এই যে আজ তার ছেলেমেয়েরা আসবে, নাতি-নাতনিরা দামাল পায়ে সারা বাড়ি দাপিয়ে বেড়াবে, হাসিখুশি হইহট্টগোল হবে এসব ভালই লাগবে বলাকার। ভর ভরন্ত সংসার কার না ভাল লাগে? তবু সব থেকেও বুকের একটা পাশ যেন চিরকালের মতো ফাঁকা হয়ে গেছে। ওইখানে অন্ধকার আর হু হু করে বিরহের বাতাস বহে যায় সারাক্ষণ।
ভালবাসা কারে কয়? দশ বছর বয়সের বালিকা কামবোধহীনা বলাকা তা জানতই না। আবার মেয়েদের সহজ সংস্কারবশে জানতও। সে এক জানা না-জানার রহস্যময় আলো-আঁধারিতে তাদের শুভদৃষ্টি। ঘুমকাতুরে বলাকার বিছানায় এক প্রাপ্তবয়স্ক অচেনা পুরুষ-তার তথাকথিত স্বামী। পনেরো বছর বয়সের তফাত। দেহ জাগেনি, মন জাগেনি। রজোদর্শনও হয়নি তখনও। তার শোওয়া খারাপ ছিল বলে লোকটা তাকে সযত্নে পাশ ফিরিয়ে দিত। পাছে চঞ্চলতাবশে ঘুমের ঘোরে খাট থেকে পড়ে যায় সেই জন্য বারবার উঠে পাশবালিশের ব্যারিকেড ঠিকঠাক করে দিত। আর টাইফয়েডের সময় তো কোলে তুলে বাথরুমেও নিয়ে গেছে। টাইফয়েডের যখন বাড়াবাড়ি যাচ্ছে তখন আর বাথরুমে গিয়ে বসবার ক্ষমতাও ছিল না বলে বেডপ্যান দিত ওই লোকটাই। এসবের ভিতর দিয়েই বুনে ওঠে ভালবাসা। তার অত বাহার নেই, রোমান্স নেই, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে এমন বজ্ৰবাঁধন তৈরি করে যে আর জোড় ভাঙে না কখনও, ভালবাসা কি শুধু উথালপাথাল ঝড় জল, নাকি উথলে-পড়া দুধ, নাকি বর্ষায় ফুলে ফুলে ছেয়ে যাওয়া কদম গাছ, নাকি সুফলা বছরে সম্পন্ন গৃহস্থের ধানের গোলা, সে কি সেতারের মির, নাকি আশ্চর্য সুগন্ধ কোনও? না না, ওরকম নয়। ওরকম নয় কিছুতেই। দুটো নারী পুরুষের সম্পর্কই তো শুধু নয়, তার মধ্যে শ্বশুর-শাশুড়ি, দেওর-ননদ, গোরু-ছাগল, পাখি-পশু, খরা বন্যা, কাঙাল-ভিখিরি কত কী ঢুকে পড়ে এসে। সহবত, নিয়মকানুন, অভদ্রতা ভদ্রতা–সব মিলিয়ে সম্পর্ক কি সোজা কথা? তারা যেন এক কুলি আর এক কামিন সযত্নে খেটেপিটে রচনা করেছিল এই সংসার। কাজ ভাগ করা ছিল, দায় ছিল, দায়িত্ব ছিল।
দশ বছর বয়সে বিয়ে। একটি সমর্থ পুরুষের ছায়ায় সে ক্রমে ক্রমে বয়ঃসন্ধি পেরোল। তার সংযত পুরুষটি স্ত্রীর যৌবন সমাগমের জন্য অপেক্ষা করেছিল, কখনও নিয়ম ভাঙেনি কোনও। পৌরুষের অন্যায্য জোর খাটায়নি কখনও। তার কাম কখনও ছিল না অন্ধ ও বধির। দীর্ঘকায়, গৌরবর্ণ, অতীব সুপুরুষ এই লোকটি কখনও ছিল বাবার মতো স্নেহশীল ও প্রযত্নপরায়ণ, কখনও ছিল বন্ধুর মতো বিশ্বস্ত দোসর, কখনও নির্জন রাতে গোপনে হ্যারিকেন জ্বেলে ষোলো গুটি খেলতে খেলতে হয়ে যেত তার সঙ্গী খেলুরি। বলাকা বুঝতেই পারেনি, লোকটি তার কে? শুধু বুঝত, একে ছাড়া তার চলে না।
তারপর ক্রমশ শরীরে বন্যার জল এল তার, কূল ভাসিয়ে। কানায় কানায় ভরে এল সে। এক পাগল বর্ষার রাতে হ্যারিকেনের নিবু নিবু আলোয় মানুষটার মুখের দিকে চেয়ে হঠাৎ যেন চিনতে পেরেছিল তাকে বলাকা। দুটি লীলায়িত হাতে তার কণ্ঠ বেষ্টন করে লজ্জায় মরে গিয়ে খুব আস্তে বলেছিল, এবার…।
সেই রাতের কথা মনে পড়লে আজও এই বাহাত্তর বছরের শরীর ও মনে একটা ঝংকার ওঠে, রক্তে নুপুর বেজে যায়। বিবশ হয়ে যায় মন। সে তো শুধু কাম নয়, সে এক অপার্থিব নিবেদন। একটি চুম্বন গড়ি, দোঁহে লই ভাগ করি, এ বিশ্বে মরি মরি এত আয়োজন। এ হল সেই পৃথিবীর কথা যখন দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করতেন। যখন শরীর জুড়ে শঙ্খধ্বনি আর জোকার শোনা যেত।
বড়মা! ও বড়মা।
দুটি টইটুম্বুর চোখ তুলে দরজাটা বড্ড আবছা দেখল বলাকা। গলার স্বরটা অবশ্য চেনা।
আয়। দুদিন আসিসনি তো! কী হয়েছিল?
পান্নার সঙ্গে ওর বয়সি একটা মেয়ে। চোখের জলটা আঁচলে মুছে ভাল করে দেখল বলাকা। ভারী ফুটফুটে চেহারার মেয়ে। কিন্তু মুখটা বড় দুঃখী।
কাঁদছিলে নাকি বড়মা? জ্যাঠার কথা মনে পড়লে আমারও যে কী ভীষণ কান্না পায়!
কষ্ট করে একটু হাসল বলাকা।
কিন্তু অনেক কেঁদেছ বড়মা। আর কেঁদো না। অজ্ঞান হয়ে জ্যাঠার খাট থেকে পড়ে গিয়েছিলে সেদিন, মাথা কেটে রক্তারক্তি। কী ভয় পেয়েছিল সবাই।
বলাকা একটু হেসে বলল, তবু তো মরিনি। তার আগেই যে কেন গেলাম না সেই দুঃখ কি কম? আয় বোস সামনে। তোকে একটু দেখি।
সঙ্গে কাকে এনেছি বলো তো! চেনো একে?
বলাকা একটু তাকিয়ে থেকে বলল, অমলের মেয়ে না?
ও মাঃ চিনলে কী করে, আগে দেখছ কখনও?
না রে। শুনেছি ওরা গাঁয়ে এসেছে। তা ছাড়া ওর মুখে অমলের মুখের আদল আছে।
মেয়েটা এগিয়ে এসে একটু আড়ষ্টভাবে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ বলল, আচ্ছা, আমি কি আপনাকে প্রণাম করব?
না, না, প্রণাম করতে হবে না, একটা মোড়া টেনে নিয়ে বোসো।
মোড়াতে নয়, মেয়েটা ঝুপ করে মেঝেতেই বলাকার মুখোমুখি বসে পড়ল। পাশে পান্না।
কী করছিলে বড়মা? আজ তো তোমার খুব আনন্দ, না? সবাই আসছে।
বলাকা হেসে বলল, আনন্দ তো বটে মা, কিন্তু ফের যখন চলে যাবে সবাই, তখন আমি যে একা সে-ই একা।
ও বড়মা, বাবাকে বলো না, আমি এসে তোমার কাছে থাকি।
থাকবি?
এত বড় বাড়িতে তুমি একা একা থাকো, তোমার ভয় করে না?
বলাকা হেসে বলে, ভয়! ভয়টা কীসের?
আমার যা ভয়! বাব্বাঃ, ভয়ে যেন মরে যাই। মাঝে মাঝে এমন হয়, যেন ভয়ে হার্টফেল হয়ে যাবে।
