তোর তো চিরকাল ভয়। সেই ছোট থেকে। আমার কাছে এসে থাকতে চাস সে তো খুব ভাল কথা। কিন্তু এই ফাঁকা বাড়িতে তো তোর আরও ভয় করবে।
ম্লান মুখে পান্না বলে, সেটাই তো প্রবলেম। তোমার কেন ভয় করে না বলো তো!
কাকে ভয় করব? ভূতপ্রেতকে! আমি নিজেই তো ভূতপ্রেতের কাছাকাছি চলে গেছি, আর ভয় করে কী হবে?
তুমি বড় জ্যাঠাকে দেখতে পাও?
না, তবে দেখতে পেলে ভয় পেতাম না। খুশিই হতাম।
তোমার দুর্জয় সাহস বড়মা। আর এই যে দেখছ সোহাগ, এরও খুব সাহস। রাতে একা একা বেরিয়ে পড়ে, জানো? বলে কী, ভূতেরা নাকি ওর বন্ধু! হিঃ হিঃ!
মেয়েটার দিকে তাকাল বলাকা। মুখের বিষণ্ণতাটা ভারী গভীর। পোশাকটাও ভাল নয় তেমন। রংচটা একটা ঢোলা ধুলোটে রঙের কামিজ আর একটা কালচে সালোয়ার। গায়ে কোথাও গয়নার চিহ্ন নেই।
বলাকা মৃদু স্বরে বলে, রাতবিরেতে একা একা বেরোনো ভাল নয়। গাঁ-গঞ্জেও পাজি লোক আছে।
মেয়েটা বড় বড় চোখ করে বলাকার মুখের দিকে চেয়ে ছিল। খুব এক নজরে। হঠাৎ বলল, আপনাকে দেখলে রিয়েল বলে মনেই হয় না, মনে হয় ম্যানেকুইন বা স্ট্যাচু।
এটা প্রশংসা না নিলে বুঝতে না পেরে বলাকা হেসে ফেলল, বলল, হ্যাঁ, এখন স্ট্যাচুই হয়ে গেছি। বোধবুদ্ধিও বোধহয় আর কাজ করে না।
মেয়েটা মাথা নেড়ে বলে, তা বলছি না, ইউ লুক হেভেনলি। আপনি তো পারুলের মা!
পারুলের মা শুনে একটু অবাক হল বলাকা। পারুল তো আর ওর সমবয়সি নয়। তবু রাগ হল না। সাহেবি কেতায় ওরকমই সব বলে বোধহয় ওরা। ঠিকঠাক সব হলে আজ তো পারুলেরই ওর মা হওয়ার কথা ছিল।
আজ মনে হয়, বিয়েটা না হয়ে বেঁচেছে পারুল। সবটুকু অবশ্য বাঁচেনি। মায়েরা অনেক কিছু টের পায়। বলাকাও পেয়েছিল। পারুল কিছুই ভেঙে বলেনি তাকে। তবু ঘটনা যে একটা ঘটেছিল এটা খুবই স্পষ্ট টের পেয়েছিল বলাকা। মা আর মেয়ের মধ্যে একটা লুকোচুরি চলছিল বটে, কিন্তু বলাকা নজর রেখেছিল, অঘটনের ফল কতদূর গড়ায়। গড়ায়নি, কিন্তু মর্মে গভীর আঘাত পেয়েছিল বলাকা।
কোনও কথাই সে কখনও স্বামীর কাছে গোপন করেনি। এক রাতে সে গৌরহরিকেও নিজের আশঙ্কার কথা বলে ফেলে। রাগী ও মেজাজি গৌরহরি সটান উঠে বসে বলেছিল, বলো কী? হারামজাদার এত সাহস!
গৌরহরিকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঠান্ডা করতে হয়েছিল। বলাকা বলেছিল, অমলকে শাসন করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে যে! চারদিকে রটে যাবে।
গৌরহরি ফুঁসছিল রাগে। গরগর করছিল। সেই পুরুষের রাশ ধরা বড় সহজ ছিল না তখন।
মেঘটা কেটে গিয়েছিল কয়েকদিন পর। তারপর পারুলই বেঁকে বসল, অমলকে বিয়ে করবে না। বলাকার মন থেকে ভার নেমে গিয়েছিল।
আজ মেয়েটাকে দেখে সেইসব পুরনো কথা একটা ঝটকা মেরে গেল যেন।
হ্যাঁ, আমি পারুলের মা। পারুলকে চেনো?
হ্যাঁ, চিনি। শি ইজ এ গডেস।
বলাকা হেসে ফেলে, সে কী? পারুল আবার গডেস কীসের?
ওকে আমার ওরকমই লাগে। আই অ্যাডোর হার।
বলাকা খুশিই হল। বলল, বেশ তো, ভালই তো।
সোহাগ আর আমি খুব বন্ধু হয়ে গেছি, জানো বড়মা? ও-ও একটু পাগল, আমিও একটু পাগল। তাই খুব মিল।
তাই বুঝি? তা কী পাগলামি করিস তোরা?
খুব হোঃ হোঃ হিঃ হিঃ করে হাসি, আবোলতাবোল কথা বলি, আচার চুরি করে খাই আর ক্যারিক্যাচার করি।
কিন্তু সোহাগের মুখে তো হাসির চিহ্ন দেখছি না। মুখখানা ভার কেন?
ও খুব চিন্তা করে যে!
কীসের চিন্তা?
সেটাই তো আমি বুঝতে পারি না। সব সময়ে কেবল ভাবে আর ভাবে।
এইটুকু বয়সে অত ভাবো কেন?
সোহাগ মৃদু হেসে মাথাটা নোয়াল।
পুজো অবধি কি থাকবে তোমরা?
সোহাগ উদাস মুখে বলে, কী জানি!
তোমাদের তো কয়েকদিন আগেই চলে যাওয়ার কথা ছিল, শুনেছিলাম।
হ্যাঁ, বাবা হঠাৎ জরুরি কাজে লন্ডন গেছে, তাই আমরা আর যাইনি, কলকাতায় আমার হেলথ হ্যাজার্ড হয়।
সেও যেন শুনেছিলাম। ভালই তো, থাকো। আজ তোমার পছন্দের পারুলও আসবে। সেও পুজো অবধি থাকবে বলেছিল। মাঝে মাঝে এসে গল্প-টল্প করে যেও।
হঠাৎ হি হি করে হেসে পান্না বলে, ও কী বলে জানো বড়মা? বলে, আমি যদি পারুলের মেয়ে হতাম তো খুব ভাল হত।
বলাকার মনটায় একটা ধাক্কা লাগল। হঠাৎ এ কথা বলে কেন মেয়েটা? এরকম ভাবা তো স্বাভাবিক নয়?
আলগা গলায় বলাকা জিজ্ঞেস করে, তাই নাকি সোহাগ?
কথাটার জবাব না দিয়ে সোহাগ হঠাৎ বলল, আপনার নামটা খুব অদ্ভুত, না?
কেন বলো তো!
বেশ আধুনিক নাম।
মোটেই না। রবীন্দ্রনাথ বলাকা লিখেছিলেন সেই কবে। সেই থেকেই তো বাবা আমার নাম রেখেছিল বলাকা। পড়েছ বলাকা?
ঘাড় হেলিয়ে সোহাগ বলে, হ্যাঁ। মেলিতেছে অঙ্কুরের পাখা, লক্ষ লক্ষ বীজের বলাকা। ইট ইজ ফ্যানটাস্টিক।
এ কথায় মুগ্ধ হল বলাকা। না, ততটা সাহেবি চাল নেই তো!
কী খাবে বলো তো!
ফের ঘাড় হেলিয়ে বলল, এনিথিং, এখানে সবাই খুব খাওয়াতে ভালবাসে, না?
বলাকা স্মিত মুখে বলে, খাওয়ানোর মধ্যে একটা আদর থাকে তো!
সোহাগ হাসিমুখেই বলল, আমার মাও আমাকে খুব খাওয়াতে চায়। কিন্তু তার মধ্যে আদরটা থাকে না।
.
০৯.
প্রথম দৃশ্য। বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক জীবনের উপান্তে পৌঁছে গেছেন। জরাজীর্ণ শরীর, বিরলকেশ মাথা, বেশবাসের ঠিক নেই। মধ্য রাতে বৈজ্ঞানিক একটি পুরনো, প্রকাণ্ড, কীটদষ্ট, জীর্ণ পুঁথির ওপর ঝুঁকে বসে আছেন। উত্তেজনায় তাঁর হাত-পা কাঁপছে, চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে অতি পঠনের ফলে, বুক ধড়ফড় করছে আবেগে। জরাজীর্ণ এই প্রাচীন পুঁথির ভিতরেই তিনি নানা সংকেত পেয়ে যাচ্ছেন এবং জীবনের বহু সাধনা, অধ্যবসায়, অনেক বিনিদ্র রাত্রি ও বিশ্রামবিহীন দিন কাটিয়ে অবশেষে তিনি তাঁর অভীষ্টের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন প্রায়। এই বিরল, অজ্ঞাত পুঁথির ভিতরেই লুকোনো রয়েছে মানুষের অমরত্ব লাভের বীজ। আর কয়েকটি পৃষ্ঠা অতিক্রম করলেই সেই বাতিঘর, যা মৃত্যুর অন্ধকার মহাসাগরে মানুষকে অনন্তকাল বেঁচে থাকার গুপ্তমন্ত্রের সন্ধান দেবে।
