বাঙালি শশব্যস্তে উঠে হাতজোড় করে রাম রাম দিয়ে এক গাল হাসল, তবিয়ত ঠিক আছে তো মাতাজি?
আছি একরকম বাবা। তা তোর কী খবর? বিয়ে পাকা করে এলি নাকি?
ভারী লজ্জা পেয়ে মাথা নত করে বাঙালি বলে, ঠিকঠাক তো সব আছে। আমি বলেছি কী, শাদি এখুন হোবে, গাওনা দশ বরষ বাদ।
দশ বছর বাদে দুখুরি যে কলেজে পড়বে সে খেয়াল আছে তোর? পাত্র তো লেখাপড়াই জানে না ভাল করে।
হাঁ হাঁ, কেন জানবে না, উ ভি ইস্কুলে পড়ছে। পাস ভি দিবে।
ও তোর বানানো কথা। বিয়ে দিবি দেশওয়ালির সঙ্গে, দুখুরি তো দেহাতি ভাষা বলতেই পারে না।
তো কী আছে মাতাজি? বাংলা বলবে। রণবীর ভি বাংলা বলতে পারে।
তোকে তো বলেছি, দুখুরিকে আমায় দিয়ে দে। ওর ভাবনা তোকে ভাবতে হবে না। বিয়েও আমিই দেবো। কথাটা কেন পছন্দ হচ্ছে না তোর?
উ বাত তো ঠিক আছে মাতাজি। লেকিন ননীবাবুর দুকানটা শম্ভুবাবু লিয়ে লিবে। ভৈঁষওয়ালা ভি বলছে আর দেরি হলে মুশকিল।
আঠারো বছর বয়সের আগে মেয়ের বিয়ে দিলে জেল খাটতে হয় তা জানিস?
যেন খুব একটা হাসির কথা হয়েছে, এমনভাবেই হাসল বাঙালি, হাঁ, উ তো বাবুলোগদের জন্য আছে। মুলুকমে উরকম শাদি হরবখত হচ্ছে।
তা জানি বাবা। তোরা আইনকানুন একটুও মানিস না। কিন্তু মেয়ে যদি থানায় যায় তা হলে বিপদে পড়বি। দুখুরির একটুও মত নেই বিয়েতে।
ভারী অবিশ্বাসের সঙ্গে চেয়ে থাকে বাঙালি, থানায় যাবে? থানায় যাবে দুখুরি?
তুই বেশি চাপাচাপি করলে যাবে না তো কী? তোকে দেখলেই মেয়েটা ভয় পায় কেন রে?
বাঙালি উবু হয়ে বসে পড়ল। মাথায় হাত। দুখুরি থানায় যাবে, এতটা ভাবেনি বাঙালি। খইনির থুতু গিলে ফেলায় একটা দুটো হেঁচকি উঠল তার।
বলাকার একটু মায়া হল। বলল, শোন মুখপোড়া, দুখুরি এখন আমার কাছেই থাকবে। বড় মায়া পড়ে গেছে আমার। দোকান আর মোষ কেনার টাকা আমি তোকে দেবো। কিন্তু টাকা নিবি লেখাপড়া করে। পরে ফের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে কিন্তু বিপদে পড়বি। বুঝেছিস?
খুব বুঝেছে বাঙালি। তাড়াতাড়ি হাতজোড় করে বলে, রাম কি কৃপা মাতাজি। দুকানটা আর ভৈঁষটা হলে হামার আর কুছু লাগবে না।
মনে থাকে যেন। কখানা ভাল বিস্কুট রেখে যা। আমার নাতি-নাতনিরা দিশি বিস্কুট খেতে ভালবাসে। খাস্তা দেখে দিস বাবা।
বাঙালি বিস্কুট নিয়ে ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
গৌরহরি চাটুজ্যে দুঁদে উকিল হলেও বিষয়বুদ্ধি তেমন ছিল না। খরচের হাত ছিল বড্ড বেশি। এ নিয়ে বলাকার চাপা ক্ষোভ ছিল। স্বামী-স্ত্রীতে কখনও ঝগড়াঝাঁটি বা মন কষাকষির বালাই ছিল না তাদের। গৌরহরির কথাই সুপ্রিম কোর্ট। তবু এ নিয়ে মাঝে মাঝে মৃদু একটু-আধটু অনুযোগ কখনও তুলেছে বলাকা। গৌরহরি জবাবে বলত, ভার কমাও বলাই, ভার কমাও। নইলে মরার সময় বড় কষ্ট হবে যে!
বলাই বলে বলাকাকে ডাকার আর কেউ নেই। ঠাট্টার ওই ডাক আজও যেন কানকে স্নিগ্ধ করে দেয়। আর কী আশ্চর্য, গৌরহরি চলে যাওয়ার পর বলাকারও যেন টাকাপয়সা, বিষয় সম্পত্তির ওপর টান হঠাৎ ছিঁড়ে খুঁড়ে গেল। জেটি থেকে স্টিমার যেন পৃথক হয়ে ভেসে আছে। কোনও বাঁধন নেই। তাই দোনোমোনো করেও টাকাটা বাঙালিকে কবুল করে ফেলল বলাকা। সামান্যই টাকা। তার তো অভাব নেই। গৌরহরি অনেক রেখে গেছে, তার ওপর ছেলেরা পাঠায়, মেয়েরা পাঠায়। টাকা কোন কাজে লাগে তার? চাল ডাল সবজি কিছুই কিনতে হয় না তাকে। বরং ধান, সবজি, দুধ, সর্ষে এসব বিক্রি করেও বেশ টাকা পায় সে। কটা টাকা দিয়ে যদি মা-মরা মেয়েটার মুখে হাসি ফোটানো যায়।
ঘরে এসে ফের আলমারির সামনে বসে বলাকা। চারদিকে ডাঁই করা সব শাড়ি, শায়া, ব্লাউজ।
কমলা গলা নিচু করে বলে, গয়নাগুলোও কি সব দিয়ে দিচ্ছ মা?
কেন বল তো!
নিজের হাতের পাতের কয়েকখানা রেখো।
গয়না দিয়ে করব কী? ওসব আপদ বিদেয় করাই ভাল। শেষে চোরে ডাকাতে নেবে।
তুমি যেন কেমনধারা হয়ে যাচ্ছ। কর্তাবাবা মরল তো তুমি যেন যোগিনী হলে। এমন দেখিনি।
দুর মুখপুড়ি। বুড়ো বয়সে কি গয়না পরে বসে থাকব নাকি?
তাই বললুম বুঝি। বলছি, গয়না তো একটা সম্বল। সোনা-দানা হাতে রাখে না মানুষ?
তা রাখে। দুর্দিনের ভয় পায় বলে রাখে, লোভেও রাখে। আমার সেসব নেই। আমার আসল গয়নাই চলে গেল তো সোনা-দানা দিয়ে কী হবে?
আসল গয়না যে কে তা কমলা জানে, কালী জানে। গাঁয়ের লোকও জানে।
কমলা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, একটা মটরদানা হার ছিল না তোমার! সেই যে ডায়মন্ড কাটা মটরদানা গো, কী ঝিকমিকই না করে!
হ্যাঁ। কর্তা দিয়েছিলেন। খয়রাশোলের বড় মামলাটা জিতে খুব আনন্দ হয়েছিল। তাই দিয়েছিলেন।
ওইটে রেখো। তোমাকে বড় সুন্দর দেখায়।
দুর! গলায় একটা চেন পরি, এই যথেষ্ট। মেয়েরা, বউমারা খালি গলায় থাকতে দেয় না বলে পরি। আর এই হিরের আংটিটা। এটা ঝন্টু চাকরি পেয়ে দিয়েছিল, তাই খুলিনি। ব্যস, আর কিছু রাখব না।
উঠোনে একটা শোরগোল উঠল। দুজন মুনিশ পুকুরে জাল ফেলেছিল। মস্ত একটা কাতলা তুলে এনে উঠোনে ফেলেছে।
দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে মাছটা দেখল বলাকা। পাকা কাতলা, এখনও কানকো নড়ছে। তার কি মাছ দেখে লোভ হয়? একটুও হয় কি?
মুখটা ফিরিয়ে নিল বলাকা। না, তার কোনও লোভ নেই। একটা মানুষের সঙ্গে সঙ্গেই যেন চলে গেল ওসব। এখন আঁশটে গন্ধে তার গা গুলোয়।
