সন্ধ্যার সব কাজেই খুব যত্ন। পরিষ্কার চকচকে মস্ত মেটে হাঁড়ি থেকে বড় হাতায় কাসুন্দি তুলে ফানেল দিয়ে শিশিতে ভরছিল সে। ছিপি লাগানোর একটা ছোট হাতযন্ত্র কিনেছে সে, দুটো মেয়ে সেই যন্ত্রে পটাপট ছিপি আটকে দিচ্ছে। যাতে কেউ নকল করতে না পারে তার জন্য পিলফার প্রুফ করার ব্যবস্থা। ব্যবস্থাটা অবশ্য খুবই দুর্বল, কিন্তু খদ্দেররা আজকাল এসব চায়।
সোহাগ উঠে এসে সন্ধ্যার কাছে দাঁড়িয়ে কাণ্ডটা দেখছিল। ওর গা থেকে একটা মৃদু সুঘ্রাণ আসছে। বিদেশি সেন্ট।
সন্ধ্যা একটু লাজুক মুখে বলল, এইসব নিয়েই বেঁচে আছি, বুঝলে? আমি তো লেখাপড়া শিখিনি।
সারাদিন তুমি খুব কাজ করো, না?
তাকে শেষ অবধি সোহাগ তুমি বলছে দেখে ভারী খুশি হল সন্ধ্যা। বুক থেকে যেন একটা ভার নেমে গেল। গতকাল অবধি মেয়েটাকে কী ঘেন্নাই করত। এখন বড্ড মায়া হচ্ছে। আর মায়াবশে অন্যমনস্ক ছিল বলে হাতের শিশি ভরে একটু কাসুন্দি উপচে পড়ল। হেসে সন্ধ্যা একটা ন্যাকড়ায় হাত মুছে নিয়ে বলল, হ্যাঁ। গতরে খাটুনির কাজ। আর তো কিছু জানি না।
সোহাগ খুব কৌতূহল নিয়ে ছিপি আটকানোর যন্ত্রটা দেখছিল। বলল, ওই যন্ত্রটা তো খুব মজার।
ওটা দিয়ে ছিপি আটকায়। এসব তো আধুনিক কল নয়, শস্তার জিনিস।
এ-ঘরটায় কেমন সুন্দর একটা গন্ধ!
তোমার ভাল লাগছে বুঝি? এসব হচ্ছে মশলার গন্ধ। বোসো না, গল্প করি। তোমাদের সঙ্গে তো ভাল করে আলাপই হল না। ওই মোড়াটা টেনে বোসো।
সোহাগ লক্ষ্মী মেয়ের মতো বসল।
আমলকী খেতে এলে না তো আজ!
আমলকীর একটা ল্যাটিন নাম আছে বোধহয়। জানো?
সন্ধ্যা হেসে ফেলে, না। এসব ল্যাটিন-ট্যাটিন কি আমি শিখেছি?
আমিও জানি না।
এক প্যাকেট নিয়ে গিয়ে কাছে রেখো। শুনেছি আমলকীর অনেক উপকার।
আমি কি রোজ তোমার কাজে একটু হেলপ করতে পারি?
সন্ধ্যা ফের হাসে, শোনো কথা! এসব মৈষালি কাজ, এসব কি তুমি পারো?
ওই যে তুমি একটা কাঠের জিনিসে মশলা গুঁড়ো করো ওটা আমি পারব।
না গো মেয়ে, ওসব তোমাকে করতে হবে না। তোমার মা রাগ করবে।
মা তো সব ব্যাপারেই রাগ করে। তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
তুমি মাঝে মাঝে এসে গল্প কোরো, তাহলেই হবে।
কিন্তু আমার কিছু করতে ইচ্ছে করছে। আই ওয়ান্ট টু কিপ মাইসেলফ বিজি।
সন্ধ্যা মায়াভরে মেয়েটার দিকে একটু চেয়ে থেকে বলল, একটু একঘেয়ে তো লাগবেই। এসব গাঁগঞ্জ জায়গা তো, তাই তোমার বোধহয় ভাল লাগে না।
একটা ঝটকা মেরে মাথা নাড়া দিয়ে মেয়েটা বলে, না না, শহর আমার একদম সহ্য হয় না। আমি তো গ্রামই ভালবাসি। তার চেয়েও ভালবাসি জঙ্গল।
ও হ্যাঁ, শুনেছিলুম শহরে থাকলে তোমার নাকি শরীর খারাপ করে। কীরকম অসুখ হয় তোমার?
ওটা একটা অ্যালার্জি। পলিউশন থেকে হয়।
তা হলে তো মুশকিল। পড়াশুনো করতে তো শহরেই থাকতে হবে।
পড়াশুনো করতে আমার ভাল লাগে না।
ওমা! সে কী? শুনেছি তুমি খুব ভাল ছাত্রী!
না তো! আমি একদম ভাল ছাত্রী নই। আমার ভাল লাগে শুধু হিস্টরি আর ন্যাচারাল সায়েন্স। ক্লাসের পড়া হিসেবে নয়।
সন্ধ্যা কী বলবে ভেবে পেল না। পড়াশুনোর কথা উঠলেই সে জব্দ। তবু সে বলল, তা হলে তুমি কী করবে?
মেয়েটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে একটা অসহায় ভঙ্গি করল। তারপর মৃদু স্বরে বলে, আমি যা করতে চাই তা তো আমাকে কেউ করতে দেয় না।
কী করতে চাও তুমি?
মৃদু একটা দুষ্টু হাসি খেলে গেল সোহাগের মুখে। তারপর বলল, বলব?
বলোই না!
আমার ইচ্ছে করে খুব গভীর জঙ্গলে গিয়ে সব পোশাক খুলে ফেলে ঘুরে বেড়াই।
এ কথা শুনে কাজের মেয়েরা খিলখিল করে হেসে উঠল।
সন্ধ্যা একটা ধমক দিল, অ্যাই চুপ। মানুষের তো কতরকম ইচ্ছেই হয়। হাসতে আছে? জানিস আমার ভাইঝি বিলেত আমেরিকা ঘুরে এসেছে?
বাণী নামে একটা মেয়ে বলল, আমারও কিন্তু অমন ইচ্ছে যায়।
তোর আবার কী ইচ্ছে?
ওই যে গো, যেখানে কেউই থাকবে না তেমন জায়গায় গিয়ে সব খুলে ফেলে রোদে হাওয়ায় এলোচুলে বসে থাকি।
সোহাগ রাগ করল না। হাসল। তারপর হঠাৎ মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। খুব মৃদু স্বরে বলল, আমার খুব হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
সন্ধ্যা মায়াভরে বলে, ষাট, ষাট, হারিয়ে যাবে কেন? মানুষ হারিয়ে গেলে বড় কষ্ট।
কেন, ও কথা বলছ কেন? ওয়ার্ল্ড ইজ এ বিগ প্লেস।
সন্ধ্যা একটু আনমনা হল। তারপর বলল, হারিয়ে যেতে নেই। কদিনই বা বাঁচে বলো মানুষ, তার মধ্যেই কত শোকতাপ, কত দুঃখদুর্দশা! আমার জীবন থেকেও তো একটা লোক হারিয়ে গেল বলে–
সন্ধ্যা আর বলল না। ভাইঝির কাছে হয়তো বলতে নেই।
তুমি কি তোমার হাজব্যান্ডের কথা বলছ?
সন্ধ্যা চুপ করে থাকে।
সোহাগ বলে, আই নো অ্যাবাউট ইউ। ইউ আর এ কনজুগাল ডিসকার্ড। সো হোয়াট? ইউ স্টিল হ্যাভ ইওর লাইফ।
সন্ধ্যা একটু হেসে বলে, আমি কি অত ইংরিজি বুঝি?
সোহাগ একটু লজ্জা পেয়ে বলে, সরি।
সন্ধ্যা তার এই একটু ছিটিয়াল, একটু সরল ভাইঝির দিকে চেয়ে বলে, তোমার আর কী ইচ্ছে করে?
সোহাগ একটু লজ্জার হাসি হেসে বলে, আমার বয়সের ছেলেমেয়েরা যা করে, মানে পড়াশুনো, ক্যারিয়ার, কম্পিউটার আমার একদম ভাল লাগে না। তুমিই না বললে কদিনই বা বাঁচে মানুষ! ঠিক তাই। আমাদের লনজিভিটি তো খুব বেশি নয়, এত পড়াশুনো, ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবাভাবি, কত সময় চলে যায় বলো! তা হলে বাঁচব কখন? কদিন? আয়ুর নাইনটি পারসেন্টই তো চলে যাবে বাবা!
