্রবল বৃষ্টি ছুটে এল তার অসংখ্য খরসান বল্লমে চতুর্দিক বিদ্ধ করতে করতে। বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।
শরীর কেঁপে উঠল বয়সের শীতে। বিধ্বস্ত বৈজ্ঞানিক ফিরে এলেন ঘরে। স্মৃতিভ্রংশ, স্থাণুর মতো বসে রইলেন নিজের আসনে। হাতে একটি পানীয়পাত্র। সেটি মুখে তুলতে ভুলে গেছেন। তাঁর চোখের জল ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়ছে পাত্রের ভিতরে।
দ্বিতীয় দৃশ্য। অন্ধকার মঞ্চে একটি নারীকণ্ঠ চিৎকার করে উঠল, আমি শ্রেষ্ঠীকন্যা অম্বালিকা। দুষ্কৃতীরা অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল আমাকে। নগরবাসীগণ, তোমরা অবহিত হও, আমার পিতা এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দিয়ে আমাকে মুক্ত করেছেন। দেখ, আমি অম্বালিকা, এক মহার্ঘ মেয়ে। আমার দাম কোটি টাকা।
মঞ্চ আলোকিত হল। গাছতলায় দুটি কাঙাল ভিখিরি মেয়ে বসে আছে। কিশোরী। মঞ্চের মাঝখানে একটি বেদির ওপর দাঁড়িয়ে শ্রেষ্ঠীকন্যা অম্বালিকা হাত তুলে জনতার অভিনন্দন গ্রহণ করছে।
কাঙাল মেয়েদের একজন আর একজনকে বলে, হ্যাঁ লা দিদি, এক কোটি টাকা কত টাকা রে?
তা কী জানি! হাজার টাকা অবধি জানি, তা সেও অনেক টাকা। গুণে শেষ করা যায় না।
আর মুক্তিপণটা কী বল তো!
ওই তো, একজনকে ধরে নিয়ে যায়, তারপর টাকা আদায় করে ছেড়ে দেয়।
ছোট মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমাদের কেউ ধরে নেবে না কখনও।
সে কথা বলিসনি, আমাদেরও মাঝে মাঝে ধরে বইকী। ভিক্ষে বা বেশ্যাবৃত্তি করাতে নিয়ে গিয়ে লাগায়। এই যে আমাদের রোগাভোগা, কালো চেহারা, মেয়ে-শরীর বলে মনেই হয় না, এই শরীরেরও কিছু ব্যবহার আছে। মেয়ে বলেই একটু-আধটু কাজে লাগি আজও। দুখানা রুটি একটু গুড় খাইয়ে আমাকেও একজন আধবুড়ো লোক ভোগ করেছিল।
আমাকে ভোগ করেছিল একজন মাতাল। আমার তুচ্ছ শরীর নিয়ে সে যখন ব্যস্ত ছিল তখন আমি তার পকেট থেকে টাকা তুলে নিই।
শ্ৰেষ্ঠীকন্যা অম্বালিকাকে ঘিরে ধরেছে সাংবাদিকরা। একজন বাঁচাল সাংবাদিক বলল, মুক্তির জন্য অভিনন্দন অম্বালিকা। দয়া করে বলুন, দুষ্কৃতীরা আপনাকে ধর্ষণ করেনি তো!
অম্বালিকা অবিচলিত হয়ে বলল, আমি এ কথার জবাব দেব না। আমি শুধু বলতে চাই, মুক্তি কীসের? কেমন মুক্তি? এক বন্দিদশা থেকে আর এক বন্দিদশায় গমন করা ছাড়া মেয়েদের কোনও মুক্তি কি কোথাও আছে? ভদ্রমহোদয়গণ, ওই দেখুন, দক্ষিণ দিকে একটু দূরে ওই দাঁড়িয়ে আছেন আমার প্রেমিক, আমি ওঁর বাগদত্তা। যখন আমাকে হরণ করা হয় তখন নগর-উদ্যানে মনোরম এক অপরাহে আমি ও আমার প্রেমিক বিশ্রম্ভালাপে রত ছিলাম। গদগদ ভাব, পরস্পরের শ্বাসবায়ুতে ঘটে যাচ্ছিল প্রগাঢ় ভালবাসার আশ্চর্য সংক্রমণ। সেই সময়ে সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা অস্ত্র উদ্যত করে আমাদের ঘিরে ফেলে। না, আমার প্রেমিক কোনও প্রতিরোধ করেননি। আত্মরক্ষা সকলেরই জীবনধর্ম। উদ্যত অস্ত্রের সামনে তাঁর কিছুই করার ছিল না। কোটি টাকা মুক্তিপণ দিয়ে আমাকে মুক্ত করা হয়েছে বটে, কিন্তু দেখুন, আমার প্রেমিকের মুখে কোনও হাসি নেই, আনন্দ নেই। বিষণ্ণ ও দ্বিধাগ্রস্ত মুখে ওই তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ওই বিষণ্ণতা অকারণ নয়। উনি চেয়েছিলেন এক শুদ্ধ ও অনাঘ্রাতা নারী। কিন্তু দুষ্কৃতীদের ডেরায় কী ঘটেছিল তা উনি জানেন না। আমার শুদ্ধতা নিয়ে উনি আজ বিচলিত, দোলাচলায়মান, দ্বিধাগ্রস্ত। পৌরাণিক সীতাই কখনও সন্দেহপাশ থেকে মুক্ত হননি, আমি তো সামান্যা নারী। ভদ্রমহোদয়গণ, আমি তাই প্রশ্ন করতে চাই, নারীর মুক্তিপণ এক ব্যর্থ প্রয়াস। তার মুক্তিই যে আদপে নেই। বরং ওই দেখুন, গাছতলায় ওই যে দুটি ভিখিরি মেয়ে বসে আছে. ওরাও আমার চেয়ে কত স্বাধীন, কত সুখী …
