আই ফিল দেম। আই ইভন সি দেম।
মহিম অবাক হয়ে বলে, কী দেখেছ তুমি?
আমার মনে হয় লক্ষ লক্ষ বছর ধরে যেসব মানুষ মরে গেছে তাদের প্রত্যেকের একটা করে ইমপ্রেশন রয়ে গেছে অ্যাটমোসফিয়ারে। আই সি দেয়ার শ্যাডোজ, আই ফিল দেয়ার প্রেজেন্স।
সেটা কীরকম দিদিভাই, বুঝিয়ে বলো।
তারা তো আমাদের মতো নয়, তারা কেউ নেইও। কিন্তু তাদের ইমপ্রেশন, তাদের অনেক কথাবার্তা, অনেক সময় তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসও টের পাই এবং মাল্টিচুডস অব দেম।
তুমি যে আমাকে চিন্তায় ফেললে দিদি। তোমার এরকম হয় কেন?
আমি তা জানি না। আমার বন্ধুরা কেউ ভূতে বিশ্বাস করে না, তারা শুনলে অবাক হয়। বলে অল বোগাস।
হয়তো তুমি খুব ভালো বলেই ওসব কল্পনা মাথায় আসে।
মে বি৷ আই হ্যাভ এ ভেরি স্ট্রং ইমাজিনেশন। কিন্তু আমার মনে হয় আমি ভুল দেখি না। ভূতকে অনেকে ভয় পায়। আমার একটুও ভয় করে না, আমার মনে হয় দে আর মাই ফ্রেন্ডস, মাই বেস্ট ফ্রেন্ডস।
চিন্তিত ও শঙ্কিত মহিম রায় ভোরের আবছা আলোয় তার এই প্রায় অচেনা নাতনিটির মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, তুমি মাঝে মাঝে আমার কাছে এসো। আমি তোমার কথাগুলো আরও একটু বুঝতে চেষ্টা করব।
কিন্তু বিশ্বাস করবে না তো? আমার কথা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না।
মহিম একটু হাসল, পৃথিবীতে কত রহস্যই যে আছে, সব কি উড়িয়ে দেওয়া যায়? না দিদি, আমি তোমার কথাগুলো নিয়ে ভাবব। হয়তো বিশ্বাসও করব, কে জানে! এই বুড়ো বয়সে খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় যে মানুষ মরে গেলেও একেবারে শেষ হয়ে যায় না। তার কিছু একটু থেকে যায়।
এসব কাল ভোররাতের কথা। আজ এই ভোররাতে বিছানায় মশারির মধ্যে বসে অ্যালার্ম ঘড়ির শব্দ শুনতে শুনতে কত ভাবনাই যে সিনেমার ছবির মতো মাথার ভিতরে ভেসে ভেসে যায়। মাঝে মাঝে যতিচিহ্নের মতো মৃত্যুর কথাও মনে পড়ে।
অচেনা অমল এবং ততোধিক অচেনা অমলের বউ, ছেলে, মেয়ে এদের সঙ্গে তার একটা সেতুবন্ধন হল কি? সেতুটি ওই ছিটিয়াল, বায়ুগ্রস্ত, চঞ্চলমতি সোহাগ। ঠিক বুঝতে পারছে না মহিম, সেতুবন্ধনটি টিকে থাকবে কিনা।
মশারি তুলে পাকাপাকি উঠে পড়ল মহিম। প্রাতঃকৃত্য, বাসি ছাড়া, ঠাকুরঘর সারা, ফুলহোলা, পুজোয় বসা।
তার মাঝখানেই নিস্তব্ধ ভোরে বজ্রাঘাতের মতো রতনের মোটরবাইক গর্জে উঠল। পাঁচটা বাজে। বুডঢাকে অবশেষে স্টেশনে পৌঁছে দিচ্ছে রতন, দুর্গা, দুর্গা।
রতন আর তার মোটরবাইক যেন দুটো জিনিস নয়। একটাই। যেন মোটরবাইকে করেই জন্মেছিল রতন। দিনরাত সে ওটায় চড়ে ঘুরছে, মোটরবাইক ছাড়া রতনকে আজকাল ভাবাই যায় না, মাঝে মাঝে বলে, যখন মোটরবাইকে চড়ে থাকি তখন নিজেকে আমার চে গুয়েভারা, ফিদেল কাস্ত্রো, জোসেফ স্তালিন, মাওসেতুং কত কী মনে হয়, মনে হয় আমি একজন লিডার, একজন পায়োনিয়ার।
কিন্তু ওরা কি মোটরবাইকে চড়তেন?
তা কে জানে। মোটরবাইকে চড়লে আমি ওরকম কেউ হয়ে যাই।
বন্ধুরা বলে ভটভটিয়া রতন। মোটরবাইকই ওর হাত পা মগজ। কাউকে জরুরি খবর দিতে চাও, অসময়ে হঠাৎ কিছু আনতে চাও বাজার থেকে, কাউকে কোথাও পৌঁছে দিতে চাও, রতন সঙ্গে সঙ্গে রাজি, মোটরবাইকে যতই তাকে দৌড় করানো হোক তার ক্লান্তি নেই।
মহিম রায় উঠোনের একধারে পাতা কাঠের চেয়ারে এসে বসল, বাঁ ধারে বাঁশবনের ফাঁকফোঁকর দিয়ে অন্ধকারকে ঝাঁঝরা করে দিয়ে আলো আসছে।
আরও একটা দিন। আরও এক পা এগিয়ে যাওয়া।
.
০৮.
আশি চুটকি, নব্বে তাল তব জানিয়ো খইনিকে হাল। খইনি মজানো কি সোজা কথা রে বাপু? দু চারবার ডলেই ঠোঁটে ফেলে দিলেই হল? ও হল চাষাড়ে জিনিস, ধকের চোটে ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত চমকে ওঠে। খইনির গভীরে যে প্রাণরস আছে তাকে টেনে বের করা চাই তো। সেই মোলায়েম নেশা শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে চনমনে করে তোলে মানুষকে। হ্যাঁ, তবে তার জন্য ধৈর্য চাই। পরিমাণমতো চুনটুকু দিয়ে মশলা, মলো, মলো। ফিন তালি লাগাও। চুণা উড়েগা, ধূল উড়েগা। ফিন মলো, মলো, মলো। ফিন তালি লাগাও–হাঁ। আশি চুটকি, নব্বে তাল, তব জানিও খইনিকে হাল…
উত্তরের দাওয়ায় বসে খইনিটাকে মজিয়ে ফেলেছে প্রায় বাঙালি। বাঙালি রাম কাহার। পাশে বিস্কুটের কাঁচ লাগানো টিন। দাওয়ার নীচে ছাড়া মোটা চামড়ার ধুলিধূসর একজোড়া শস্তা জুতো। বাঙালির পরনে হেঁটো জনতা ধুতি, গায়ে মোটা কাপড়ের পিরান। মাথা ন্যাড়া, মস্ত টিকি, খইনি ডলতে ডলতে তার চোখ এখন ভাবালু।
হাত চারেক তফাতে উঠোনে উবু হয়ে বসে আছে গোকুল আর বাসু। তারা মুখ চোবলাচ্ছে, জিব রসস্থ, ভারী উন্মুখ হয়ে চেয়ে আছে বাঙালির দিকে। ব্যাটা খইনিটা বানায় বড় ভাল। মিহি, মোলায়েম, খুব সোয়াদ। তবে বড় সময় নেয়। গোকুলের কাজ বেশির ভাগই গোয়ালঘরে। তিনটে গোরুকে মাঠে খোঁটায় বেঁধে এসে গোয়াল পরিষ্কার করেছে এতক্ষণ। এই একটু হাঁফ ছাড়ার সময়। বাসু বাগান সামলায়। নিড়েন দিতে দিতে উঠে এসেছে বাঙালিকে দেখে। দুজনেই কিছু উশখুশ। কিন্তু বাঙালিকে হুড়ো দিয়ে লাভ নেই। তার মনের মতো না হওয়া ইস্তক সে খইনির ভাগা দেবে না।
রুখু চুলের খোঁপায় আজ একটা কলাবতী ফুল গুঁজেছিল দুখুরি। হাঁসের ঘর থেকে বারোটা ডিম বের করল। আজ তার মনে একটু আনন্দ ছিল সকাল থেকেই। মেলা লোক আসবে আজ। দুই দিদিমনি, দুই দাদাবাবু, তাদের বরেরা, বউয়েরা, ছেলেমেয়েরা। আজ খুব হই-চই লেগে যাবে বাড়িতে। দুখুরি তাই ঘরদোর পরিষ্কার ন্যাকড়া দিয়ে মুছছিল। টেবিল, চেয়ার, তাক, জানালার গরাদ, দরজার পাল্লা। ওই জানালা দিয়েই সে তার বাপকে দেখেছিল একটু আগে। অমনি মনটা খারাপ হয়ে গেল। ওই যে এসেছে তার যম।
