ওমাঃ ঠিক বলেছ তো! আমারও মাঝে মাঝে মনে হয়, এত খাটাখাটনিতে কত সময় চলে যাচ্ছে, দুনিয়াটাকে টেরই পাচ্ছি না।
সোহাগ স্মিত মুখে বলে, কিন্তু তোমার কাজটা আমার বেশ ভাল লাগছে।
কেন বলো তো? একাজ আবার কীসের ভাল?
ইউ আর উইথ নেচার। ডুয়িং এ জব অফ ইওর ওন।
বাংলা করে বলো। বুঝতে পারি না যে! তোমার সব কথা আমার বুঝতে ইচ্ছে করছে।
মনে হয় তুমি তোমার কাজটাকে প্যাশোনেটলি ভালবাসো। তাই না?
সন্ধ্যা এবার এক গাল হাসে, কথাটা ভুল বলোনি। করতে করতে কাজটা এখন খারাপ লাগে না।
ওটাই তো আসল কথা। আমরা যে কাজ করতে ভালবাসি তা আমাদের করতে দেওয়া হয় না। ক্যারিয়ার আমাদের সব নষ্ট করে দেয়। নো লাভ ফর লাইফ, নাথিং।
দোতলা থেকে মোনার গলা পাওয়া যাচ্ছিল, সোহাগ! সোহাগ, আর ইউ হিয়ার সামহোয়ার? প্লিজ কাম আপস্টেয়ার্স। ডিনার ইজ রেডি।
সন্ধ্যা বলল, যাও, তোমার মা ডাকছে।
সোহাগ উঠে পড়ল, যাই পিসি৷
সন্ধ্যার কান জুড়িয়ে গেল পিসি ডাক শুনে। মনটা হালকা লাগল, খুশির বাতাস লাগল বুকটায়। পিসি বলে ডেকেছে এতদিনে। পিপাসাটা তার বুকের ভিতরে লুকিয়ে ছিল এতদিন।
নীলিমা বলল, তোমার ভাইঝিটা পাগলি আছে দিদি।
সন্ধ্যা মাথা নেড়ে বলে, ও তুই বুঝবি না। কত ভাল কথা বলে গেল। ওইটুকু তো বয়স, এক রত্তি মাথায় কত চিন্তা করেছে দেখলি! বড় ভাল মেয়ে।
.
কুক কুক করে ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজছে। মৃদু কিন্তু খর শব্দ। এ-শব্দ গভীর ঘুমের ভিতর ঠিক ঢুকে যেতে পারে। ঘুম না ভাঙিয়ে ছাড়ে না।
আগে এসব অ্যালার্ম ছিল না। মহিমকে তার বাবা একখানা ঘড়ি কিনে দিয়েছিল, রোজ দম দিতে হত কটর কটর করে চাবি ঘুরিয়ে। তার অ্যালার্ম ছিল ঝনঝনে। সাইকেলের বেলের মতো বেজে থেমে যেত, তাতে ঘুম ভাঙলে ভাল, না ভাঙলে ঘড়ির কিছু করার নেই। আজকাল এসব কোয়ার্টজ ঘড়ির আওয়াজ অন্যরকম। কানে নয়, যেন আঁতে গিয়ে ঢুকে পড়ে।
অ্যালার্মটা বাজছে দোতলায়, মেজো বউমার ঘরে, ভোর পৌনে চারটের গভীর নিস্তব্ধতায় শব্দটা চারদিকে যেন ছুরির ফলার মতো বারবার ঢুকে যাচ্ছে।
মহিমের ঘুম ইদানীং এমনিতেই পাতলা। শেষরাতে ঘুম আরও মিহি হয়ে আসে। চারটে থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে উঠে পড়ে সে।
আজ বুডঢা কলকাতা যাবে। বর্ধমান থেকে ভোর ছটায় একটা লোকাল আছে, সেইটে ধরবে। খবরটা মহিমের জানার কথা নয়। যাওয়াআসার স্বাধীনতা ওদের তো আছেই। জিজ্ঞাসাবাদ অনুমতি নেওয়া ইত্যাদির বালাই নেই।
কাল রাত দশটা নাগাদ হঠাৎ মোনা–অর্থাৎ মোনালিসা তার ঘরে এসে হাজির। বাবা বলে ডাকে না কখনও। কালও ডাকেনি। তবে বেশ নরম গলায় বলল, বুডঢা আজ কলকাতা থেকে এসেছে। খুব টায়ার্ড। কিন্তু কাল সকালেই ওকে কলকাতা ফিরতে হবে।
মহিম কথাটার প্যাঁচ ধরতে না পেরে তাকিয়ে ছিল। বুডঢা যে কলকাতা থেকে এসেছে, এ খবরটাও তার জানা নেই, যেমন জানা নেই বুডঢা এখান থেকে কলকাতা গিয়েছিল কবে।
মোনা বলল, মুশকিল হয়েছে ট্রেনটা খুব ভোরে। ছটায়। এখান থেকে অত ভোরে বাস বর্ধমান যায় কি না কে জানে। কিন্তু ট্রেনটা ওকে ধরতেই হবে। সকাল সাড়ে নটায় ওর কম্পিউটার ক্লাস।
মহিম তাকিয়ে ছিল। বুঝতে পারছিল, আসল কথাটা এর পর আসবে।
মোনা এবার বলল, কমলদার ছেলে রতনের তো মোটরবাইক আছে। ওকি সকালে একটু বুডঢাকে স্টেশনে পৌঁছে দিতে পারবে?
এ কথাটা মহিমকে জিজ্ঞেস করার মানেই হয় না। যার মোটরবাইক তাকে জিজ্ঞেস করলেই হত। মহিম মৃদু গলায় বলল, রতনের সঙ্গে কি বুঢডার আলাপ পরিচয় নেই?
মোনা একটু অপ্রতিভ হল কি? ফর্সা রংটা যেন একটু রাঙা হয়ে গেল। বলল, আসলে ওরা ভাইবোন তো তেমন মিশুকে নয়।
মিশুকে নয়–এ কথাটা মিথ্যে। ওরা ও-বাড়ির লোকজনকে মেশবার যোগ্য বলেই মনে করে না। কিন্তু কথাটা তো আর বউমাকে বলা যায় না। মহিম বলল, স্টেশনে পৌঁছে দেওয়াটা তো কোনও ব্যাপার নয়। নিশ্চয়ই দেবে। আমি বলে দেবোখন।
মহিম এটুকু বলেই চুপ করে গিয়েছিল।
মোনা একটু দ্বিধাগ্রস্ত ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, কথাটা হয়তো রতনকে আমারই বলা উচিত ছিল। কিন্তু আমাদের মধ্যে তেমন রাপো তৈরি হয়নি বলে বলতে সংকোচ হচ্ছে।
একটু হাসল মহিম। বলল, সংকোচের কোনও কারণই ছিল না। আপনজনই তো। বললেই পারতে। ওরা তাতে খুশিই হত।
মোনা বলল, আপনি বললে বলব। তবে রতন তো বাড়িতে থাকেই না, অনেক রাতে ফেরে শুনেছি। কমলদাকে বলতে পারতাম, কিন্তু তিনি আজ কোথায় যেন গেছেন, রাতে ফিরবেন না।
ওঃ, ঠিক আছে, রতনকে আমি বলে দেব।
মোনা চলে যাওয়ার পর মহিম রায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। টানা প্রায় পনেরো-ষোলো দিন এখানে আছে, তবু কেন যে পর্দাটা এখনও টেনে রেখেছে, কোথায় বাধছে, কোথায় বাধক হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে না। মেজো বউমার সঙ্গে ভাসুর কমলের একটু আলাপ আছে বটে, কিন্তু সম্পর্কটা ফাইফরমাশের। মহিমের ছেলেদের মধ্যে কমলই একটু ব্যক্তিত্বহীন এবং ভালমানুষ। আত্মসম্মানের বালাইও নেই তেমন। উপযাচক হয়ে সে-ই ওদের খোঁজখবর নেয়, গায়ে পড়ে কাজ করে দেয়। আর কেউ ওদের ছায়াও মাড়ায় না।
মহিম খুব ভোরেই ওঠে। পরশুদিনও উঠে প্রাতঃকৃত্য সেরে ঠাকুরপুজোর ফুল তুলতে বাইরে বেরিয়েছিল। বেশি দূর যেতে হয় না, ঘরের পিছনেই বাগান। সকালে তখনও অন্ধকার ঝুলে আছে চারদিকে, কুয়াশা আছে, ঠান্ডা ভাবও আছে, একটু পাতলা আলোর আভাসও আছে, কাক ডাকছিল, দূরে একটা মোরগও ডেকে উঠল। রোজকার মতোই ভোর। নতুন কিছু নয়।
