গৌরহরি খুব অবাক। একটু হেসে বলল, কী করে টের পেলে?
অভিমানভরে বলাকা বলেছিল, আমি পাবো না তো কে টের পাবে?
গৌরহরির মুখটা হ্যারিকেনের আলোতেও উদ্ভাসিত দেখাচ্ছিল। পোর্টম্যান্টো খুলে শাড়ির প্যাকেটটা বের করে তার হাতে দিয়ে বলল, ইংরিজি মতে বিয়ের তারিখ পার হয়ে গেছে। কিন্তু দিশি মতে এখনও পেরোয়নি। শাড়িটা পরো।
এই শাড়ির দাম কে দেবে? কে জানবে এ-শাড়ির প্রতিটি সুতোয় কত ভালবাসা জড়িয়ে আছে! সেই প্রথম গৌরহরি তাকে মেয়েমানুষের দাম দিল। হয়তো সেদিনই তাকে প্রথম বউ বলে মনে হল তার।
চোখের জল মুছে শাড়িটা কমলার হাতে দিয়ে বলল, এটা আলমারিতে তুলে রাখ।
কালী বলল, কেন যে তুমি থান পরো তা বুঝি না। আজকাল বিধবারা অত মানে না তোমার মতো। সাদা খোলের শাড়ি পরলেই তো হয়।
বলাকা জবাব দিল না। বড় দেওরের ছেলে বিজুটা বড্ড ফচকে। সেদিন এসে বলল, ও বড়মা, থানটা কি বিধবাদের জার্সি নাকি? তুমি কি জানো যে, থান পরলে তোমাকে পাথরপ্রতিমা বলে মনে হয়?
আজকাল বিধবারা অম্বুবাচী করে না, কেউ কেউ মাছমাংসও খায় এসবও বলছিল বিজু। বলাকা হেসে বলল, আর বলিসনি রে ছেলে। বিধবারা তো বিয়েও করছে। আমরা সেকেলে লোক, আমাদের ছেড়ে দে বাবা, আর একেলে করে তুলবার চেষ্টা করিসনি।
না বড়মা, তোমাকে আর মানুষ করা গেল না। তবে থাকো তুমি দেবী-টেবী হয়ে।
পুরনো শাড়িগুলোর প্রত্যেকটার গায়েই একটা করে গল্প আর ঘটনা জড়িয়ে আছে। আছে দীর্ঘশ্বাসও। কয়েকটা বেছে আলমারিতে তুলে রাখল বলাকা। কোনওদিন পরবে না আর, শুধু মাঝে মাঝে নেড়ে-চেড়ে দেখবে।
ও মা! কথা কানে যাচ্ছে না তোমার?
চোখ তুলে দুখুরিকে দেখে বলাকা বলে, কী হয়েছে?
বলছি না, বাবা এসেছে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ গো, উঠোনে বসে খইনি ডলছে।
তাতে কী হল?
ফের বিয়ের কথা বলবে যে! আজ খুব বকে দাও তো!
বিয়ের কথা বলবে কী করে বুঝলি?
খুব জানি। আমাকে বেচে দোকান আর মোষ কিনবে।
ব্যাপারটা সবাই জানে। তবু কমলা আর কালী খুব হাসছিল। বলাকা হাসল না, দুখুরির বয়স এখন দশ-এগারো, ঠিক যে বয়সে তার নিজের বিয়ে হয়েছিল। দেহাতে এখনও এই বয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। পরে গাওনা হয়। কিন্তু মুশকিল হল, দুখুরি তার বাপের মতো দেহাতের মানুষ নয়। পাঁচ ছয় বছর বয়সে তার মা মারা যাওয়ার পর বাঙালি রাম কাহার মেয়েটাকে বলাকার কাছে গচ্ছিত করে দিয়ে নিজে আর একটা বিয়ে করে। গত পাঁচ ছয় বছরে দুখুরির গায়ে অন্য হাওয়া লেগেছে। সে এখন লেখাপড়া করে, ইস্কুলে যায়, চারদিকটা দেখে এবং বুঝতেও পারে, দেহাতি নিয়ম চাপালে চলবে কেন?
কিন্তু বাঙালিরও কিছু বক্তব্য আছে। মাত্র হাজার খানেক টাকা হলে সে ননী পালের দোকানঘরটা নিতে পারে। আরও হাজার দুয়েক পেলে একটা বাচ্চা মাদী মোষ কিনবার জো হয় তার। শুধু বেকারির দিশি বিস্কুট বেচে অত বাড়তি টাকা ফেলবার উপায় নেই। কিন্তু দুখুরির বিয়ে দিলে দু-আড়াই হাজার তার হাতে আসে। পাত্রও প্রস্তুত। বর্ধমানের পান-বিড়িওলা লছমন দাসের ছোট ছেলে রণবীর। কথা হয়ে আছে। তাই কিছুকাল যাবৎ ঘুরঘুর করছে বাঙালি। মেয়েকে নিজের অধিকারবলে টেনে নিয়ে যাবে তেমন তাকত নেই তার। চাটুজ্যেদের প্রতিপত্তির কথা সে জানে। সহিষ্ণুতা এবং বিনয়বচন আর কাকুতিমিনতি ছাড়া তার অন্য পথ নেই। দুনিয়া যে অনেক এগিয়ে গেছে, মেয়েদের যে আর ধরে বেঁধে বিয়ের ফাঁস পরানো যায় না এসব খবর সে রাখে না। সে শুধু সাদাসাপটা হিসেবটা বোঝে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলে তার দোকানঘর আর একটা মোষ হয়ে যায়। আর এটা হলে তার অনেক দিনের স্বপ্নটাও সার্থক হয়।
বলাকা বলল, অত ভয় পাস কেন? আমি তো আছি। বাঙালিকে তো বলেছি তোর বিয়ে আমি দেবো।
তবে কেন ঘুরে ঘুরে আসে বলো তো! আজ ভাল করে বকে দিও।
তোকে অত ভাবতে হবে না, ভাল করে ঘরদোর ডাস্টিং কর।
দুখুরি চলে গেলে মায়াভরে দরজাটার দিকে চেয়ে থাকে বলাকা। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, বাঙালিকে তিন হাজার টাকা দিয়ে দুখুরিকে রেখেই দেয়। কিন্তু একজন উঁদে উকিলের ঘর করে বলাকার কিছু বাস্তববুদ্ধি হয়েছে। সে জানে টাকা নিয়ে আপাতত মহানন্দে চলে যাবে বটে বাঙালি, কিন্তু কিছুদিন বাদে ফের টাকায় টান পড়লে এসে হাজির হবে। ফের ঘ্যান ঘ্যান করবে। এ এক জ্বালা!
দুখুরি যে খুব কাজের মেয়ে তা নয়, ফাঁক পেলেই খেলতে লাগে। ঘুমোনোর নেশা আছে। কাজের জন্য নয়, দুখুরি বলাকার একটা সম্বল। ফাঁকা বাড়িতে ও সারাদিন কাছেপিঠে থাকে, ডাকলে সাড়া দেয়। কত কথা কয় বসে বসে। বলাকার এখন জনের অভাব।
তা বলে কি বাঙালিকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিতে পারে বলাকা? পারে না, কারণ যত দূরের মানুষ হোক, বাঙালির তো পিতৃত্বের একটা অধিকার আছেই।
খইনিটা মজে এসেছে। শেষ কয়েকটা তালি লাগিয়ে আর একটু ডলে বাসু আর গোকুলকে ভাগা দিয়ে নিজেরটুকু ঠোঁটে ফেলল বাঙালি। হ্যাঁ, জমেছে। মুখে দিতেই মনটা যেন খুশ হয়ে গেল।
গোকুল বলল, ও বাঙালি, উঠোনে থুথু ছিটোস না যেন। মা দেখলে আস্ত রাখবে না।
আরে নেহি বাবা, উঠানমে কৌন থুক ফেলবে?
দোতলা থেকে বলাকাকে নামতে দেখে গোকুল আর বাসু পালাল।
কী রে বাঙালি, কিছু বলবি?
