বাগানে বেশি দূর ঢুকতেও হয় না, সামনেই শিউলি ফুলের ঝুপসি গাছ। নীচে অজস্র ফুল পড়ে থাকে ভোরবেলা। সেগুলো পুজোয় লাগে না। বোঁটা-খসা ফুল অনেক আটকে থাকে পাতায় আর ডালপালায়। ফুল তুলতে গিয়ে আচমকা তার চোখ গিয়ে পড়ল বাগানের মাঝখানে। কেন যে তার চোখই পড়ল। সাদাটে ঢিলা পোশাক-পরা স্থির মূর্তিটা দেখে আঁতকে ওঠবারই কথা তার। কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল বলে একটু চমকাল মাত্র।
কে ওখানে? সোহাগ নাকি?
না আজ মেয়েটা সেদিনের মতো আচ্ছন্ন নেই। মহিমের সাড়া পেয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
দাদু!
ভারী অবাক হল মহিম। এর আগে কখনও দাদু বলে ডেকেছে কি না মনে পড়ল না। ডাকটা শুনেই তাই ভাল লাগল।
তুমি ওখানে কী করছ ভাই?
সোহাগ এগিয়ে এল কাছে, তুমি রোজ ভোরে ওঠো বুঝি?
মহিম বলে, হ্যাঁ। ওখানে কী করছিলে?
এমনি দাঁড়িয়েছিলাম। ট্রায়িং টু ফিল দি ওয়ার্ল্ড।
তোমার পায়ে জুতো বা চটি নেই কেন দিদিভাই?
চটি পরলে আই ক্যান্ট ফিল দি আর্থ।
কিন্তু কাঁটা ফুটতে পারে তো!
ফুটলেই বা!
আর শুঁয়োপোকা, সাপ এসবও তো থাকতে পারে।
আমার একটুও ভয় করে না।
মহিম স্নেহভরে বলে, তোমার গাছপালা ভাল লাগে বুঝি?
ভীষণ। মাঝে মাঝে ভাবি, ইস আমি যে কেন গাছ হয়ে জন্মালাম না।
ঠান্ডা লাগবে দিদিভাই, গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে এসো গিয়ে।
একদিন তো মানুষের কোনও পোশাক ছিল না। তখন কীভাবে থাকত মানুষ?
মহিম একটু থতমত খেয়ে বলে, সেসব তো আদ্যিকালের কথা দিদিভাই। তখন মানুষের ইমিউনিটি ছিল।
এখন নেই?
না, মানুষের অভ্যাস পালটে গেছে।
পোশাক একটা বাধা।
মহিম বড্ড অবাকের পর অবাক হচ্ছে, মেয়েটার কি একটু মাথার দোষ আছে?
দিক বসন কাকে বলে জানো দাদু?
হ্যাঁ, দিক বসন মানে আবরণহীন। দিকই যার বসন।
আমি জানি। কথাটা খুব সুন্দর, না?
ওসব ঠাকুর-দেবতার ব্যাপার দিদিভাই। মানুষের ক্ষেত্রে খাটে না।
ইট হ্যাজ এ মেসেজ, এ মেসেজ ফর হিউম্যানিটি।
মহিম প্রমাদ গুনছিল। বিদেশে নুডিস্ট কলোনি আছে বলে শুনেছে সে। মেয়ে-পুরুষ ন্যাংটা হয়ে ঘুরে বেড়ায়। পাগলের কাণ্ড সব। এ মেয়েটা তাদের খপ্পড়ে পড়েনি তো রে বাবা! বিদেশে যে কত কুশিক্ষাই আছে!
মেয়েটা কি তার মনের কথা শুনতে পেল? স্বগতোক্তির মতো করে বলল, তা বলে আমি নুডিস্ট নই, দে আর এ স্যাড অ্যান্ড পারভারটেড লট। আমার শুধু মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে চারদিকটাকে সমস্ত শরীর দিয়ে শুষে নিতে।
একটু পাগুলে ব্যাপার আছে মেয়েটার। মহিম বলল, এ নিয়ে তোমার সঙ্গে একদিন কথা বলব। এখন শিশির পড়ে তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে।
আমি ইমিউন হওয়ার চেষ্টা করছি।
ওসব কি সইবে তোমার? শুনেছি তোমার একটা অ্যালার্জি আছে।
হ্যাঁ, কিন্তু গাছপালার মধ্যে আমি তো ভাল থাকি।
গাছপালা তো ভালই, কিন্তু বিপদের কথাও খেয়াল রাখতে হয়, এটা ঋতু পরিবর্তনের সময়।
তুমি একজন খুব কারেজিয়াস লোক!
মহিম তটস্থ হয়ে বলে, আমি! কে বলল তোমাকে? না দিদিভাই, আমি একটা ভিতু লোক।
তুমি সেদিন আমাকে কাঁধে করে অনেক দূর থেকে নিয়ে এসেছিলে। অ্যান্ড ইউ আর অ্যান অকটোজেনেরিয়ান।
বিপদে পড়লে মানুষ বাঁচার তাগিদে অনেক কিছু করে। কিন্তু দিদিভাই, তোমার যে বড্ড সাহস! একা একা ওভাবে ঘুরে বেড়াও কেন?
মেয়েটা হাত উলটে বলে, জানি না।
তুমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলে।
মেয়েটা মাথা নেড়ে বলে, সামটাইমস ইট হ্যাপেন।
তুমি কি রোজ এত ভোরে ওঠো?
না, কখনও কখনও আমি বেলা আটটা-নটাতেও উঠি, কিছু ঠিক নেই। মাঝে মাঝে রাতে আমার ঘুম আসে না।
এই বয়সে ঘুম আসে না কেন?
ভাবতে ভাবতে মাথা গরম হয়ে যায়।
কী ভাবো তুমি?
মাই রিলেশন উইথ দিস ভাস্ট ইনফাইনিট ইউনিভার্স। আরও কত কী, ভাবতে ভাবতে আমি উঠে বসে থাকি, তারপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি।
কিন্তু তাতে যে বিপদ হতে পারে।
হিহি করে একটু হাসল সোহাগ, সেই হাসিতে ওর শৈশব ফুটে উঠল যেন। বলল, কাল রাত দুটো-আড়াইটার সময় আমি উঠে নীচে নেমে আসি। তারপর হেঁটে হেঁটে কোথায় কোথায় যে চলে গেলাম।
সর্বনাশ!
কিন্তু কিছু বিপদ হয়নি তো, আমার সঙ্গে তোমাদের ওই কালো কুকুরটা ছিল।
কতদূর গিয়েছিলে?
অনেক দূর, আমি তো এ-জায়গাটা ভাল চিনি না, জঙ্গল-টঙ্গল মাঠঘাট দিয়ে অনেক হেঁটে তারপর একটা হাইরোডে উঠে দেখলাম, ট্রাক যাচ্ছে, তখন ফিরে আসি।
কী করে ফিরলে?
কুকুরটাই পথ দেখিয়ে নিয়ে এল, যখন এসে কোর্ট ইয়ার্ডে ঢুকছি তখন–ওই যে ওই ঘরে যিনি থাকেন–উনি কে বলো তো! জেঠিমা না?
হ্যাঁ, উনি তোমার জেঠিমা।
উনি হঠাৎ ভয় পেয়ে চোর, চোর বলে কাকে যেন ডাকছিলেন। আমি তখন জানালার কাছে গিয়ে বললাম, আমি চোর নই, আমি সোহাগ। উনি খুব অবাক হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, মাঝরাতে একা মেয়েছেলে এলোচুলে ঘুরছ যে বড়! হাওয়া বাতাস লাগবে যে! ঘরে যাও।
উনি ঠিকই বলেছেন।
হাওয়া বাতাস লাগার কথাটা আমি বুঝতে পারিনি। তুমি জানো?
অস্বস্তিতে পড়ে মহিম বলে, উনি বোধহয় ভূতপ্রেতের কথাই বলতে চেয়েছেন। গাঁয়েগঞ্জে তো অনেক সংস্কার থাকে।
সংস্কার মিনস সুপারস্টিশনস?
হ্যাঁ, এসব জায়গায় মানুষকে মাঝে মাঝে নাকি ভূতে পায়। ওসব বিশ্বাসযোগ্য নয়।
কিন্তু আই বিলিভ ইন গোস্টস।
মহিম একটু হাসল। বলল, কেন বিশ্বাস করো?
