কেলোর চিৎকার ছাপিয়ে ঘড়ির অ্যালার্মটা হঠাৎ শুনতে পেল সন্ধ্যা। মুরগি যেমন উঠোনে দানা খুঁটতে খুঁটতে আদুরে শব্দ করে ঠিক তেমনই শব্দ। কুককুক কুককুক। দোতলা থেকে আসছে। টর্চ জ্বেলে দেয়ালঘড়িটা দেখল সন্ধ্যা। ভোর পৌনে চারটে বাজে। মেমসাহেব এত সকালে তো ওঠে না। বেলা আটটা বাজলে বারান্দায় এসে নাইটি-পরা অবস্থায় ভাসুর-শ্বশুরের চোখের সামনে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজে। তখন সন্ধ্যার ইচ্ছে করে একটা ঢেলা তুলে ছুঁড়ে মারতে। কিন্তু মেয়েটা একটু কিম্ভূত আছে। সন্ধ্যা ওঠে ভোর পাঁচটায় বা তারও একটু আগে। উঠে প্রায় সময়েই দেখতে পায়, মেয়েটা ভূতের মতো বারান্দার এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। কেন ওরকম দাঁড়িয়ে থাকে কে জানে বাপু!
সন্ধ্যার সন্দেহ ক্রমে ঘনীভূত হচ্ছে। ছেলেটা কলকাতায় যাতায়াত করে বটে, কিন্তু মা আর মেয়েতে পনেরো-ষোলোদিন ধরে কেন যে থানা গেড়ে আছে সেটাই সন্দেহের বিষয়। মেজদা কিছুতেই ওদের নিয়ে যাচ্ছে না। শুধু মেয়েটার অ্যালার্জি সারাতেই এখানে রয়েছে, এটা গুয়ে হাত দিয়ে বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। কেলেঙ্কারির গন্ধটা খুব পাচ্ছে সন্ধ্যা, কিন্তু সেটা কতদূর খারাপ সেটাই ধরতে পারছে না। কথা বললে পাছে মুখ ফসকে দু-একটা কথা বেরিয়ে পড়ে সেই ভয়েই বাড়ির কারও সঙ্গে কথাই বলে না ওরা। এমনকী ওদের খাবার পর্যন্ত ঝি সাবিত্রীকে দিয়ে ঘরে পৌঁছে দিতে হয়।
আমলকীটা খুব চলছে। বিটনুন দিয়ে জারিয়ে রোদে শুকিয়ে প্যাকেট করে ছেড়েছে সন্ধ্যা। খুব চলে। গত শীতে এক কুইন্টাল আমলকী কিনেছিল, তার কয়েক কেজি মাত্র পড়ে আছে। ঘরে রাখলে ছাতা ধরে যায় বলে মাঝে মাঝে রোদে দিতে হয়। পরশু দিন উঠোনে চাটাই পেতে যখন আমলকীগুলোকে রোদ খাওয়াচ্ছিল সে তখন মেয়েটা হঠাৎ দোতলা থেকে নেমে এল। একটু এদিক ওদিক পায়চারি করে কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। সন্ধ্যা আড়চোখে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। পাত্তা দেয়নি।
মেয়েটাই আচমকা বলল, এগুলো কি আমলকী?
সন্ধ্যা একটু অবাক হল। তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে, এতটা ভাবেনি। ভদ্রতার খাতিরেই সন্ধ্যা বলেছিল, হ্যাঁ।
তাকে আরও অবাক করে দিয়ে মেয়েটা বলল, একটু টেস্ট করে দেখতে পারি?
ভারী অবাক হল সন্ধ্যা, একটু খুশিও হল কি? একটু কথা বলার ভিতর দিয়ে যে কত মেঘ কেটে যায়। সন্ধ্যা বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, খাও না, খাও।
সোহাগ নিচু হয়ে দু-তিনটে আমলকী তুলে মুখে দিয়ে তার দিকে চেয়ে ছেলেমানুষের মতো বলল, এগুলো কি চিবিয়ে খেতে হয়?
সন্ধ্যা একটু হেসে বলে, না না। শুকনো আমলকি চিবিয়ে খাওয়া যায় না। গালে রেখে দাও। ভিজে নরম হয়ে গেলে তখন চিবোবে।
সোহাগ খানিকক্ষণ মুখের আমলকী এ-গাল ও-গাল করে বলল, বেশ লাগে তো খেতে।
সন্ধ্যা খুশি হয়ে বলল, আরও নাও না। নিয়ে গিয়ে ঘরে রেখে দাও। যখন ইচ্ছে হবে খেও।
তার দরকার নেই। খেতে ইচ্ছে হলে আপনার কাছে এসে খেয়ে যাব।
সন্ধ্যা এটুকুতেই যেন গলে গেল। বলল, আমি পিসি হই। আমাকে আপনি-আজ্ঞে করতে নেই।
সোহাগ হঠাৎ উদাস হয়ে গেল যেন। শুধু বলল, আচ্ছা।
তারপর মুখ ফিরিয়ে খানিক আনমনে উঠোনের এদিকে সেদিকে একটু হেঁটে বেড়াল। যখন প্রথম এসেছিল তখন যেমন ঢলঢলে দেখতে ছিল এখন আর তেমন নেই। একটু যেন রোগা হয়েছে, একটু রুক্ষ। সন্ধ্যা লক্ষ করেছে মেয়েটা একদম সাজে না, চুলটা পর্যন্ত আঁচড়ায় না ভাল করে, সন্ধ্যা মনে মনে খুব চাইছিল মেয়েটা তার সঙ্গে আরও একটু কথা বলুক, একটু ভাব করুক।
না, আর কোনও কথা বলেনি সোহাগ। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে যেমন এসেছিল তেমনই আবার ওপরে চলে গেল। গতকাল কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে কয়েকবার সোহাগকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে সন্ধ্যা। কিন্তু তার দিকে তাকায়নি সোহাগ। আমলকী খেতেও আসেনি। কিন্তু সন্ধ্যা খুব অপেক্ষা করেছিল। যদি আসে!
সন্ধেবেলা কাসুন্দি আর আচারের শিশি ভর্তি করে লেবেল লাগাতে খুব ব্যস্ত ছিল সন্ধ্যা। তিনটে মেয়ে মেঝেতে বসে মন দিয়ে লেবেল লাগিয়ে যাচ্ছে। মাটির মালসায় আঠা, ডাঁই করা লেবেল, স্তূপাকার ঝুড়িভর্তি শিশি-বোতল। সকালেই মাল নিতে আসবে চার-পাঁচজন। আজ অনেক রাত অবধি জাগতে হবে সন্ধ্যাকে।
ঠিক এমন সময়ে খোলা দরজার ওপাশ থেকে মিষ্টি মিহি গলা পাওয়া গেল, আমি একটু ভিতরে আসতে পারি?
তেমনই অবিন্যস্ত চুল, তেমনই ঝ্যালঝালে একটা মেটে রঙের ঢলঢলে কামিজ আর বিবর্ণ একটা প্যান্ট-পরা সোহাগ চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। দেখে এত ব্যস্ততার মধ্যেও সন্ধ্যা হঠাৎ উদ্ভাসিত হয়ে গেল। বলল, এসো এসো।
মেয়েটা ঘরে ঢুকতেই সন্ধ্যা চেয়ারটা ঠেলে দিয়ে বলল, বোসো।
সোহাগ চেয়ারে বসল না, মেঝেতে মেয়েগুলোর পাশেই ঝুপ করে আসন-পিঁড়ি হয়ে বসে পড়ল।
সন্ধ্যা মোলায়েম গলায় বলল, মেঝেতে বসলে ঠান্ডা লাগবে। এখন শীত পড়ছে।
সোহাগের কানে কথাটা গেলই না। সে খুব মন দিয়ে মেয়েদের কাজ দেখল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে বলল, আমি কি কিছু করতে পারি?
সন্ধ্যা অবাক হয়ে বলে, ওমা! তুমি আবার কী করবে? এসব কি তোমার কাজ?
কাজের মেয়েগুলো কাজ থামিয়ে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে সোহাগকে দেখছিল। তাদের চোখে বিস্ময় আর কৌতুক।
