গিন্নিমার ঘরে ঢুকেই দুখুরি কাঁদুনে গলায় বলল, ওই আবার এসেছে গো, দ্যাখো গে।
বলাকা চট্টোপাধ্যায়ের বয়স এখন বাহাত্তর চলছে। শরীরে এখনও মেদের সঞ্চার নেই। সাদা থানে গৌরবর্ণা বলাকাকে অনেক সময়ে মানবী বলে মনে হয় না। শোকের একটা গাম্ভীর্য তাকে আরও একটু অবাস্তব দূরত্বে নিয়ে গেছে। ছেলেমেয়েরা কেউ কাছে নেই। একা বাড়ি আগলে তার পড়ে থাকা। এই দুখুরি, রাঁধুনি বামনি, কাজের মেয়েরা, মুনিশ, দু-চারটে কাজের লোক, পাড়া-প্রতিবেশী, জ্ঞাতিরা, কিছু স্মৃতি, কিছু চিহ্ন আর বস্তুপুঞ্জ নিয়ে তার বাস। এই আগলে থাকা ভাল লাগে না বলাকার। একটা মানুষ যতদিন ছিল ততদিন সেই মানুষটার জন্যই এত ফাঁকা লাগত না কখনও। তার স্বামী গৌরহরি চট্টোপাধ্যায় মেজাজি, প্রতাপশালী, খেয়ালি এক মানুষ। তবু সারা জীবন বলাকার কাছে ওই মানুষটাই ছিল যেন সবচেয়ে বেশি। ওই মানুষটাকে ছাড়া যে বেঁচে আছে বলাকা তাতেই সে ভারী অবাক হয়ে যায়। ওকে ছাড়া একটা দিনও কাটবে বলে কখনও ভাবেনি। অথচ অবাক কাণ্ড, এখনও বলাকা বেঁচেই আছে দিব্যি।
ঝন্টু আর মন্টু তাকে নিজেদের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য টানাটানি করে। বকুল, পারুল, জামাইরা সবাই তাকে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু কোথাও যেতে ইচ্ছেই হয় না তার। মানুষটা নেই, কিন্তু তার শ্বাসপ্রশ্বাসটুকু যেন এখনও আছে।
স্টিলের আলমারি খুলে আজ শাড়ির ডাঁই বের করে মেঝেয় পাতা মাদুরে জড়ো করেছে বলাকা। কমলা আর কালী সাজিয়ে রাখছে থাকে থাকে। কত শাড়ি তার। গৌরহরি কোনও বড় মামলায় জিতলেই একটা শাড়ি বা গয়না আনত। এইভাবে জমেছে মেলা, অনেকগুলো তো পরাই হয়নি আজ অবধি। বলাকা গুণে দেখেছে বেনারসিই আঠারোখানা, পিওর সিল্ক অন্তত পঞ্চাশটা, গরদ কম করেও বারোটা, তাঁত আর সিন্থেটিকের হিসেব নেই।
দুই মেয়ে আর দুই বউমাকে এ সবই আজ ভাগ করে দেবে বলাকা। কোনটা কাকে সেই নিয়েই কথা হচ্ছে। কমলা পুরনো লোক, তার টান বেশি বকুল আর পারুলের ওপর। ভাল শাড়িগুলো সে ওদের ভাগে ফেলতে চাইছিল। বলাকা বলল, তাই কি হয়? বউমারা কী ভাববে তা হলে?
বলাকা আবার একথাও ভাবে, ওদের কারও তো কম নেই। এসব পুরনো শাড়ি-টাড়ি পেয়ে খুশি হবে তো? নাকি মনে মনে নাক সিঁটকোবে?
একখানা ডুরে শাড়ি বেরোল এক ডাঁই শাড়ির তলা থেকে। সাদা খোলের ওপর টানা লাল সবুজ নীল ডুরে। তেমন কোনও বাহারি শাড়িও নয় এবং বহরে একটু খাটো। শাড়িটা এত পুরনো যে সাদা রংটা হলদেটে হয়ে গেছে। তেমন মজবুতও নেই আর, টানাহ্যাঁচড়া করলে ফেঁসে যাবে। শাড়িটা কোলে নিয়ে একটু বসে রইল বলাকা। চোখে জল আসি-আসি করে যে!
দশ সাড়ে দশ বছর বয়সে বিয়ে হল পরিপূর্ণ যুবক গৌরহরির সঙ্গে। বলাকা তখন মেয়েমানুষই হয়ে ওঠেনি ভাল করে। ভয়ে আধমরা। আর বরটি এত ছোট্ট একটা বউ পেয়ে মোটেই খুব স্বস্তিতে ছিল না। নাক সিঁটকে বলত, এ বাবা এর তো এখনও নাক টিপলে দুধ বেরোয়! গৌরহরি তাকে তার বউ বলেই ভাবতে পারত না। স্বামীর বিছানাতেই শুত বটে সে, কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মতো নয়। ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছোঁড়ার অভ্যেস ছিল তার, গৌরহরি তাই খ্যাপাত, ঘুমের ভান করে তো দিব্যি লাথি ঘুষি চালাও দেখছি! ভীষণ লজ্জা পেত বলাকা। তেরো বছর বয়স অবধি ওরকমই চলেছিল। প্রাপ্তবয়স্ক এক পুরুষের পাশে একটি নাবালিকাই মাত্র ছিল সে। তেরো বছর বয়সে একবার টাইফয়েড হয়ে বলাকার যায়-যায় অবস্থা। তখন গৌরহরি তাকে বেডপ্যান দিত, জামাকাপড় পালটে দিত। লজ্জায় আজও মরে যায় বলাকা। কিন্তু গৌরহরি তখনও তাকে তো মেয়েমানুষ হিসেবে দেখতেই শুরু করেনি। বিয়ের পর চার বছরের মাথায় একদিন গৌরহরি একটা মামলার কাজে কলকাতা যাচ্ছে। সেই রাতে তার ফেরার কথা নয়। কিন্তু হঠাৎ বলাকা তাকে বলে বসল, আজ ফিরবে কিন্তু, আজ আমাদের বিয়ের তারিখ। গৌরহরি অবাক হয়ে বলল, তাই নাকি?
তখন বৈশাখ মাসের শেষ। দুদিন পরই সংক্রান্তি। সেই দিন সন্ধের পর এক ক্ষ্যাপা মহিষের মতো মেঘ উঠল আকাশে। সেই সঙ্গে এক অতিকায় কালবোশেখী। জীবনে ওরকম ভয়ংকর ঝড় বলাকা আর দেখেনি। চারদিকে যেন মধ্যরাতের অন্ধকার ঘনিয়ে উঠল, আর পাগলা মোষের মতোই ছুটে এল ঝড়। উপড়ে পড়তে লাগল গাছ, উড়ে গেল আশপাশের চালের টিন। গোরু, কুকুর, হাঁসমুরগিদের যে কী প্রাণান্তকর আর্তনাদ! আর সেই সঙ্গে শাঁখের শব্দ, মানুষের চেঁচামেচি। সেই প্রচণ্ড ঝড় আর বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট গেল ভেসে, গাছ উপড়ে পড়ে চলাচল বন্ধ।
খুব ভাবছিল বলাকা। জানালায় দাঁড়িয়ে কেঁদেছিল অঝোরে। এই ঝড়ের দিনে সে লোকটাকে ফিরতে বলে দিয়েছে, যদি ফেরে তা হলে কোন অপঘাত ঘটে তার ঠিক কী?
ভয়টা অমূলক ছিল না তার। বউয়ের কথার দাম রাখতে প্রবল ঝড়ের সূচনা দেখেও গৌরহরি হাওড়ায় এসে ট্রেন ধরেছিল। বর্ধমান পৌঁছতে সময় লেগেছিল অনেক। তারপর ওই ডাকাবুকো মানুষটা সেই ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রাঘাত মাথায় করে হেঁটে অতিক্রম করেছিল গোটা পথ। চারবার আছাড় খেয়ে, ভিজে, জলকাদা মেখে যখন বাড়ি পৌঁছেছিল তখন ভোর চারটে। ঘুমকাতুরে বলাকা সেই রাতে ঘুমোতেই পারেনি। দু চোখ সটান মেলে শুয়ে শুয়ে শুধু ঠাকুর-দেবতাকে ডেকেছে। গৌরহরি উঠোনে পা দিতেই কী করে যেন সে-ই টের পেয়েছিল তার মানুষটা এসেছে। কড়া নাড়ার আগেই দরজা খুলে দিয়ে সে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল, তুমি এসেছ?
