তখন ঘোর বর্ষাকাল। এক তুমুল বৃষ্টির রাতে বরুণ মিদ্দার বলল, আজ কি আর যেতে পারবি?
ধীরেন বলল, পারব। বর্ষাবাদলায় আমার অসুবিধে হয় না।
বরুণ মিদ্দার বলল, কাজ কী ফিরে? চাট্টি ভাত খেয়ে এখানেই শুয়ে থাক।
ধীরেন আপত্তি করল না। রাতে বাতাসী খিচুড়ি বেঁধেছিল। তাই খেয়ে বাদ্যযন্ত্রের ঘরে মাদুরে শুয়ে রইল ধীরেন। তুমুল বৃষ্টি আর প্রলয় বাতাসে ঘরদোর ভেঙে পড়ার অবস্থা। পাশের ঘরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কী হচ্ছে তা ভাবতে ভাবতে একটু ভয়-ভয় ভাব নিয়েই ধীরেন ঘুমিয়ে পড়েছিল।
অচেনা যে-ভয়টা তার মনের মধ্যে ছিল সেই ভয়টা যে কেন তা হঠাৎ করে তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল যখন নিশুত রাতে হঠাৎ একটা উন্মাদিনী মেয়েমানুষের শরীর তাকে সাপের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।
ধীরেন সেই আলিঙ্গন ছাড়াতে ছাড়াতে চাপা গলায় বলল, করো কী? বরুণদা টের পাবে যে!
ভয় নেই, ওকে ঘুমের ওষুধ দিয়েছি।
কী ওষুধ?
ও তুমি বুঝবে না।
বিষ দাওনি তো?
না গো না, ঘুমের ওষুধ। ভয় পেও না।
মনে একটা ধন্দ থেকেই গিয়েছিল তবু ধীরেনের। এ পাগলি কী করে এল মিদ্দারকে ফাঁকি দিয়ে কে জানে! বাতাসীকে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব ছিল না। সে তার পাওনাগণ্ডা আদায় করে যেমন এসেছিল তেমনই চলে গেল হঠাৎ। বৃষ্টির তেজ আরও বাড়ল। হাওয়ায় তখন ঝড়ের গর্জন। ধীরেন অশান্ত মনে খানিকক্ষণ এপাশ ওপাশ করে ঘুমিয়ে পড়ল।
ম্যাদাটে আলোয় ভোরবেলা উঠে ধীরেন দেখল, ঝোড়ো বাতাস থামলেও বৃষ্টি পড়েই চলেছে। উঠোনে এক হাঁটু জল। ঘরের ভিটে ডুবে যেতে আর খুব বাকি নেই। কেঁচো, কেন্নো, উইচিংড়েরা বারান্দা ভরে ফেলেছে। আর উঠোন, বাগান, সব জলে একাকার। কোথাও ডাঙাজমি দেখা যাচ্ছে না। ঘটির জলে চোখমুখ ধুয়ে সে কিছুক্ষণ চারদিকের অবস্থা দেখল দাঁড়িয়ে। এই অবস্থায় বাড়ি ফেরা শক্ত হবে। কিন্তু ফেরাটাও দরকার। কাল রাতে যা হল তাতে তার আর এ বাড়িতে থাকতে সাহস হচ্ছে না। বরুণ মিদ্দার কিছু টের পেয়ে থাকলে বড় লজ্জার কথা।
ও-ঘর থেকে অবশ্য কোনও সাড়াশব্দ আসছিল না। আকাশের আলো দেখে ধীরেন অনুমান করল, সকাল ছটা-সাড়ে ছটা হবে। এত বেলা অবধি ওদের ঘুমোনোর কথা নয়।
ধীরেন ঘরে এসে মাদুরে চুপচাপ বসে রইল। মনে বড় দুশ্চিন্তা।
আরও কিছুক্ষণ বাদে দরজা খোলার শব্দ হল। ও-ঘর থেকে বরুণ মিদ্দার এসে মাদুরে বসল। তাকে দেখে খুশিই হল ধীরেন। যাক, বাতাসী তাহলে লোকটাকে বিষ-টিষ দেয়নি। কিন্তু মিদ্দারের অবস্থা ভাল নয়। বর্ষার ঠান্ডা আর জোলো বাতাসে তার হাঁফের টান উঠেছে, গলায় শ্লেষ্মার শব্দ হচ্ছে, চোখ দুটো লাল আর টসটসে। গলা আর মাথায় কম্ফর্টার জড়ানো। গায়ে চাদর।
এঃ, শরীরটা যে খারাপ দেখছি বরুণদাদা?
বরুণ মিদ্দার কথাই কইতে পারল না। কিছুক্ষণ হাঁফাল, বারান্দায় গিয়ে অনেকটা শ্লেষ্মা ফেলে এসে ফের কিছুক্ষণ কাহিল শরীরে বসে হাঁফ ছাড়ার জন্য হাঁসফাঁস করল। আবার গিয়ে শ্লেষ্মা ফেলল।
বার কয়েক শ্লেষ্মা উগড়ে একটু ধাতস্থ হয়ে বরুণ মিদ্দার হঠাৎ তাকে বলল, তোর তো গায়ে বেশ জোর-টোর আছে। একটা ভারী জিনিস তুলতে পারবি?
ধীরেন অবাক হয়ে বলল, কী তুলতে হবে বরুণদাদা?
একটা লাশ। মেয়েমানুষের লাশ।
ধীরেন এত স্তম্ভিত হয়ে গেল যে, মুখ দিয়ে বাক্য সরল না। বড় বড় চোখে চেয়ে রইল।
পারবি না?
ধীরেন স্খলিত কণ্ঠে শুধু বলল, অ্যাঁ!
বরুণ মিদ্দার হঠাৎ একটা হাত বাড়িয়ে তার ডান হাতের কবজিটা শক্ত করে ধরে ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, আয়।
ধীরেনের আজও মনে আছে, সে যেন একটা ঘোরের মধ্যে মিদ্দারের সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকল। শরীরে একরত্তি শক্তি নেই, পা দুটো ভেঙে আসছে ভয়ে, মাথাটা বড্ড ধোঁয়াটে।
দরজা জানালা বন্ধ বলে ঘরটা এখনও অন্ধকার। আবছা দেখা যাচ্ছিল, বাতাসী বিছানায় আড়াআড়িভাবে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। দুটো পা বেরিয়ে আছে চৌকির বাইরে।
ধীরেন হাঁ করে চেয়ে রইল।
বরুণ মিদ্দার বলল, এতকাল লুকিয়ে-চুরিয়ে নষ্টামি করছিল, টের পেয়েও কিছু বলিনি। আমি কি বুঝি না যে, ওরও একটা পুরুষমানুষ দরকার! টের পেয়েও না-পাওয়ার ভান করতুম। কিন্তু কাল রাতে যা করল তা কি সহ্য করা যায় বল তো! হাঁফানির টান বেড়েছে বলে ঘুমোতে পারছি না। এপাশ ওপাশ করছি। জেগে আছি জেনেও দিব্যি উঠে চলে এল এ-ঘরে। আমি গলাখাঁকারি দিয়ে জানান দিলুম যে জেগে আছি। তবু গ্রাহ্য করল না। যেন আমি কেউ না, কিছু না। চলে এল, আর আমি তখন বসে বসে ভাবলুম যা করার আজই করতে হবে। এ জিনিস আর সহ্য করা যায় না।
ধীরেন তখনও হাঁ করে পলকহীন চোখে চেয়ে আছে মিদ্দারের দিকে। বরুণ মিদ্দার তার চাদরের তলা থেকে তার হাতটা বের করল। হাতে একটা তারের ফাঁস। বাদ্যযন্ত্রের সরু স্টিলের শক্ত তার দিয়ে তৈরি। একপ্রান্তে কাঠের হাতল লাগিয়ে নিয়েছে, যাতে টান মারতে সুবিধে হয়। এ অস্ত্র যে ভয়ংকর তা ধীরেন জানে, একটা হ্যাঁচকা টান মারলেই গলার মাংস কেটে বসে যাবে। আধখানা গলা নেমে যাবে লহমায়। দড়ির ফাঁসের চেয়ে বহুগুণ ভয়ংকর।
বরুণ মিদ্দার বলল, একটা শব্দ করারও সময় পায়নি। হাসি-হাসি মুখ করে তোর ঘর থেকে এসে দিব্যি আমার পাশে শুয়ে পড়ল। এমনকী আমি জেগে আছি জেনেও নির্লজ্জের মতো বলল, একটু সরে শোও তো, গরম লাগছে। যেন কিছুই হয়নি। গায়ে জ্বালা করে না, বল তো! কিন্তু আমি হড়বড় পছন্দ করি না। ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে পছন্দ করি। চমকে দেওয়ার জন্য বললুম, হ্যারিকেনটা একটু উসকে দেখ তো, ঘরে বোধহয় সাপ ঢুকেছে। সাপ শুনে টক করে উঠে বসে বলল, কোথায় সাপ? ব্যস, ওইটাই শেষ কথা। তৈরিই ছিলুম, ও উঠে বসতেই গলায় ফাঁসটা গলিয়ে টেনে দিলুম।
