ধীরেন ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। শুধু ভাঙা গলায় বলল, সর্বনাশ!
একটু হাত লাগাতে হবে যে রে। লাশটা ইট বেঁধে পিছনের ডোবায় ফেলতে হবে।
ধীরেন আতঙ্কিত গলায় বলল, আমি পারব না।
বরুণ মিদ্দার হাসল, পারব না বললে কি হয়! ফুর্তি লুটবে আর দায় সারবে না তাই কি হয়?
পায়ে ধরছি বরুণদা, ও আমি পারব না।
পারত না ধীরেন। তার হাত-পা ভয়ে অবশ। দৌড়ে পালাবে ভেবেছিল, কিন্তু শরীরে তখন একরত্তি ক্ষমতা নেই।
আচমকাই বরুণ মিদ্দার হাতের ফাঁসটা তার গলায় গলিয়ে হালকা একটা টানে সেঁটে দিয়েছিল ফাঁস। ওই একটু টানেই ধারালো তার বসে গেল গলায়, দম আটকে এল তার। টপটপ করে গরম রক্ত ঝরে পড়ছিল গলা থেকে বুকে।
ফাঁসটা আলগা করে বরুণ মিদ্দার বলল, এই। ওকে কাঁধে নে। গড়বড় করলে কিন্তু বাঁচবি না।
ধীরেনের বাঁচার কথাই ছিল না সেদিন। বরুণ মিদ্দার রোগাভোগা মানুষ হলেও রাগে আর প্রতিহিংসায় সেদিন তার শরীর লোহার মতো শক্ত। আর ধীরেন সেদিন ভয়ে আতঙ্কে কেঁচো। গলায় তারের ফাঁস, তার হাতলটা মিদ্দারের শক্ত মুঠোয় ধরা। সেই অবস্থাতেই বাতাসীর ঠান্ডা শক্ত শরীরটা যে কীভাবে কাঁধে তুলেছিল ধীরেন তা আজও রহস্য। প্রাণের ভয়ে মানুষ কী না পারে! বাতাসীর গলা অর্ধেক নেমে গিয়েছিল, রক্তে ভেসে যাচ্ছিল বিছানা। বরুণ মিদ্দার ফাঁসের হাতল ধরে থেকেই দরজা খুলল, বলল, নাম।
উঠোনে হাঁটু জল, এঁটেল পিছল মাটি, কাঁধে বাতাসী। সে যে কী অবস্থা তার! সে যদি হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যায় তাহলে মিদ্দারের হাতে ধরা ফাঁস ঘ্যাঁস করে গলায় বসে যাবে। আর মিদ্দার যদি পা পিছলে পড়ে তাহলেও একই পরিণতি। ধীরেনের তখন দু চোখে জলের ধারা। এরকম বিপদে সে কখনও পড়েনি। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। চারদিক অন্ধকার। লোকজনের চিহ্ন নেই। উঠোন পেরোনোই হয়ে দাঁড়িয়েছিল শক্ত কাজ। পা টিপে টিপে সেটা পেরোনোর পর পিছনে ডোবার ঢল। ঢালু দিয়ে এই লাশ কাঁধে নিয়ে নামা তো সোজা নয়। একটু এদিক ওদিক হলেই তার গলায় ফাঁস বসে যাবে।
সজনেগাছের তলায় কিছু ভাঙা ইটের স্তূপ ছিল। সেখানে এসে মিদ্দার বলল, ওকে নামিয়ে ওর পেট-কোঁচড়ে ইটের টুকরোগুলো ভাল করে বাঁধ। তাড়াতাড়ি কর, সময় নেই।
সেই জলের মধ্যে বাতাসীকে নামাতে হল। তারপর ইটের টুকরো জড়ো করে আঁচলে বেঁধে তা কোমরে জড়িয়ে গিঁট দেওয়া–ওই প্রবল বৃষ্টির মধ্যে কাজটা তো সোজা নয়। তার ওপর ধীরেনের হাত-পা তখন বশে নেই। তবু সে অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য প্রাণের তাড়নায় জন্তুর মতো মিদ্দার যেমন বলছিল–করে যাচ্ছিল। কাজটা যে খুব সুষ্ঠু হল তাও নয়। আঁচল কোমরে জড়িয়ে বাঁধতে গিয়ে বারবার বাতাসীর মুখের দিকে চাইতে হচ্ছিল তাকে আর চোখ বুজে ফেলছিল সে।
এবার সাবধানে ডোবার ঘাটে নাম।
নাবব? পড়ে যাব যে! আর পড়লেই–
বৃষ্টিতে ভিজে এখন বরুণ মিদ্দারের অবস্থাও ভাল নয়। হাঁফের টান চৌগুণে উঠেছে। তবু গর্জন করল, নাম বলছি। মরলে দুজনেই মরব। মরতে ভয় কী রে শালা? ফুর্তি লোটার সময় মনে ছিল না?
ডোবার নাবালে ওই লাশ নিয়ে নামতে গিয়েই ধীরেন বুঝল, আজ মৃত্যু নির্ঘাৎ। এত পেছল মাটি যে দাঁড়ানোই যাচ্ছে না। এক ধাপের পর দ্বিতীয় ধাপেই হঠাৎ পা হড়কে চিত হয়ে পড়ে গেল ধীরেন। বাতাসীর লাশ পড়ল তার ওপর। চোখের পলকে তার গলায় ফাঁসটা টাইট হয়ে গিয়েছিল বটে, কিন্তু হঠাৎ সেটা ফের আলগাও হয়ে গেল।
হাঁচোড়-পাঁচোড় করে মাথা তুলেই ধীরেন দেখল, বরুণ মিদ্দারও পড়ে গেছে জলে। হাতে ফাঁসের হাতলটা নেই। সাদা মুখ, বড় বড় চোখ, হাঁ করে শ্বাস টানতে টানতে উঠতে চেষ্টা করছে। ধীরেন দেখল, এই সুযোগ। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে বরুণ মিদ্দারের মাথাটা ধরে চেপে দিল জলের তলায়। হাত পা ছুঁড়েছিল বটে মিদ্দার। আঁকুপাঁকু করেছিল। কিন্তু এক মিনিটও নয়। জলের তলায় স্থির হয়ে গিয়েছিল সে। গলার ফাঁসটা খুলতে ভুলে গিয়েই ধীরেন জল ভেঙে ছুটতে শুরু করেছিল।
.
০৭.
ভোররাতের নির্জনতায় একটা অ্যালার্ম ঘড়ি বেজে উঠল। কুক-কুক-কুক-কুক।
নিস্তব্ধতার ওপর শব্দের ছুরি বসে যাচ্ছে উপর্যুপরি। সেই শব্দে তন্দ্রা ভেঙে নিরর্থক খানিকক্ষণ প্রথমে ভুক ভুক, তার পর ভৌ ভৌ করে চেঁচাল কেলো নামে কুকুরটা। তার কোনও বীরত্ব নেই, সে জানে। মাঝে মাঝে তবু তাকে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে হয়। মহিম রায়ের বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে সে খানিকক্ষণ ঊর্ধ্বমুখ হয়ে ঘড়িটাকে বকাঝকা করল। অ্যালার্ম থামল না। কোয়ার্টজ ঘড়ির অ্যালার্ম সহজে থামেও না। তীক্ষ্ণ শব্দটা বারবার চারদিকের নির্জনতায় ছুরির মতো ঢুকে যাচ্ছে।
কেলোর চিৎকারেই ধড়মড় করে উঠে বসেছিল সন্ধ্যা। চোর এল নাকি? চোরেদের খবর থাকে। কাল রাতেই ছ হাজার সাতশো টাকা পেমেন্ট দিয়ে গেছে রাতুল নস্কর। টাকাটা এখনও তার বালিশের তলায়। কাল রাতে আলমারিতে তুলে রাখার সময় পায়নি। বালিশের নীচে হাত ঢুকিয়ে সে তাড়াতাড়ি বান্ডিলটা দেখল। অনেক কষ্টের রোজগার তার। টাকাও কি সহজে আদায় হয়েছে এতকাল? দোকানদাররা টাকা দিতে কত গড়িমসি করে। কতবার ঘোরায়। বেশি তাগাদা দিলে মাল তুলতে চায় না। আজকাল আদায় উশুল খানিকটা সহজ হয়েছে। টর্চ জ্বেলে চারদিকটা দেখে নিল সন্ধ্যা। না, কেউ ঢোকেনি ঘরে। ওপাশের আর একটা চৌকিতে সীমন্তিনী নামে কাজের মেয়েটা ঘুমোচ্ছ। গাঢ় ঘুম। সারাদিন যা অসুরের মতো খাটুনি যায় তাতে সন্ধ্যারও ঘুম গাঢ় হওয়ার কথা। কিন্তু হয় না। মাঝে মাঝে নিশুতরাতে অকারণে ঘুম ভেঙে যায়। না, ঠিক অকারণে নয়। ঘরে নগদ টাকা থাকে তার। সব সময়ে ব্যাঙ্কে গিয়ে দিয়ে আসার সময় হয় না। চোরছ্যাঁচড়ের ভয়েতেই বোধহয় আজকাল ঘুম খুব সজাগ হয়েছে তার। পঞ্জিকা থেকে চোরের মন্তর শিখে নিয়েছে সে। রোজ সেইসব মন্তর বিড়বিড় করে আওড়ায়। তারপর শোয়। কিন্তু মন্তরের ভরসায় আর কে নিশ্চিন্তে ঘুমোয় বাবা! ঘুম ভাঙার আরও একটা কারণ হল, তার এই জীবনটা। এ যে কোথায় গিয়ে কেমনভাবে শেষ হবে কে জানে! মাঝে মাঝে একজন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় বটে, কিন্তু বড্ড বাধো বাধো ঠেকে। বাবা বা দাদারা শুনলে কী বলবে। বাবা হয়তো শয্যাই নিয়ে নেবে। ওসব ভাবতে কেন যেন সাহস হয় না তার, আবার ইচ্ছেও করে। স্বামীটার কথাও সারা দিনে না হলেও এই নিশুতি রাতে ঠিক মনে পড়বেই। হাড়েবজ্জাত লোকটার ওপর তার রাগ হয় বটে, কিন্তু কেন যেন মায়াও হয়। পুরুষ জাতটা তো ভালবাসতে জানে না। ভালবাসে মেয়েরাই। আর সেই জন্যই মরে।
